Showing posts with label Gita-Glory. Show all posts
Showing posts with label Gita-Glory. Show all posts

Sunday, September 6, 2015

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-18)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

পার্বতী কহিলেন
হে শিব ! আপনি গীতার সপ্তদশাধ্যায়গৌরব বর্ণনা করিয়াছেন, এক্ষণে অষ্টাদশাধ্যায়মহিমা বর্ণন করুন । ১

মহাদেব কহিলেন
হে গিরিকুমারি ! চিদানন্দনিষ্পাদক পূণ্য অষ্টাদশাধ্যায়মাহাত্ম্য শ্রবণ কর । এই অষ্টাদশাধ্যায় সমস্ত শাস্ত্রসর্বস্ব, কর্ণরসায়ন, সংসার-যাতনজালের বিদারক, অবিদ্যোন্মূলনক্ষম ও সিদ্ধগণের পরম রহস্য । ইহা চৈতন্যময়, কৈটভরিপুর অগ্রগণ্য পরম পদ, বিবেকবল্লরীর মূল, কামক্রোধম্লাপহ, পুরন্দরাদি দেবগণের চিত্তবিশ্রান্তিকারক, সনকাদি মহাযোগিজনের মনোরঞ্জনকারণ, এবং ইহার পাঠমাত্রে কালকিঙ্করের গর্জন পরাভূত হয় । ইহা অষ্টোত্তরশত ব্যাধির সমূলে উন্মূলনকারক । হে হংসগামিনি ! ইহা হইতে রহস্য আর কিছুই নাই, ইহা উপতাপত্রয়হর ও মহাপাতকনাশম । কাল সকলের মধ্যে আমি যেমন মহাকাল এবং পশুসমূহ মধ্যে যেমন কামধৃক পশুপতি; মুনীন্দ্রগণের মধ্যে যদ্রূপ ব্যাস এবং ব্যাসসমূহ মধ্যে যেমন ব্রহ্মবিত্তম; সুরগণ মধ্যে যেরূপ শক্র এবং শক্র হইতে যেরূপ গুরু বৃহস্পতি; রসসমূহ মধ্যে কৈলাস, দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র, তীর্থ মধ্যে পুষ্কর, পুষ্প মধ্যে পঙ্কজ, পতিব্রতা নারীর মধ্যে অরুন্ধতী, যজ্ঞ মধ্যে অশ্বমেধ, উদ্যান মধ্যে নন্দন, রুদ্রগণ মধ্যে আমার অনুগ বীরভদ্র, দান মধ্যে ভূমিদান, সিন্ধু মধ্যে গৌতমী ও ইহলোক সকলের মধ্যে ধর্ম-কর্মের জন্য যেরূপ হরিক্ষেত্র শ্রেষ্ঠ - ভূবন মধ্যে তদ্রূপ গীতার অষ্টাদশাধ্যায়মাহাত্ম্য মহনীয় । হে পার্বতি ! এ বিষয়ে ভক্তিপূর্বক একটী পুণ্যাখ্যান শ্রবণ কর । ইহা শ্রবণ মাত্রে জীব পাপ হইতে মুক্ত হয় । ২-১৫

মেরুমহীধরের শৃঙ্গে রম্যা অমরাবতীপুরী বিরাজিতা পুরাকালে আমার আমোদের জন্য বিশ্বকর্মা এই পুরী নির্মাণ করেন । এই পুরী নিরন্তর গুণযুতা কোটিগীর্বাণসেবিতা, তেজঃপুঞ্জবতী ও সাক্ষাৎ ব্রহ্মবিদ্যার ন্যায় বিশ্রুতা । চতুরাননের পুরাবধি মেরুশিখরের কামদ প্রাসাদসমূহ চিন্তামণি শিলায় আবদ্ধ ও জয়যুক্ত । এই পুরীর কল্পদ্রুমচ্ছায়ায় সুখাসীনা শচী শ্যামলাঙ্গী গন্ধর্বাঙ্গনাদিগের মুখে গান শ্রবণ করেন । এখানে বাসব বাস করেন, দেবগণ কর্তৃক দলিতায় দৈত্যগণের শোণিতকল্লোলে অত্রত্য স্বর্গগঙ্গা লোহিতবর্ণ প্রাপ্ত হইয়াছেন; এখানে পুরাতন সুধার স্বাদ স্মরণ করিয়া ক্ষুৎকাম স্বর্গবাসীরা প্রত্যহ ইন্দুকলা পান করিয়া থাকেন । এবম্ভূত কৈবল্যকল্প সেই অমরপুরীতে পূর্বে শচীসমন্বিত শ্রীমান্‌ সুররাজ সর্ব গীর্বাণগণ-নিষেবিত হইয়া বাস করিতেন । ১৬-২২

