Showing posts with label Gita-12. Show all posts
Showing posts with label Gita-12. Show all posts

Thursday, March 12, 2015

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা : দ্বাদশ অধ্যায় - ভক্তিযোগ (12-Jagadishchandra)


১|২|৩|৪|৫|৬|৭|৮|৯|১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
(গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ)*

অর্জুন বলিলেন –
সতত ত্বদ্‌গতচিত্ত হইয়া যে সকল ভক্ত তোমার উপাসনা করেন এবং যাঁহারা অব্যক্ত অক্ষরের উপাসনা করেন, এই উভয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সাধক কে ? ১

শ্রীভগবান্‌ কহিলেন -

যাঁহারা আমাতে মন নিবিষ্ট করিয়া নিত্যযুক্ত হইয়া পরম শ্রদ্ধা সহকারে আমার উপাসনা করেন, তাঁহারাই আমার মতে যুক্ততম অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ সাধক । ২

কিন্তু যাহারা সর্বত্র সমবুদ্ধিযুক্ত এবং সর্বপ্রাণীর হিতপরায়ণ হইয়া ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় হইতে প্রত্যাহৃত করিয়া সেই অনির্দেশ্য, অব্যক্ত, সর্বব্যাপী, অচিন্ত্য, কূটস্থ, অচল, ধ্রুব, অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাহারাও আমাকেই প্রাপ্ত হন । ৩,৪

অব্যক্ত নির্গুণব্রহ্মে আসক্তচিত্ত সেই সাধকগণের সিদ্ধি লাভে অধিকতর ক্লেশ হয়; কারণ, দেহধারিগণ অতি কষ্টে নির্গুণ ব্রহ্মবিষয়ক নিষ্ঠা লাভ করিয়া থাকেন । ৫

কিন্তু যাহারা সমস্ত কর্ম আমাতে অর্পণ করিয়া, একমাত্র আমাতেই চিত্ত একাগ্র করিয়া, ধ্যাননিরত হইয়া আমার উপাসনা করেন, হে পার্থ, আমাতে সমর্পিতচিত্ত সেই ভক্তগণকে আমি অচিরাৎ সংসারসাগর হইতে উদ্ধার করিয়া থাকি । ৬,৭

আমাতেই মন স্থাপন কর, আমাতে বুদ্ধি নিবিষ্ট কর, তাহা হইলে দেহান্তে আমাতেই স্থিতি করিবে, ইহাতে সন্দেহ নাই । ৮

হে ধনঞ্জয়, যদি আমাতে চিত্ত স্থির রাখিতে না পার, তাহা হইলে পুনঃপুনঃ অভ্যাসদ্বারা চিত্তকে সমাহিত করিয়া আমাকে পাইতে চেষ্টা কর । ৯

যদি অভ্যাসেও অসমর্থ হও, তবে মৎকর্মপরায়ণ হও (অর্থাৎ শ্রবণ, কীর্তন, পূজাপাঠ ইত্যাদি কর্মের অনুষ্ঠান কর); আমার প্রীতি সাধনার্থ কর্মের অনুষ্ঠান করিলেও তুমি সিদ্ধি লাভ করিবে । ১০

যদি ইহাতেও অশক্ত হও, তাহা হইলে মদ্‌যোগ অর্থাৎ আমাতে কর্মার্পণরূপ যোগ আশ্রয় করিয়া সংযতাত্মা হইয়া সমস্ত কর্মের ফল ত্যাগ কর । ১১

অভ্যাস অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ, জ্ঞান অপেক্ষা ধ্যান শ্রেষ্ঠ । ধ্যান অপেক্ষা কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ । এইরূপ ত্যাগের পরই শান্তি লাভ হইয়া থাকে । ১২

যিনি কাহাকেও দ্বেষ করেন না; যিনি সকলের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন ও দয়াবান্‌; যিনি সমত্ববুদ্ধি ও অহঙ্কারবর্জিত, যিনি সুখে দুঃখে সমভাবাপন্ন, সদা সন্তুষ্ট, সমাহিতচিত্ত, সংযত-স্বভাব, দৃঢ়বিশ্বাসী, যাহার মন বুদ্ধি আমাতে অর্পিত, ঈদৃশ মদ্ভক্ত আমার প্রিয় । ১৩,১৪

