Sunday, August 2, 2015

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-6)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

শ্রীভগবান্‌ কহিলেন -
হে বরাননে ! অধুনা ষষ্ঠাধ্যায়ের মাহাত্ম্য কীর্তন করিতেছি, ইহা শ্রবণে নরগণের মুক্তি করতলগত হয় । ১

হে স্মেরনয়নে ! গোদাবরীতীরে প্রতিষ্ঠান নামে এক সমৃদ্ধ পুরী আছে । ঐ পুরীতে আমি পিপ্পলেশ নামে অবস্থান করিতেছি । ২

ঐ স্থানে হংসগণ পক্ষপুট-নিক্ষিপ্ত শীতল শীকর-নিকর দ্বারা যতিগণের শ্রমাপনোদন করিয়া থাকে । ৩

শ্লাঘ্য গোদাবরীনীর ফুল্ল কমলদলকোশের পরাগপুঞ্জে সুরভীকৃত । ঐ নীর ব্যবহারে তত্রত্য নরগণ নির্জ্জরাকারে বিরাজমান । ৪

গোদাবরী-নীরনিকটে চন্দ্রগলিত সুধারসও ধিক্কারযোগ্য । মুনীন্দ্রগণ ঐ গোদাবরীনীর-নিমগ্ন মহারাষ্ট্রবধুগণের বদনরাজি ফুল্লপঙ্কজ-শঙ্কায় স্পর্শ করিয়া থাকেন । ৫-৬

ঐ স্থানে ক্রীড়াসক্ত ক্বণৎকঙ্কণসুন্দরী মহারাষ্ট্র-রমণীগণ এবং অলিকুলের গুঞ্জনধ্বনি তত্রত্য তপস্বিগণের মনোহরণ করে । ৬-৭

ঐ পুরীর অত্যুচ্চ সৌধশিখরবিহারিণী রমণীগণের মুখ দর্শনে শশলাঞ্ছনও অনুদিন ক্ষীণ হইয়া থাকেন । ৭-৮

তত্রত্য অত্যুন্নত সৈধবলভীর নানাবর্ণ মহামণি-মরীচিসমূহকে স্বর্গবাসী মুনিগণ দূর্বা-ভ্রমে এবং গন্ধর্বগণ চন্দন-সন্দেহে চুম্বন করেন । ৮-৯

যথায় আধুয়মান পতাকাসমূহের সমীরণ দ্বারা রবিরথাশ্বগণ শ্রমহীন হইয়া থাকে । ৯-১০

রাশিকৃত মলয়জ এবং অগণিত বণিকসমূহ দ্বারা ঐ স্থানে মলয়াচল উপলমাত্র-শেষ লক্ষিত হইতেছে । ১০-১১

যথায় মুক্তাফল সকল নগরীদেবতার হাস্য-স্তবকবৎ সর্বত্র পুঞ্জীকৃত রহিয়াছে । ১১-১২

তথায় জ্ঞানশ্রুতি নামে এক ভূপতি ছিলেন । ১২

মার্তণ্ডমণ্ডলের তীব্র তেজের ন্যায় তাঁহার প্রতাপ ছিল । তিনি মণিসন্নিভা মেদিনীধারণে প্রবৃত্ত হইলে লোকে শেষ নাগ বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছিলেন । ১৩

কল্পপাদপগণ তাঁহার নিত্যানুষ্ঠিত যজ্ঞধূমপুঞ্জে শ্যামলশ্রী ধারণ করিয়াছিল । যেন তাহারা রাজার অসাধারণ দাতৃত্ব লক্ষ্য করিয়াই লজ্জায় মলিন হইয়াছিল । ১৪

দেবগণ তাঁহার যজ্ঞপ্রদত্ত পিষ্টক-চর্বণাস্বাদে লম্পট হইয়া কখনই প্রতিষ্ঠানপুরী পরিত্যাগ করিতেন না । ১৫

তাঁহার দানাস্বূধারায়, প্রতাপজ্যোৎস্নায় এবং যজ্ঞধূমপুঞ্জে পরিপুষ্ট হইয়া জলদগণ যথাকালে বারি বর্ষণ করিত । ১৬