একদা সুরাধিপ সুখোপবিষ্ট, এমন সময়ে বিষ্ণুদূতগণে অনুগম্যমান পরমতেজস্বী এক পুরুষ আসিয়া উপস্থিত হইল । সহস্রলোচন সেই মহাপুরুষকে সমাগত অবলোকন করিলেন । অনন্তর পুরন্দর তাঁহার তেজে অভিভূত হইয়া মণিময় সিংহাসন হইতে সত্বর মণ্ডপপীঠে পতিত হইলেন । সুররাজ সিংহাসন হইতে প্রস্থান করিলে বিষ্ণুদূতগণ নূতন ইন্দ্র কল্পনা করিয়া তাঁহার মস্তকে দেবসাম্রাজ্যের চিহ্ন উষ্ণীষ বন্ধন করিয়া দিলেন । অনন্তর তাঁহার অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হইল, নূতন মহেন্দ্রের বাম ক্রোড়ে শচী আসিয়া আরোহণ করিলেন; তৎক্ষণাৎ দিব্য দুন্দুভি বাজিয়া উঠিল, স্বর্গসঙ্গীতে প্রসন্ন চিত্ত সুরগণ ও সুরনারীরা দিব্য রত্নরাজি দ্বারা তাঁহার নীরাজনা করিলেন । অনন্তর ঋষি সকল বিবিধ বেদবাদদ্বারা আশীর্বাদ প্রদান করিলেন, রম্ভাদি অপ্সরারা তাঁহার সম্মুখে নৃত্য করিতে লাগিল এবং গন্ধর্বগণ ললিতালাপে মঙ্গলকৌতুক করিল । ২২-২৮

এইরূপে নানাবিধ উৎসবে নূতন ইন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইলে শক্র শতাশ্বমেধ ব্যতীত ইন্দ্রত্বপ্রাপ্তি পর্য্যালোচনা করিয়া পরম বিস্ময় প্রাপ্ত হইলেন । তিনি ভাবিলেন, - আমি পথমধ্যে তড়াগাদি নির্মাণ করি নাই, পান্থবিশ্রান্তিকারক মহাতরু রোপণ করি নাই, অহো ! আমি কদাচ ত্রিপুরভৈরব দেবকে দর্শন করি নাই এবং কুবেরপুরবাসিনী দেবী মদালসাকে পূজা করি নাই । আমি মেঘঙ্করে স্থিত শাঙ্গধর নিরীক্ষণ করি নাই, বিরজে স্নান করি নাই, কাশীপুরী দর্শন করি নাই, এবং আমি দেববাটিকাবাসী নরহরিকে অবলোকন করি নাই । আমি এরণ্ডবিষ্ণু হেরম্বের প্রতি শীলাচার প্রদর্শন করি নাই, পুরবাসিনী রেণুকা মাতাকে কদাচ দর্শন করি নাই এবং কখনও দানাপুরবাসিনী দেবীকে ভক্তিভরে পূজা করি নাই, আমি ত্রিপুরে ত্রিলিঙ্গ ত্র্যম্বককে ভক্তিসহকারে দর্শন করি নাই, শার্দুলতড়াগস্থিত সোমনাথকে নিরীক্ষণ করি নাই, এবং রেবাপুরবাসী ঘুসৃণেশ দেবকেও দর্শন করি নাই । আমি নাগদন্তপুরস্থিত বিখ্যাত নাগনাথকে দেখি নাই, পর্ণগ্রামবাসী মহামৃতেশ্বরকে দর্শন করি নাই । আমি বেঙ্কটাদ্রিনিলয় শ্রীনিবাসকে উত্তমরূপে দর্শন করি নাই এবং কাবেরীর কর্ণিকাতীরে শ্রীরঙ্গকে অবলোকন করি নাই । আমি কারাগারে রোদন পরায়ন দীন অনাথগণের মোচন করি নাই, দুর্ভিক্ষকালে অন্নদান দ্বারা প্রাণিগণের সৎকার করি নাই, এবং কুত্রাপি নির্জলদেশে উদক সংস্থান করি নাই । আমি গৌতমীতীর্থে স্নান ও হরিণেশ্বরকে দর্শন করি নাই, বৃহস্পতি কন্যারাশিগত হইলে কৃষ্ণবেণ্যায় স্নান ও ভূমি দান করি নাই । কবিগণ আমা কর্তৃক পূজিত হন নাই । আমা দ্বারা তীর্থসমূহে সত্রাপ্রতিষ্ঠা বা গ্রামে যজ্ঞানুষ্ঠান হয় নাই, পথমধ্যে বহুজলা পুষ্করিণী প্রতিষ্ঠা আমি করি নাই, কুত্রাপি ব্রহ্মা বিষ্ণু ও শিবের প্রাসাদ প্রস্তুত করি নাই এবং আমি কদাচ ভয়াক্রান্ত ও শরণাগতের পরিত্রাণ করি নাই । এ ব্যাক্তি এমন কি একটী পুণ্য করিয়াছে যে, এখানে এই দেবদত্ত পদ অর্জন করিল ? ২৯-৪৪