যাহা হইতে কোন প্রাণী উদ্বেগ প্রাপ্ত হয় না এবং যিনি স্বয়ংও কোন প্রাণি-কর্তৃক উত্যক্ত হন না এবং যিনি হর্ষ, অমর্ষ, ভয় ও উদ্বেগ হইতে মুক্ত, তিনি আমার প্রিয় । ১৫

যিনি সর্ব বিষয়ে নিঃস্পৃহ, শৌচসম্পন্ন, কর্তব্য-কর্মে অনলস, পক্ষপাতশূন্য, যাহাকে কিছুতেই মনঃপীড়া দিতে পারে না এবং ফল কামনা করিয়া যিনি কোন কর্ম আরম্ভ করেন না, এতাদৃশ ভক্ত আমার প্রিয় । ১৬

যিনি ইষ্টলাভে হৃষ্ট হন না, অপ্রাপ্য বস্তুলাভে আকাঙ্ক্ষা করেন না, যিনি কর্মের শুভাশুভ ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করিয়াছেন, ঈদৃশ ভক্তিমান্‌ সাধক আমার প্রিয় । ১৭

যিনি শত্রু-মিত্রে, মান-অপমানে, শীত-উষ্ণে, সুখ-দুঃখে সমত্ববুদ্ধি-সম্পন্ন, যিনি সর্ববিষয়ে আসক্তিবর্জিত, স্তুতি বা নিন্দাতে যাঁহার তুল্য জ্ঞান, যিনি সংযতবাক্‌, যদ্দৃচ্ছালাভে সন্তুষ্ট, গৃহাদিতে মমত্ববুদ্ধি-বর্জিত, এবং স্থিরচিত্ত, ঈদৃশ ভক্তিমান্‌ ব্যক্তি আমার প্রিয় । ১৮,১৯

যাঁহারা শ্রদ্ধাবান্‌ ও মৎপরায়ণ হইয়া পূর্বোক্ত অমৃততুল্য ধর্মের অনুষ্ঠান করেন, সেই সকল ভক্তিমান্‌ আমার অতীব প্রিয় । ২০
___________________________

১) “এবং” – এইরূপে অর্থাৎ দশম অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে যে নিষ্কাম কর্মযুক্ত ভক্তির সাধন উক্ত হইয়াছে, তাহাই লক্ষ্য করা হইয়াছে । এইরূপ সগুণ ঈশ্বরের উপাসক এবং নির্গুণ ব্রহ্মোপাসক; ইহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে, ইহাই অর্জুনের প্রশ্ন ।

২) এই শ্লোকে স্পষ্টই বলা হইল যে ব্যক্তোপাসনা বা ভক্তিমার্গই শ্রেষ্ঠ । তবে জ্ঞানমার্গে নির্গুণ ব্রহ্মোপাসনা কি নিষ্ফল ? না, তা নয় । জ্ঞানমার্গে ব্রহ্মোপাসনা দ্বারাও তাঁহাকে পাওয়া যায় ।

৪) কূট = মায়া, অজ্ঞান, মিথ্যাভূত জগৎ-প্রপঞ্চ; গিরিশৃঙ্গ
কূটস্থ : নানা অর্থ হয় - (i) যিনি এই মিথ্যাভূত মায়িক জগতের অধিষ্ঠানরূপে অবস্থিত, অথচ নিত্য নির্বিকার, (ii) গিরিশৃঙ্গবৎ নিশ্চলভাবে অবস্থিত, (iii) সকল বস্তুর মূলে অবস্থিত, (iv) অপরিবর্তনীয় ।

৫) দেহধারিগণের পক্ষে নির্গুণ ব্রহ্মবিষয়ক নিষ্ঠা লাভ করা অতি কষ্টকর । কারণ, দেহাত্মবোধ বিদূরিত না হইলে নির্গুণ ভাবে স্থিতিলাভ করা যায় না ।

৬,৭) আমার ভক্তগণ আমার উপাসনা করিলে আমার প্রসাদে অনায়াসে সিদ্ধিলাভ করিতে পারে । সেই উপাসনার দুইটি কথা উল্লেখযোগ্য - (১) সর্বকর্ম আমাতে সমর্পন । (২) অনন্যভক্তি যোগে আমার উপাসনা । সুতরাং ভক্তিমার্গেও কর্মত্যাগের কোন প্রয়োজন নাই । ঈশ্বরে সর্বকর্ম সমর্পণের উপদেশ হইতে বরং ইহাই বুঝা যায় যে ভক্তিমার্গেও নিষ্কাম ভাবে কর্ম করাই কর্তব্য ।