তদীয় রাজ্যশাসনকালে কুত্রাপি অতিবৃষ্ট্যাদি ঈতি বাধা ছিল  না । পৃথিবীর সর্বত্রই সুনীতি প্রসূত হইয়াছিল । ১৭

তিনি বাপী, কূপ ও তড়াগাদিচ্ছলে নিয়ত যেন মেদিনীর হৃদয়স্থ নিধিসকলই অবলোকন করিতেন । ১৮

পাণ্ডুর বর্ণ পতাকারাজি দ্বারা তদীয় প্রাসাদ আকাশগঙ্গার তরঙ্গরাজি দ্বারা সানুমান্‌ হিমাচলের ন্যায় বিরাজ করিত । ১৯

সেই রাজার দান, তপস্যা, যজ্ঞ ও প্রজাপালনে পরিতুষ্ট হইয়া দেবগণ তাঁহাকে বর দান করিতে আগমন করেন । ২০

এই সময় অন্তরীক্ষপথে মৃণাল-ধবল দেবি ও দেবহংসগণ স্ব স্ব পক্ষপুট পরিচালন-পূর্বক নির্গত হইয়াছিল । ২১

তাহারা পরস্পর আলাপ করিয়া সত্বর গমন করিতেছিল । তখন ভদ্রাশ্বপ্রমুখ দুই তিনটা হংস তাহাদের সম্মুখ ভাগ দিয়া বেগে যাইতে লাগিল । ২২

পশ্চাৎবর্তী হংসগণ তাহাদিগকে অগ্রে দ্রুত যাইতে দেখিয়া কহিল, তোমরা কিজন্য অগ্রে অগ্রে থাকিয়া সবেগে গমন করিতেছ ? ২৩

আমরা সকলে মিলিয়াই এই দুর্গম পথে গমন করিব । ঐ সম্মুখে প্রকাশমান পুণ্যাত্মা মহীপাল জ্ঞানশ্রুতির অত্যুজ্জ্বল তেজোপুঞ্জ দেখিতে পাইতেছ না । ২৪-২৫

পশ্চাৎবর্তী হংসগণের এই বাক্য শ্রবণ করিয়া অগ্রবর্তী হংসগণ হাস্য করিয়া অবজ্ঞার সহিত উচ্চৈঃস্বরে কহিল, - দুর্দ্ধষতেজা ব্রহ্মবাদী রৈক্য ঋষির তেজ অপেক্ষা কি এই জ্ঞানশ্রুতি রাজার তেজ তীব্রতর ? ২৫-২৭

রাজা জ্ঞানশ্রুতি এই সময় অত্যুচ্চ সৌধ-ভবনে আরোহণ করিয়া সুখে অবস্থান করিতেছিলেন; তিনি হংসগণের উক্ত বাক্য শ্রবণ করিলেন এবং বিস্ময়াপন্ন হইয়া তৎক্ষণাৎ সারথিকে ডাকিয়া আদেশ করিলেন, মহাত্মা রৈক্য ঋষিকে আনয়ন কর । ২৭-২৯

রাজার সারথির নাম মহ । সারথি মহ ভূপতির সেই অমৃতগর্ভিত বাক্য শ্রবণপূর্বক হর্ষ প্রকাশ করিয়া যথায় বারাণসীনামী মুক্তিদায়িনী নগরী অবস্থিত, প্রথমে সেই স্থানেই গমন করিলেন । এই বারাণসী পুরীতেই জগৎপতি বিশ্বশ্বর দেব উপদেষ্টরূপে বিরাজ করিতেছেন । ২৯-৩১

সারথি বারাণসী হইতে পরে গয়া ক্ষেত্রে গমন করিলেন । দেব গদাধর অখিল লোক উদ্ধারের নিমিত্ত উৎফুল্লনেত্রে এই গয়াক্ষেত্রে বাস করিতেছেন । ৩১-৩২

অনন্তর সারথি হিমালয়ের পশ্চাদ্‌বর্তী বহু তীর্থে পর্যটন করিয়া পাপদারণ কেদারদেবের সন্নিহিত স্থানে গমন করিল । মানবগণ এই কেদার দেবকে একবার মাত্র অবলোকন করিলেও সর্বপাপ হইতে মুক্ত হইয়া নিখিল ভোগ উপভোগান্তে নিশ্চয়ই মোক্ষ লাভ করিয়া থাকে । ৩২-৩৪

