Saturday, September 5, 2015

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-15)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

ঈশ্বর কহিলেন
হে বিশালাক্ষি ! হে হিমালয়কন্যকে ! গীতার পঞ্চদশাধ্যায়মাহাত্ম্য বর্ণন করিতেছি, অবধারণ কর । ১

গৌড়দেশে নরসিংহ নামে জনৈক কৃপালু নরপাল ছিলেন, ঐ অসাধারণ বীর্য্যশালী ধরাপালের অসিধারায় সমরে রিপুগণ অসংখ্য দেবতারূপে পরিগণিত হইত । তদীয় মাতঙ্গগণের মদজলে ইলা পরিপূর্ণ থাকায় অনায়াসে নিদাঘের সূর্য্যতাপ-বেদনা সহ্য করিতে পারিত । তদীয় দীপ্তিশালী মত্তদন্তিকুল দেখিলে বোধ হইত যেন সচল পর্বত সকলই ইন্দ্র হইতে ভয়াকুল হইয়া ইহাঁরই শরণাপন্ন হইয়া রহিয়াছে । সেই প্রজাপাল কৃপালু রাজার রাজ্যমধ্যগত ভূধর সকলে মত্তমাতঙ্গগণ যে উচ্চ চীৎকার করিত, তাহাতে মনে হইত যেন সেই সকল ভূধর ঐ মাতঙ্গধ্বনিচ্ছলে প্রতিধ্বনি দ্বারা সেই রাজার অভিনন্দন করিতেছে । তৎকালে ভূতলে এমন ভূখণ্ড ছিল না যে, তদীয় ধাবমান তুরগের ক্ষুরখাতে জর্জরিত হইয়া বিচিত্রিত হয় নাই । এই ইন্দ্রতুল্য প্রভাবান্‌ রাজার শাসনকালেই ফণীশ্বর তদীয় মহাভাষ্যকে প্রতিসংস্কারপূর্বক উজ্জ্বলীকৃত করিয়াছিলেন । ২-৭

এই নৃপতির প্রচণ্ড-ভূজমণ্ডল সরভভেরুণ্ড নামে জনৈক সৈনিক ছিল, সর্বশাস্ত্রকলানিধি ধীমান্‌ সরভভেরুণ্ড ধন, তুরগ, বীররসগর্বী ভট এবং অত্যন্ত দুর্গম দুর্গশ্রেণী দ্বারা ভূপালের তুল্যবলশালী হইয়াছিল । ৮-৯

সে একদা পাপে চিত্ত সমাধান করিয়া স্বয়ং রাজ্য করিতে ইচ্ছা করিল এবং রাজকুমারগণের সহিত নৃপতিকে বলপূর্বক নিহত করিতে উদ্যত হইল । ঐ সৈনিক এইরূপ করিতে অভিলাষী হইয়া স্বল্প দিবস অধ্যবসায়ের পর বিসূচিকা রোগে আশু গতাসু হইল । ১০-১১

হে কৃশোদরি ! পাপাত্মা সৈনিক এই পাপকর্ম-ফলে অল্পকাল মধ্যে প্রেতপুরে প্রস্থান করিয়া সিন্ধুদেশে তেজস্বী তুরগ হইয়া জন্মগ্রহণ করিল । অনন্তর জনৈক অশ্বতত্ত্বজ্ঞ বৈশ্যসুত বহু মূল্য দ্বারা ঐ অশ্ব ক্রয় করিয়া অনেক যত্নে গৃহে আনয়ন করিল । এদিকে নরসিংহও সেই সৈনিকের মৃত্যুর পর কালে বার্ধক্যদশায় উপনীত হইয়া পুত্র-পৌত্রাদির সহিত রাজ্য পালন করিতে লাগিলেন । একদা বৈশ্যনন্দন রাজাকে সেই অশ্ব বিক্রয় করিবার জন্য রাজদ্বারে উপনীত হইয়া তাঁহার সাক্ষাৎকারের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল । প্রতিহার বৈশ্বকে সমাগত দেখিয়া নৃপতির সহিত দেখা করাইয়া দিল । ১২-১৫

অনন্তর রাজা বৈশ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন, - তুমি কি জন্যে আগমন করিয়াছ ? বৈশ্য রাজা কর্তৃক এইরূপে পৃষ্ট হইয়া স্পষ্ট বাক্যে বলিল, - দেব ! এই সাধুলক্ষণ অশ্বকে দিব্যগতি রত্ন মনে করিয়া বহু অযুতমূল্যে আমি ইহাকে গ্রহণ করিয়াছি । ১৬-১৭

অনন্তর নৃপতি পার্শ্ববর্তী অমাত্যগণের মুখের দিকে তাকাইলেন এবং বণিক্‌কে বলিলেন, - এইস্থানে অশ্ব আনয়ন কর । ১৮