৮) ব্যক্ত ও অব্যক্তের উপাসনা - ভক্তিমার্গের শ্রেষ্ঠতা
পরমেশ্বরের দুই বিভাব - ব্যক্ত ও অব্যক্ত । যিনি সগুণ, সাকার, স্বরূপে লীলাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তিনিই আবার বিশ্বাত্মা, অব্যক্ত নির্গুণ-স্বরূপে তিনি অচিন্ত্য, অনির্দেশ্য, নির্বিশেষ পরব্রহ্ম । শ্রীভগবান বলিয়াছেন, ভগবদ্ভক্তই শ্রেষ্ঠ সাধক কিন্তু যাঁহারা কেবল আত্মস্বাতন্ত্র্যবলে মায়া-নির্মুক্ত হইয়া ব্রহ্মসাক্ষাৎকারে যত্ন করেন, তাঁহারাও তাঁহাকেই প্রাপ্ত হন । কিন্তু দেহাভিমানী জীবের পক্ষে দেহাত্মবোধ বিদূরিত করিয়া ব্রহ্মচিন্তা করা অধিকতর ক্লেশকর । ইহাদ্বারা ভক্তিমার্গ অধিকতর সুলভ ও সুখসাধ্য বলিয়া কথিত হইল ।

১০) ভগবৎকর্মপরায়ণ :  যিনি নিম্নে উল্লিখিত ভক্তিশাস্ত্রের নববিধ ভক্তির সাধন করেন :- 
  1. শ্রবণ
  2. কীর্তন
  3. স্মরণ
  4. পদসেবা
  5. অর্চনা
  6. বন্দনা
  7. দাস্য
  8. সখ্য
  9. আত্মনিবেদন
১২) 'বর্তমান সময়ে গীতার ভক্তিযুক্ত-কর্মযোগ সম্প্রদায় লুপ্তপ্রায় হইয়া গিয়াছে । এই সম্প্রদায় পাতঞ্জল-যোগ, জ্ঞান ও ভক্তি এই তিন সম্প্রদায় হইতে পৃথক এবং এই কারণেই ঐ সম্প্রদায়ের কোনো টীকাকার পাওয়া যায় না, অতএব আজকাল গীতার উপর যত টীকা পাওয়া যায় সেগুলিতে কর্মফলত্যাগের শ্রেষ্ঠতা অর্থবাদাত্মক বুঝানো হইয়াছে । কিন্তু আমার মতে উহা ভুল ।' - [গীতারহস্য, লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক]

নিষ্কাম কর্মযোগের শ্রেষ্ঠতা :
গীতার মতে কর্মযোগই সর্বাপেক্ষা সহজসাধ্য কারণ ইহা সর্বাঙ্গ সুন্দররূপে সম্পন্ন করিতে না পারিলেও একেবারে নিষ্ফল হয় না । আর সুসাধ্য হইলেই যে নিম্নস্তরের হইবে, এ-কথার কোনো যুক্তি নাই । দ্বিতীয়ত, ইহাতে বিধি-নিষেধের কঠোর গণ্ডীর মধ্যে থাকিতে হয় না, সুতরাং পদে-পদে বাধা-বিঘ্নের আশঙ্কা থাকে না । তৃতীয়ত, ইহাতে ভগবানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতে হয় । সুতরাং সাধকের লাভালাভ, সিদ্ধি-অসিদ্ধি বিষয়ে আর-কোনো ভাবনা-চিন্তা করিতে হয় না, কেননা তাঁহার অভয়বাণীই আছে, একান্তে আমার শরণ লও; সব আমিই করিয়া দিব, ভয় নাই । অন্যান্য সকল সাধনায়ই আত্মস্বাতন্ত্র্যের উপর নির্ভর করিতে হয়, পদস্খলন হইলেই বিপদ । এ-ক্ষেত্রে কিন্তু তিনি সর্বদাই হাত ধরিয়া আছেন, পতনের ভয় কি ?