অনন্তর সারথি গৌড়দেশে গমন করিল । এই দেশে পুরুষোত্তম দেব বিরাজ করিতেছেন । নরগণ ইহার দর্শন মাত্রেই স্বর্গলোকে প্রয়াণ করিয়া থাকে । ৩৪-৩৫

অতঃপর সারথি মুক্তিদায়িনী দ্বারাবতী নগরীতে গমন করিলেন । এই স্থানে গোমতীতীরে রুক্মিণীবল্লভ হরি বিরাজ করিতেছেন । গোমতী তীর্থে স্নান ও পঞ্চ কৃষ্ণ অবলোকন করিলে মানব যথেষ্ট ভোগ উপভোগ করিয়া মুক্তি লাভ করে । ৩৫-৩৭

অনন্তর সারথি সমুদ্রপথে গমন করিয়া ভুক্তিমুক্তিপ্রদ সোমনাথকে অবলোকনপূর্বক সে স্থান হইতে নির্গত হইল । ৩৭-৩৮

পরে ভুক্তিমুক্তিদায়িনী অবন্তীপুরে প্রয়াণ করিল । এই অবন্তীপুরে মহাকাল শঙ্কর উমার সহিত ক্রীড়া করত সুখে অবস্থান করিতেছেন । ৩৮

অনন্তর সারথি নর্মদাতটে শর্মপ্রদ ভুক্তিমুক্তিদায়ক ওঙ্কারেশ্বর-সমীপে আগমন করিয়া পরে তথা হইতে নির্গত হইল । ৩৯

(এরপর সারথি) অশ্বমেধকর নগরে পর্য্যটন করিতে লাগিল । এই নগরে স্বয়ং লক্ষীপতি শার্ঙ্গধর অবস্থান করিতেছেন । ৪০

অতঃপর সারথি বিষ্ণুগয়ায় উপনীত হইল । এই স্থানে লোনার নামে এক কুণ্ড আছে । নর এই কুণ্ডে স্নান এবং উহার জলপান করিয়া বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া থাকে । ৪১

ইহার পর সারথি কোহ্লাপুরে রুদ্রগয়ায় গমন করিল । তথায় ভক্তিদায়িনী ভগবতী লক্ষী বিরাজ করিতেছেন । তত্রত্য পঞ্চনদীতে স্নান ও মহালক্ষীকে দর্শন করিয়া নানা ভোগ উপভোগান্তে নর যথাকাম ভক্তি লাভ করিয়া থাকে । ৪২-৪৩

অনন্তর সারথি অমলগিরি নাম্নী নগরীতে উপনীত হইয়া নন্দিকেশ্বরে আরোহণ করিল । এই স্থানে সোমনাথ দেব অবস্থান করিতেছেন । বরদানোদ্যত চতুর্ভূজ শিব সোমনাথ দেবকে দর্শন করিলে নরগণের মুক্তিলাভ হয়, সন্দেহ নাই । ৪৪-৪৫

যুগে যুগে যাঁহার ভুজ অবনিমণ্ডলে পতিত হইয়া থাকে, সেই হরিহর দেবকে সারথি তুঙ্গভদ্রা নদীতীরে দর্শন করিল । সমস্ত নরই সেই রম্য হরিহর বপুঃ দর্শন করিয়া নিখিল ভোগ সকল উপভোগান্তে যথাকাম ভববন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া থাকে । তাহারা স্বর্গে শত কল্পকাল বাস করিয়া ভববন্ধন হইতে মুক্ত হয় । ৪৬-৪৭

যাহাকে দর্শন করিয়া নরগণ কখনও নরক নিরীক্ষণ করে না, অতঃপর সে লোকপ্রভু স্বামী দেবকে অবলোকন করিয়া স্বর্গে শত কল্পকাল বাস করিয়া এবং সংসারবাসনা হইতে মুক্ত হইয়া মোক্ষ প্রাপ্ত হয় । এ বিষয়ে সন্দেহ মাত্র নাই । ৪৮-৫০