অশ্ব আনীত হইল; তাহাকে দেখিয়া অশ্বলক্ষণ-তত্ত্বজ্ঞগণ প্রশংসাসূচক শিরঃকম্পন করিলেন এবং শূরগণের মনও মুহুর্মুহু উৎসাহিত হইল; তাহার যে লালাফেন ক্ষরিত হইতেছিল, তাহা দেখিয়া বোধ হয় যেন, বেগবেশে বহুবার সমগ্র মেদিনী ভ্রমণার্জিত শুভ্রতর যশই ক্ষরণ করিতেছে । গুণসাম্যে সে প্রকৃতই উচ্চৈঃশ্রবার তুল্য; কিন্তু তদীয় তেজস্বিতায় তাহা ব্যক্ত হইতেছিল বলিয়াই যেন লজ্জায় তাহার কন্ধর নত হইয়াছিল । তাহার ইন্দুধবল চামর দ্বারা নিরন্তর দিগন্তের বীজিত হইতেছিল এবং সে ক্ষীরাব্ধি তুল্য ললিত উচ্চ শ্বাস দ্বারা উচ্চৈঃশ্রবার অনুকরণ করিল । অশ্ববর নীলাতপত্রযুগল ধারণ করায় ঘনচ্ছায়ার তুল্যশ্রী মেঘচুম্বী হিমাদ্রিশিখরের আকার ধারণ করিল এবং মেদিনীমণ্ডল সংস্পর্শী সংক্রান্ত পাবকের প্রভা প্রাপ্ত হইল । অশ্ব যেন বৈরিগণের হৃদয় বিদারণ ও জয়শ্রী করায়ত্ত করিয়া মুহুর্মুহু বন্ধুর কন্ধরাতট উৎক্ষিপ্ত ও কম্পিত করিল, গুরু গম্ভীর হ্রেষরবে দিক্‌সকলে যশোরাশি প্রখ্যাপিত করিতে লাগিল এবং উচ্চ গতি পরম্পরা দ্বারা বিপুল বলের পরিচয় প্রদান করিল । ১৯-২৬

এবংবিধ রূপের নিলয় এবং সুলক্ষণসমূহের সাক্ষাৎ পয়োনিধি স্বরূপ অশ্বকে বৈশ্য আনয়ন করিলে রাজা দর্শন করিলেন, অশ্বলক্ষণাবদ্‌ অমাত্যগণ তাহার গুণ বহুধা বর্ণন করিল । অনন্তর মহীপতি সত্বর বৈশ্যকথিত বহু স্বর্ণ দানে সেই অশ্ব গ্রহণ করিয়া সাতিশয় আনন্দনিমগ্ন হইলেন এবং অশ্বরক্ষিগণকে আহ্বানপূর্বক সযত্নে অশ্বরক্ষার ব্যবস্থা করিয়া দিয়া গৃহান্তরে গমন করিলেন, সভাসদ্‌গণও বিদায় লইয়া তাহাদের স্বস্থানে প্রস্থান করিল । ২৬-২৯

এই বলশালী অশ্ব বহুবার রাজার সহিত রণাঙ্গনে গমন করিয়াছিল, কিন্তু নিজে শস্ত্রব্রণের কিণশ্রেণীর দ্বারা ভূষিত হইয়াও নৃপকে পরিত্যাগ করে নাই । ৩০

একদা মৃগয়া ক্রীড়ায় কুতুহলমনা মহীপাল ঐ অশ্বে আরোহণ করিয়া অরণ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন; তিনি কতিপয় হরিণ কর্তৃক আকৃষ্যমাণ হইয়া তদীয় পশ্চাদাগত সৈন্যসকলকে পরিত্যাগ করিয়া অগ্রসর হন । এই সময় তিনি পিপাসাকুল হইয়া অশ্ব হইতে অবতরণপূর্বক জলান্বেষণে প্রবৃত্ত হন এবং অশ্বকে তরুশাখায় আবদ্ধ করিয়া এক শিলাতলে আরোহণ করেন । তিনি যে শিলাখণ্ডে আরোহণ করিয়াছিলেন, তথায় একখণ্ড পত্র পাইলেন, পত্রে গীতার পঞ্চদশাধ্যায়ের শ্লোকার্ধ লিখিত রহিয়াছে; উহা বায়ু দ্বারা বিচালিত হইয়া ঐ শিলার উপরে আসিয়া পড়িয়াছে । ৩১-৩৪

নৃপতি পত্র পাইয়া পাঠ করিলেন, এদিকে অশ্ব সেই নৃপতিপঠিত গীতাক্ষরাবলী শ্রবণ করিয়া মুক্তিপদ প্রাপ্ত হইল, - তুরগ ত্বরায় ক্ষিতিতলে পতিত হইল । রাজা তাহার বল্‌গাদি বন্ধনগ্রন্থিচ্ছেদন ও পৃষ্ঠ হইতে আসনাদি অবতারণ করিয়া তাহাকে উত্তোলিত করিতে গেলেন, অশ্ব উঠিল না, মরিয়া গেল । অনন্তর অশ্ব সরভভেরুণ্ড সৈনিকের বেশে সুস্বরে নৃপতিকে সম্ভাষণ করিয়া দিব্য বিমানারোহণে স্বর্গে গমন করিল । ৩৫-৩৭