ব্রহ্মচন্তক জ্ঞানবাদীরা বলেন যে, অর্জুন উচ্চাঙ্গের উপাসনায় অনধিকারী, তাই শ্রীভগবান চিত্তশুদ্ধির জন্য এই সর্বনিম্নস্তরের কর্মযোগ তাঁহাকে উপদেশ দিয়াছেন । কিন্তু স্বয়ং শ্রীভগবান বলিয়াছেন যে, নির্গুণ উপাসনা দেহধারীর পক্ষে দুঃসাধ্য । তবে যিনি বিশ্বরূপ দেখিতে অধিকারী হইয়াছিলেন, তিনি যদি অনধিকারীই হন, তবে সেই অনধিকারীর দলে থাকাটাই আমাদের মতো ক্ষুদ্র জীবের শ্রেয়ঃকল্প ও সকল সাম্প্রদায়িক মত স্বকপোল-কল্পিত ।

১৫) অমর্ষ = অভিলষিত বস্তুর অপ্রাপ্তিতে অসহিষ্ণুতা (শঙ্কর); পরের লাভে অসহিষ্ণুতা, পরশ্রীকাতরতা (শ্রীধর) ।

১৭) শুভাশুভপরিত্যাগী : যিনি স্বর্গাদি-কামনায় অথবা নরকাদির ভয়ে কোনো কর্ম করেন না, যিনি ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত, সমত্ববুদ্ধিযুক্ত, সুখদুঃখ, পাপপুণ্যাদি দ্বন্দ্ববর্জিত ।

১৮-২০) ধর্মামৃত : কর্মফলত্যাগ অর্থাৎ কামনাত্যাগেই পরম শান্তি । 'এখন বুঝিলে ভক্তি কি ? ঘরে কপাট দিয়া পূজার ভাণ করিয়া বসিলে ভক্ত হয় না, ... 'হা ঈশ্বর ! হা ঈশ্বর !' বলিয়া গোলযোগ করিয়া বেড়াইলে ভক্ত হয় না । যে আত্মজয়ী, যাহার চিত্ত সংযত, যে সমদর্শী, যে পরহিতে রত, সেই ভক্ত । ঈশ্বরকে সর্বদা অন্তরে বিদ্যমান জানিয়া যে আপনার চরিত্র পবিত্র না করিয়াছে, যাহার চরিত্র ঈশ্বরানুরাগী নহে, সে ভক্ত নহে । যাহার সমস্ত চরিত্র ভক্তির দ্বারা শাসিত না হইয়াছে সে ভক্ত নহে । গোতোক্ত স্থূলকথা এই । এরূপ উদার এবং প্রশস্ত ভক্তিবাদ জগতে আর কোথাও নাই । এই জন্য ভগবদ্গীতা জগতের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ।' - [বঙ্কিমচন্দ্র]
ভক্তের লক্ষণ [১২|৬-৭, ১৩-২০] = স্থিতপ্রজ্ঞের লক্ষণ [২|৫৫-৭৫] = জ্ঞানীর লক্ষণ [১৩|৭-১১]
বস্তুত পরাভক্তি ও পরমজ্ঞানে কোনো পার্থক্য নাই । কামনাত্যাগ উভয়েরই মূলকথা এবং ত্যাগজনিত শান্তি ও সমত্ববুদ্ধি উহার সুধাময় ফল ।
___________________________

Online Source: 
http://geetabangla.blogspot.com/2013/07/blog-post_5716.html

*Hard Copy Source:
"Sri Gita" or "Srimadbhagabadgeeta" by Gitashastri Jagadish Chandra Ghosh & Anil Chandra Ghosh. 26th Edition - June 1997 (1st Edition, 1925 from Dhaka now in Bangladesh). Published by Subhadra Dey (Ghosh), Presidency Library, 15 Bankim Chatterjee Street, Kolkata-700073. Printed by Web Impressions Pvt.Ltd., 34/2 Beadon Street, Kolkata-700006.



Disclaimer: This site is not officially related to Presidency Library, Kolkata. This is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

Tuesday, August 12, 2014

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : দ্বাদশ অধ্যায় – ভক্তিযোগ (Gita : Chapter 12)

১|২|৩|৪|৫|৬|৭|৮|৯|১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
 (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)*
 
[২য় হইতে ১০ম অধ্যায় পর্যন্ত নির্বিশেষ নিরুপাধি পরমাত্মা অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা এবং সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান্‌ পরমেশ্বরের উপাসনা কথিত হইয়াছে । বিশ্বরূপাধ্যায়ে উপাসনার নিমিত্ত আপনার ঈশ্বরীয় আদ্য সমস্ত জগদাত্ম বিশ্বরূপ অনুগ্রহপূর্বক অর্জুনকে দেখাইয়া তাঁহাকে 'মৎকর্মকৃৎ' ইত্যাদি হইতে বলিয়াছেন । এই উভয় প্রকার উপাসনার কোন্‌টি বিশিষ্টতর ইহা জানিতে ইচ্ছা করিয়া -]