অতঃপর সারথি সিদ্ধগন্ধর্বসেবিত শ্রীশৈলে উপনীত হইল । এই স্থানে সংসারসাগর হইতে অখিল লোকের উদ্ধারের জন্য গিরিজাপতি, মল্লিনাথ নামে অবস্থিত । ইনিই কালে কালে পরম জ্যোতিঃ প্রদর্শন করাইয়া থাকেন । ইহাকে স্মরণ এবং দর্শন করিলে নরগণের নিরয়যাতনা দূরীভূত হইয়া থাকে । তাহারা স্বর্গলোকে সুখভোগান্তে সংসারবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া মোক্ষ লাভ করে, সন্দেহ নাই । ৫০-৫৪

লক্ষণ ও জানকীর সহিত রামচন্দ্র এই স্থানে আগমন করিয়াছিলেন । এখানে স্নান-পান করিলে, নর নরক হইতে নিশ্চয় মুক্ত হইয়া থাকে । নরগণ এই তীর্থমাহাত্ম্যে শত কল্পকোটিকাল স্বর্গলোকে সুখভোগান্তে সংসার পথ হইতে মুক্ত হইয়া নিশ্চয় মোক্ষ লাভ করে । ৫৫-৫৬

অনন্তর সারথি সেই স্থান হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া ভুক্তিমুক্তিদাতা দ্বিভুজ বিষ্ঠল দেবকে দর্শন করিবার নিমিত্ত ভীমরথীতটে আগমন করিল । এই স্থান গোদাবরীর উৎপত্তি ভূমি এবং এইখানেই মহান্‌ ব্রহ্মগিরি বিরাজমান । এই স্থানে ত্র্যম্বকাধিষ্ঠিত গৌতমালয়ে উপস্থিত হইয়া অরুণা-বরুণার মধ্যস্থিত গোদাবরী নদীতে স্নান ও পান করিলে ব্রহ্মহত্যা বিলয় প্রাপ্ত হয় । নরগণ অগণিত তীর্থপরিপূর্ণ ব্রহ্মগিরি দর্শন করিয়া সংসারদুঃখ হইতে মুক্ত হয় এবং মোক্ষ লাভ করিয়া থাকে । ৫৭-৬০

অনন্তর সারথি গৌতমীর উভয় তীরস্থ তীর্থান্বেষণে সমুৎসুক হইয়া ক্রমে পাপনাশিনী মথুরা পুরীতে উপনীত হইল । এই স্থানে সুর-নরগণ স্বায়ম্ভুব দেবের ভজনা করিয়া থাকেন । ইহা ভগবানের আদ্য স্থান; এই মহাস্থান মুক্তিপ্রদ এবং ত্রৈলোক্যপতির জন্মস্থান বলিয়া বেদে এবং শাস্ত্রে সুবিখ্যাত । ইহা সমস্ত দেব ও দ্বিজর্ষিগণ কর্তৃক সেবিত, এবং কালিন্দীর কূলশোভী হইয়া অর্দ্ধচন্দ্রাকারে বিরাজিত । এই পুরী সর্ব তীর্থের নিবাস হেতু একমাত্র পূর্ণমানন্দ সুন্দর, গোবর্দ্ধন-গিরিযুত, পুণ্যদ্রুম-লতাবৃত, দ্বাদশবনান্বিত, মহাপুণ্যাস্পদ এবং শ্রুতির যিনি সারভূত, তাঁহার আধারভূমি । ৬১-৬৫

অতঃপর সারথি চারিদিকে ধর্ম-ধুর ক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র দর্শন করিয়া ঈশান কোণে কাশ্মীর নগর অবলোকন করিল । ৬৬

ঐ নগরে শঙ্খবৎ পাণ্ডুরবর্ণ অভ্রংলিহ গৃহশ্রেণী ধূর্জ্জটির স্পষ্ট অট্যহাস্যাবলীর ন্যায় বিরাজমান । তত্রত্য বিচিত্র প্রাসাদসমূহে সুবর্ণকলস সকল স্বর্গসিন্ধু হইতে মারুত-পাতিত হৈম পদ্মরাজির ন্যায় বিরাজিত । তত্রত্য প্রাসাদ-শিখরের নীল পট্ট পতাকাবলী স্বর্গসিন্ধুর শৈবালবলয়া লতিকার ন্যায় প্রতিভাত । ৬৭-৬৯