অতঃপর নৃপতি পর্বতে আরোহণ করিয়া এক উত্তম আশ্রম দর্শন করিলেন । ঐ আশ্রম পুন্নাগ, কদলী, আম্র, নারিকেল, পূগ, নাগকেশর ও চম্পক তরুসমন্বিত এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্রাক্ষা ও ইক্ষু উদ্যানে পরিশোভিত । করিশাবক, সারঙ্গ ও ময়ূরগণ তথায় নৃত্য করিয়া থাকে । নৃপতি তথায় তৃণনির্মিত কুটীরমধ্যস্থ দ্বিজকে প্রণাম করিয়া সংসারবাসনা পরিত্যাগ মানসে পরম ভক্তিসহকারে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, - কি কারণে তুরগ স্বর্গে গমন করিল, তাহা বর্ণন করুন । ৩৮-৪১

রাজার এইরূপ বাক্য শুনিয়া দ্বিজ তাঁহার সৈনিক মরিয়া গিয়া বহুকাল যে পাপে অশ্ব হইয়াছিল, তাহা ব্যক্ত করিলেন । আর বলিলেন, - কোন এক স্থানে গীতার পঞ্চদশাধ্যায়ের শ্লোকার্ধ লিখিত ছিল, তুমি তাহা পাঠ করিয়াছিলে, তোমার মুখ হইতে উহা শুনিয়া অশ্ব স্বর্গে গমন করিয়াছে । ৪১-৪৩

অনন্তর রাজার পরিজনগণ তথায় আগমন করিল, রাজা তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া দ্বিজকে প্রণামপূর্বক হৃষ্ট হইলেন । ৪৩-৪৪

অতঃপর যে পত্রে পঞ্চদশাধ্যায় গীতাশ্লোকার্ধ লিখিত ছিল, তাহা পাঠ করিয়া রাজা শুদ্ধ হইলেন, হর্ষে তাঁহার লোচনযুগল উৎফুল্ল হইল, তিনি মন্ত্রিগণের মতানুসারে সিংহবল তনয়কে সিংহাসনে অভিষিক্ত করিয়া মুক্তি লাভ করিলেন । ৪৪-৪৬

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৮৯ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


গৌড়দেশে নরসিংহ নামে এক রাজা ছিলেন । তিনি এত শক্তিশালী ছিলেন যে দেবতাদেরও যুদ্ধে হারিয়ে দিতে সক্ষম ছিলেন । তাঁর সেনাপতি সরভ্‌মেরুন্দ্‌ ছিল খুব লোভী । তাই সে রাজপুত্রের সঙ্গে মিলে রাজাকে হত্যা করে গৌড়দেশের শাসক হতে ষড়যন্ত্র করল । কিন্তু তার চক্রান্ত কার্যকরী করার পূর্বেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় । পরজন্মে সিন্ধুদেশে সে ঘোড়া হয়ে জন্মায় । ঘোড়াটি ছিল সুন্দর ও দ্রুতগামী, যে কোন প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার সকল গুণাবলীই সেটির ছিল । একদিন গৌড়দেশের এক ধনীব্যক্তির ছেলে ঘোড়াটিকে কিনে রাজার কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রী করতে এল । রাজা ঘোড়াটিকে পরীক্ষা করে দেখে খুশি হয়ে ব্যবসায়ীর প্রার্থিত মূল্যের অধিক দিয়ে সেটিকে কিনলেন ।

কিছুদিন পর সেই ঘোড়ায় চড়ে শিকার করার সময় এক হরিণের পিছনে অনেকক্ষণ ধাওয়া করার পর ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে রাজা ঘোড়াটিকে একটা গাছে বেঁধে একটা বড় পাথরের ওপর বসলেন । কিছুক্ষণ পর এক টুকরো পশুচর্ম হাওয়ায় উড়ে এসে তাঁর পাশেই পাথরে ওপর পড়ল । সেই চামড়ার ওপর গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের একটি শ্লোকের অর্ধাংশ লেখা ছিল । রাজা সেটা জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করতেই ঘোড়াটি মাটিতে পড়ে গিয়ে অশ্বদেহ ত্যাগ করে দিব্য মূর্তি লাভ করে বৈকুণ্ঠে চলে গেল ।

কাছেই এক আশ্রমে বিষ্ণুশর্মা নামে এক জিতেন্দ্রিয় ব্রাহ্মণ বসে ছিলেন । তাকে রাজা এই ঘটনা জানালে তিনি রাজাকে তার দুষ্ট প্রাক্তন সেনাপতির অশ্বজন্মের ইতিবৃত্ত শোনালেন । দৈবক্রমে সেই অশ্ব গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের কিছু শব্দ শুনতে পায় এবং তাতেই তার মুক্তি লাভ হয় ।

ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ওই চর্ম-পত্রটি যত্ন করে রাজা তাঁর রাজধানীতে নিয়ে এলেন । অতঃপর সেই চর্ম-পত্রে লেখা গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের শ্লোকের অর্ধাংশ নিয়মিত পাঠ করে রাজা শুদ্ধ হন । অল্পকাল পরেই তিনি তাঁর পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে মুক্তি লাভ করলেন ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

No comments:

Post a Comment