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন -
হে ভগবান্‌ এইভাবে নিরন্তর ভগবৎকর্মাদিতে নিযুক্ত হইয়া যে-সকল অনন্যশরণ ভক্ত সমাহিতচিত্তে আপনার উপাসনা করেন এবং যাঁহারা সমস্ত বাসনা ও কর্ম পরিত্যাগপূর্বক সর্বোপাধিরহিত ইন্দ্রিয়াতীত অক্ষর ব্রহ্মের উপাসনা করেন, এই উভয়ের মধ্যে কাহারা শ্রেষ্ঠ যোগী ? ১

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
পরমেশ্বরের ভজন দ্বারাই জীবের উদ্ধার হয় - এই বিশ্বাস দৃঢ় করিয়া যাঁহারা আমার বিশ্বরূপে মনোনিবেশপূর্বক মচ্চিত্ত হইয়া অহোরাত্র অতিবাহিত করেন, তাঁহারাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ যোগী । ২

কিন্তু যাঁহারা সর্বদা ইষ্ট-ও অনিষ্ট-প্রাপ্তিতে রাগ-ও দ্বেষরহিত, সকল প্রাণীর কল্যাণে নিযূক্ত এবং ইন্দ্রিয়সংযমী, যাঁহারা শব্দাদিপ্রমাণ দ্বারা অপ্রতিপাদ্য, প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের অগোচর, সর্বব্যাপী মনের অতীত, কূটস্থ (মায়াধিষ্ঠান) অচ্যুতস্বরূপ এবং শাশ্বত নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহারা আমাকেই প্রাপ্ত হন । ৩-৪

যাঁহাদের চিত্ত নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্মে অভিনিবিষ্ট, তাঁহাদিগকে সিদ্ধিলাভের জন্য ভগবৎকর্মাদিপরায়ণ সগুণ উপাসক অপেক্ষা অধিকতর ক্লেশ পাইতে হয়; কারণ নির্গুণ ব্রহ্মে নিষ্ঠালাভ করা দেহাভিমানী ব্যক্তিগণের পক্ষে অতিশয় কষ্টকর । ৫

হে পার্থ, কিন্তু যাঁহারা সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণপূর্বক 'আমিই পরম পুরুষার্থরূপে উপাস্য' - এইভাবে মৎপরায়ণ হইয়া অনন্য যোগের দ্বারা আমার উপাসনা ও ধ্যান করেন, মদ্গতচিত্ত সেই সকল ভক্তকে মৃত্যুময় সংসারসাগর হইতে আমি অচিরে উদ্ধার করি । ৬-৭

অতএব আমাতেই তুমি মন সমাহিত কর, আমাতেই বুদ্ধি নিবিষ্ট কর । এইরূপ করিলে দেহান্তে তুমি নিশ্চয়ই মৎস্বরূপে স্থিতিলাভ করিবে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই । ৮

হে ধনঞ্জয়, যদি তুমি আমাতে স্থিরভাবে চিত্ত সমাহিত করিতে না পার, তাহা হইলে অভ্যাস-যোগের দ্বারা আমাকে লাভ করিতে যত্ন কর । ৯

যদি তুমি এই প্রকার অভ্যাস করিতে সমর্থ না হও, তবে ভগবৎপ্রীতিকর কর্মে একনিষ্ঠ হও । কারণ আমার কর্ম করিতে করিতেই তুমি ক্রমে সিদ্ধিলাভ করিবে । ১০

আর যদি ইহাও করিতে অক্ষম হও, তবে ইন্দ্রিয়সংযম-পূর্বক আমাতে সর্বকর্ম-সমর্পণরূপ যোগ আশ্রয় করিয়া সর্বপ্রকার কর্মের ফলত্যাগ কর । ১১

অবিবেকপূর্বক অভ্যাস অপেক্ষা শ্রুতি ও যুক্তি দ্বারা আত্মনিশ্চয় উৎকৃষ্ট । এই প্রকার আত্মনিশ্চয় অপেক্ষা জ্ঞানপূর্বক ধ্যান শ্রেষ্ঠ । জ্ঞানপূর্বক ধ্যান হইতে কর্মফলত্যাগ শ্রেষ্ঠ । কর্মফলত্যাগের অব্যবহিত পরেই সহেতুক সংসার নিবৃত্তিরূপ পরম শান্তিলাভ হয় । ১২