ভারতী এই কাশ্মীর নগর আশ্রয় করিয়া নিত্য বাস করিতেছেন । তা যদি না হইবে, তবে বাঙ্ময় কেন যুগপৎ এরূপ কথার উল্লেখ করিবে ! ৭০

সরস্বতী ঐ নগরে চির বিশ্রাম করায় তদীয় বাহন মৃণালচঞ্চু মদালস হংসগণ তথায় নিত্য বিচরণশীল । কলাবিশেষ অবগত হইবার জন্য বিরিঞ্চি কর্তৃক প্রেরিত হংসশ্রেণী যেন তারকাবলীর ন্যায় আসিয়া ঐ নগরে ইতস্ততঃ বিরাজ করিতেছে । ৭১-৭২

তথায় করস্পর্শসুখ স্থলপদ্মরাজি পরিদৃষ্ট হইয়া থাকে । মনে হয়, দানবারি যেন তথাকার নিতস্বিনী-গণের শয়নের জন্যেই ঐ সকল পদ্ম সন্নিবেশ করিয়াছেন । ৭৩

ঐ নগরে দ্বিজাতিগণের শাস্ত্রীয়ালাপ ব্যতীত অন্য কোন আলাপই স্পষ্ট পরিশ্রুত হয় না । ৭৪

তথাকার যজ্ঞধূমব্যপ্ত গগনমণ্ডল মেঘজলে ক্ষালিত হইয়াও কালিমা পরিত্যাগ করে না । তত্রত্য যজ্ঞাগ্নির প্রবল শিখাতাপে চন্দ্রমার সুধা গলিত হইলেও কলঙ্কচ্ছলে তাহাতে যজ্ঞধূম-কালিমার চিহ্ন দেখা যাইতেছে । ৭৫-৭৬

ঐ নগরের ব্রাহ্মণ বালকগণ আজন্ম অভ্যাস-বশেই উপাধ্যায়ের সান্নিধ্য আশ্রয় করিয়া নিখিল কলাশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেছে । ৭৭

তথাকার ব্রাহ্মণপত্নীগণের কঙ্কণ-রব-ঝঙ্কারে ভ্রমদ্‌ভ্রমরগণের গুঞ্জন লুপ্ত হইতেছে । তথায় সমীরণ ব্রাহ্মণপত্নীগণের কপোল-ফলক বারম্বার স্পর্শ করিয়া শাপভয়েই যেন মন্দ মন্দ প্রবাহিত হইতেছে । ৭৮-৭৯

ঐ নগরে দেহিগণকে বর দান করিবার জন্য মাণিক্যেশ্বর নামে চন্দ্রশেখর দেব বাস করিতেছেন । কাশ্মীররাজ মাণিক্যেশ, ভূপালদিগকে জয় করিয়া ঐ চন্দ্রশেখরের পূজা করিয়াছিলেন এবং কাশ্মীর-দেবেশের দিগ্‌জয়োৎসব-অনুষ্ঠানকারী রাজা কর্তৃক বহু মাণিক্য ও প্রচুর ঐশ্বর্য্য দ্বারা ঐ দেব পূজিত হইয়াছিলেন । এই নিমিত্ত সেই হইতে ঐ চন্দ্রশেখর দেব মাণিক্যেশ্বর নাম ধারণ করিতেছেন । ৮০-৮২

সারথি দেখিলেন, ঐ মাণিক্যেশ্বরের দ্বারে একখানি ক্ষুদ্র শকটের উপর থাকিয়া রৈক্য ঋষি গাত্র কণ্ডূয়ন করিতেছেন । ৮৩

রাজা (জ্ঞানশ্রুতি) যে যে চিহ্ন বলিয়া দিয়াছিলেন, তদনুসারে চিনিতে পারিয়া সারথি সত্বর তাঁহার নিকট প্রণত হইলেন এবং প্রণামান্তে রৈক্য ঋষিকে বলিতে লাগিলেন , - হে ব্রহ্মণ ! আপনার নাম কি ? কোন্‌ হেতু আপনি নিরন্তর স্বচ্ছন্দে আছেন ? কি জন্য এস্থানে বিশ্রাম করিতেছেন ? আপনি কি করিতে ইচ্ছুক ? ৮৪-৮৫