যিনি সকল প্রাণীর প্রতি দ্বেষহীন, মিত্রভাবাপন্ন, দয়ালু, মমত্ববুদ্ধিশূন্য, নিরহংকার, সুখে আসক্তি ও দুঃখে দ্বেষবর্জিত, ক্ষমাশীল, সর্বদা সন্তুষ্ট, সদা সমাহিতচিত্ত, সদা সংযতস্বভাব, সদা তত্ত্ববিষয়ে দৃঢ়নিশ্চয় এবং যাঁহার মন ও বুদ্ধি সর্বদা আমাতে অর্পিত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত । ১৩-১৪

যিনি কাহাকেও উদ্বিগ্ন করেন না, যিনি কাহারও দ্বারা উদ্বিগ্ন হন না এবং যিনি হর্ষ ও বিষাদ, ভয় ও উদ্বেগ হইতে মুক্ত, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত । ১৫

যিনি নিঃস্পৃহ, বাহ্যাভ্যন্তর শুচি, দক্ষ, পক্ষপাতশূন্য, ভয়হীন এবং সকাম কর্মের অনুষ্ঠান-ত্যাগী, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত । ১৬

যিনি ইষ্টপ্রাপ্তিতে হৃষ্ট হন না, অনিষ্টপ্রাপ্তিতে দ্বেষ করেন না, প্রিয়বিয়োগে শোক করেন না, অপ্রাপ্ত ইষ্টবস্তু আকাঙ্ক্ষা করেন না এবং শুভাশুভ সকল কর্ম পরিত্যাগ করিয়াছেন, তিনি আমার প্রিয় ভক্ত । ১৭

যিনি আসক্তিহীন এবং শত্রু ও মিত্রে সমবুদ্ধি, যিনি সম্মানে ও অপমানে অবিচলিত, যিনি শীতোষ্ণজনিত সুখে ও দুঃখে নির্বিকার, পরমাত্মাতে স্থিরবুদ্ধি, প্রশংসায় হর্ষ ও নিন্দায় বিষাদশূন্য সুতরাং সংযতবাক্‌, সর্বাবস্থায় যৎকিঞ্চিৎ-লাভে সন্তুষ্ট এবং নির্দিষ্টবাসস্থানহীন তিনি আমার প্রিয় ভক্ত । ১৮-১৯

যে-সকল মৎপরায়ণ ভক্ত এই মোক্ষদায়ক ধর্ম উক্তপ্রকারে শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া সাধন করেন, তাঁহারাই আমার অতীব প্রিয় । ২০

ভগবান্ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে ভক্তিযোগ নামক দ্বাদশ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________


৩) কূট = মায়া, রাশি, গিরিশৃঙ্গ
কূটস্থ = মায়াপ্রপঞ্চের অধিষ্ঠাণরূপে স্থিত, গিরিশৃঙ্গবৎ নিশ্চলভাবে অবস্থিত, প্রস্তরতুল্য নির্বিকার

উপাসনা = শাস্ত্রানুযায়ী উপাস্য বস্তুকে চিত্তের বিষয়ীকরণের দ্বারা তাঁহার সমীপস্থ হইয়া তৈলধারার ন্যায় প্রত্যয়প্রবাহে দীর্ঘকাল অবস্থিতির নাম ।

৫) দেহাভিমানী = স্থূল ও সূক্ষ্ম দেহে যাঁহার অভিমান অর্থাৎ 'আমি'-বুদ্ধি আছে, যাঁহার দেহে আত্মবুদ্ধি

৬) ভগবানের সগুণ জগদাত্মরূপ অথবা তাঁহার শ্রীকৃষ্ণ, রাঘব, নরসিংহাদি দ্বিভুজ, চতুর্ভুজ প্রভৃতি রূপ । - [শ্রীমধুসূদন সরস্বতী] । এইরূপ উপাসকগণ বহু শ্রবণাদিরূপ অধিকতর ক্লেশ ব্যতীতই ভগবদ্দত্ত জ্ঞান দ্বারা জন্মমৃত্যুরূপ সংসৃতি হইতে মুক্ত হন ।
 
৯) অভ্যাস = সকল বিষয় হইতে চিত্তকে সমাহৃত করিয়া কোন দেবতার মানসমূর্তি বা প্রতিমাদি একমাত্র অবলম্বনে উহাতে পুনঃপুনঃ স্থাপনের নাম । নারদ যুধিষ্ঠিরকে বলিয়াছিলেন - "রাজন্‌, যে কোন উপায়ে হউক শ্রীকৃষ্ণে মনোনিবেশ করা উচিত ।" - [ভাগবত, ৭|১|৩১]

১০) ভগবৎপ্রীতিকর কর্ম = একাদশী, উপবাস, ব্রতচর্যা, পূজা ও ইষ্টনামজপাদি
 
১২) অবিবেকপূর্বক অভ্যাস = জ্ঞানার্থ শ্রবণাভ্যাস বা নিশ্চয়পূর্বক ধ্যানাভ্যাস । - [আনন্দগিরি]

কর্মফলত্যাগ : শ্রীভগবান্‌ এখানে অবশ্য কর্তব্য কর্মের ফলত্যাগের প্রশংসা করিতেছেন । শ্রৌত ও স্মার্ত কর্মের ফলরূপ সর্বকামনাত্যাগের অনন্তরই জ্ঞাননিষ্ঠের শান্তিলাভ প্রসিদ্ধ । - [কঠ উপঃ, ২|৩|১৪] উক্ত কামনাত্যাগের সহিত কর্মফলত্যাগের সাদৃশ্যবশতঃ সর্বকর্মফলত্যাগের এই স্তুতি । কামনাত্যাগ ও কর্মফলত্যাগ, উভয়ই ত্যাগ - এই সাদৃশ্য ।
 
১৫) যিনি প্রাণিমাত্রকে উদ্বেগ না দিয়া সকরুণ পিতার ন্যায় পুত্রবৎ সকলকে অবলোকন করেন, সেই শুদ্ধচিত্ত ও প্রেমযুক্ত ভক্তের প্রতি ভগবান্‌ শীঘ্র প্রসন্ন হন । - [মহাভারত]
 
ভগবৎপরায়ণ ব্যক্তিগণ কোন বিষয়েই ভীত হন না । - [ভাগবত, ৬|১৭|২৮]

১৬) দক্ষ = উপস্থিত কার্যে তৎক্ষণাৎ যথাযথ প্রতিপত্তি-ও প্রবৃত্তি-যুক্ত
 
১৮,১৯) ব্রাহ্মণ = যিনি যে-কোন পরিধেয় দ্বারা শরীর আবৃত করেন, যে-কোন খাদ্যদ্রব্য ভোজন করেন এবং যে-কোন স্থানে শয়ন করিয়া রাত্রিযাপন করেন, দেবতাগণ তাঁহাকেই ব্রাহ্মণ বলিয়া থাকেন । - [মহাভারত, শান্তিপর্ব]

২০) ভক্ত :  পরমার্থ জ্ঞানলক্ষণা ভক্তিকে যিনি আশ্রয় করিয়াছেন, সেই জ্ঞানী = ভক্তই এখানে উদ্দিষ্ট ।
 
শ্রদ্ধা = আস্তিক্যবুদ্ধি, ঈশ্বরের অস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাস । শ্রদ্ধার আবির্ভাবে ধর্মজীবন উজ্জ্বল হয় । শ্রদ্ধার অভাবে ধর্মজীবন অন্ধকার । শ্রদ্ধা সাধনলভ্য । বৈদিক ঋষিগণ শ্রদ্ধার আহ্বান করিতেন ।
 
সাধন : মুক্ত পুরুষের যাহা স্বাভাবিক ধর্ম, মুমুক্ষুগণের তাহাই যত্নপূর্বক অনুষ্ঠেয় । আত্মজ্ঞান যাঁহার উৎপন্ন হইয়াছে, 'অদ্বেষ্টা' প্রভৃতি গুণ বিনাযত্নে তাঁহার লাভ হয় । সে সকল গুণের সাধন তাঁহাকে করিতে হয় না । সেইগুলি মুমুক্ষুগণের সাধনলভ্য । - [নীলকণ্ঠ]

প্রিয় : প্রিয় শব্দ ভক্ত ও ভগবানের (আত্মিক) অভেদত্ববাচক ।
_________________________________________

*Hard Copy Source:
"Srimadbhagabadgeeta" translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint - January, 1997 (1st Edition - 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation

Disclaimer:
This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. This is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]