সারথির এই কথা শুনিয়া রৈক্যের হৃদয় পরম পুলকে পূর্ণ হইল, তিনি ক্ষণকাল চিন্তা করিয়া সারথিকে কহিলেন, - আমাদিগকে পূর্ণমনোরথ জানিবে, পরন্তু কোন কোন ব্যক্তি আমাদের মনোবৃত্তি জানিয়া তদনুকূল বহুল পরিচর্য্যা বিধান করে । ৮৬-৮৭

সারথি রৈক্যের হৃদ্‌গত ভাব সাদরে গ্রহণ করিয়া ধীরে ধীরে বসুধাধিপের সমীপে উপনীত হইল এবং স্বামিদর্শনে হৃষ্ট হইয়া বদ্ধাঞ্জলিপুটে নৃপতিকে প্রণাম করত এই বৃত্তান্ত নিবেদন করিল । ৮৮-৮৯

সারথির বাক্য শ্রবণে রাজার নয়ন বিস্ময়ে বিস্ফারিত হইল, তিনি রৈক্যের সম্ভাষণার্থ শ্রদ্ধাযুক্ত হইলেন । ৯০

অনন্তর রাজা অশ্বতরীযুগলযুক্ত যান, মুক্তাহার, বসন এবং সহস্র গো গ্রহণ করিয়া তাঁহার উদ্দেশে গমন করিলেন । যোগী রৈক্য কাশ্মীরমণ্ডলের যেস্থানে অবস্থিত ছিলেন, তখন রাজাও সেইস্থানে উপস্থিত হইয়া উক্ত দ্রব্য সকল তাঁহার অগ্রে নিবেদন পূর্বক দণ্ডের ন্যায় ভূপতিত হইলেন । ৯১-৯২

নৃপতি পরম ভক্তিভরে বিনত হইলেন, কিন্তু নৃপতির প্রতি রৈক্যর ক্রোধ হইল, তিনি বলিলেন, - "রে শূদ্র ! তুই নিন্দ্য নৃপতি, তাই আমার বৃত্তি জানিস্‌ না, তোর অশ্বতরীযুত যান, বসন, মুক্তাহার ও পয়স্বনী গবী তুই গ্রহণ কর্‌, এ সকল উঠাইয়া লইয়া যা ।" ৯৩-৯৪

অনন্তর রৈক্যের এতাদৃশ আদেশ শুনিয়া ভূপতি ভয়াকুল হইলেন, তিনি শাপ-ভয়ে তদীয় পাদপদ্মযুগল গ্রহণ করিয়া ভক্তিভরে বলিলেন, হে ব্রহ্মণ ! প্রসন্ন হউন । হে ভগবন্‌ ! আপনার এবম্ভূত অত্যদ্ভুত মাহাত্ম্য কিরূপে সংঘটিত হইয়াছে ? হে বিভো ! প্রসন্ন হইয়া আমার নিকট তাহা তত্ত্বতঃ কীর্তন করুন । ৯৫-৯৭

রৈক্য উত্তর করিলেন, - হে নৃপ ! আমি নিত্য গীতার ষষ্ঠাধ্যায় পাঠ করি, তাহাতেই আমার এই দেবদুঃসহ তেজোরাশি সমুদ্‌ভূত হইয়াছে । ৯৮

তচ্ছ্রবণে সুধী বসুধাধিপ সাদরে রৈক্যের নিকট গীতার ষষ্ঠাধ্যায় অধ্যয়ন করিয়া শ্রুতিজ্ঞান-বলে মুক্ত হইলেন । ৯৯

এদিকে রৈক্যও মাণিক্যেশ্বর সন্নিধানে গীতার ষষ্ঠাধ্যায় পাঠ করিয়া মোক্ষদায়ক সৌখ্য লাভ করিলেন । দেবতারা সকলের বিস্ময় জন্মাইয়া স্বৈরগতি হংসবেশে রৈক্যসমীপে বরদানার্থ আগমন করিয়াছিলেন । ১০০-১০২

যে নর সতত  গীতার এই একোটি মাত্র অধ্যায়ও পাঠ করে, সে বিষ্ণু-পদবী প্রাপ্ত হয়, ইহা নিঃসংশয় । ১০৩


[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৮০ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


গোদাবরী তীরে প্রতিষ্ঠানপুর (পৈথান) নামে এক সুন্দর শহর আছে । সেখানে ভগবান বিষ্ণু পিপ্পলেশ নামে বিখ্যাত । সেখানকার রাজা, জনশ্রুতি, অনন্ত গুণের অধিকারী ছিলেন, তাই প্রজারা তাঁকে খুবই ভালবাসত । তাঁর দান-ধর্ম-কর্মের জন্য সর্বদা সঠিক সময়ে বর্ষণ হত । শস্যক্ষেত্র সর্বদা ফসলে পরিপূর্ণ থাকত । জনগণের মঙ্গলের জন্য তিনি নিয়মিত কূপ ও পুষ্করিণী খনন করতেন ।

দেব-দেবীগণ জনশ্রুতির ওপর সন্তুষ্ট হয়ে, হংসরূপ ধরে তাঁকে আশীর্বাদ করতে তাঁর প্রাসাদে যাওয়ার সময় দেখল ভদ্রশ্ব নামে একটি হংস আগে আগে উড়ে যাচ্ছে । অন্য রাজহংসেরা তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, "ভাই ভদ্রশ্ব, কেন তুমি আগে আগে উড়ছ ? তুমি কি সামনেই মহান রাজা জনশ্রুতির উজ্জ্বল তেজঃপুঞ্জ দেখতে পাচ্ছ না ?" এ কথা শুনে ভদ্রশ্ব অবজ্ঞা ভরে হেসে বললেন , "হে ভাই সব, এই জনশ্রুতি রাজার তেজ কি রৈক্ব মুনির তেজের থেকেও তীব্র ?"

রাজহংসদের কথা শুনে রাজা তৎক্ষণাৎ তাঁর উচ্চ প্রাসাদশীর্ষ থেকে নেমে এসে তাঁর রথের সারথি মহকে ডেকে পাঠিয়ে সে মহামুনি রৈক্বর সন্ধান করতে বললেন । অনেক তীর্থস্থান ভ্রমণের পর মহ কাশ্মীর নামক এক শহরে পদার্পণ করে এক অতি বিশাল দীপ্তিময় শ্বেত অঞ্চল দেখতে পেল । সেখানে অবিরাম পূত যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত হওয়ায় সকল লোককেই দেব-দেবীর মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল । সেখানে মণিকেশ্বর শিবের মন্দিরের দ্বারের কাছে মহ মহামুনি রৈক্বকে দেখতে পেলেন । মহ মুনির পদতলে পতিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "হে মুনিপ্রবর, আপনার নাম কি ? কেন আপনি এখানে আছেন ? আপনি কি করতে ইচ্ছুক ?" উত্তরে মুনি বললেন, "আমি সম্পূর্ণ তুষ্ট । আমার কোন চাহিদা নেই ।"

এরপর মহ ফিরে এসে রাজাকে সব বৃত্তান্ত জানালে রাজা মুনির দর্শনে যেতে মনস্থ করলেন । বহু মূল্যবান উপঢৌকন সঙ্গে নিয়ে সুদৃশ্য রথে আরোহণ করে তিনি কাশ্মীরে রৈক্বমুনির কাছে পৌছলেন । মুনির চরণে পতিত হয়ে মূল্যবান রেশমি বস্ত্র ও মণি-রত্ন তাঁর সামনে রাখলেন । মুনি এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, "হে মূর্খ রাজা, এই সব তুচ্ছ বস্তু তুমি তোমার রথে তোল এবং এখান থেকে চলে যাও ।" পরম ভক্তিতে রাজা তাঁর ক্ষমা ভিক্ষা করে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে মুনিবর, কিভাবে আপনি তপস্যার এত উচ্চ মার্গে পৌঁছালেন এবং ভগবদ্ভক্তি লাভ করলেন ?" রাজার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে রৈক্ব বললেন যে প্রতিদিন তিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায় পাঠ করেন ।

এরপর থেকে রাজা প্রতিদিন ষষ্ঠ অধ্যায় পাঠে নিমগ্ন হলেন । যথাসময়ে পুষ্পক রথ এসে তাঁকে বৈকুণ্ঠে নিয়ে গেল ।

অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায় যিনি নিয়মিত পাঠ বা শ্রবণ করেন, অচিরেই তিনি এই জড় জগৎ থেকে উদ্ধার পাবেন


_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

No comments:

Post a Comment