পুরন্দর এইরূপে চিন্তাকুল ও অকস্মাৎ সাম্রাজ্যনাশে নিবিড় দুঃখে খিন্ন হইয়া হরিকে ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবার জন্য ক্ষীরসাগরতীরে উপনীত হইলেন এবং তথায় প্রবেশপূর্বক নিদ্রিত গোপেন্দ্রকে স্তব করিতে লাগিলেন । ৪৫-৪৬

ইন্দ্র কহিলেন
হে রমাকান্ত ! পূর্বে আপনার প্রীতির জন্য আমি শতাশ্বমেধ করিয়াছিলাম, সেই পুণ্যেই আমার পুরন্দরপদপ্রাপ্তি ঘটিয়াছে । সম্প্রতি স্বর্গে এক নূতন ইন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে; সে ধর্ম করে নাই; শতাশ্বমেধ করে নাই । হে অচ্যুত ! তবে সে কেমনে আমার দিব্য সিংহাসনে সমাসীন হইল ? ৪৭-৪৯

মহাদেব কহিলেন
ইন্দ্র এইরূপ বলিতে থাকিলে রমাপতি তাঁহার বাক্য শ্রবণ করিয়া প্রসন্ন নয়ন উন্মীলন করিয়া মধুর বাক্যে বলিলেন । ৫০

ভগবান্‌ বলিলেন
অল্পফলপ্রদ দান তপস্যা ও যজ্ঞ দ্বারা কি হইতে পারে ? তুমি ক্ষিতিতলে বর্তমান থাকিয়া তদ্রূপ ক্রিয়া দ্বারা প্রাণিগণের প্রীতি সাধন মাত্র করিয়াছ । ৫১

ইন্দ্র কহিলেন
হে ভগবন্‌ ! এ ব্যক্তি এমন কি পুণ্য করিয়াছে যে, তদ্দ্বারা আপনি প্রীত হইয়াছেন আর সেই প্রীতিহেতু আপনি ইহাকে ইন্দ্রপদ প্রদান করিয়াছেন ? ৫২

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
এ ব্যক্তি গীতার অষ্টাদশাধ্যায়ের পাঁচটি শ্লোক জপ করিয়া সেই পুণ্যপ্রভাবে তোমার উত্তম সাম্রাজ্য লাভ করিয়াছে । এ পুণ্য সর্ব পুণ্যের শিরোমণি, অতএব তুমি সুস্থির হও । ৫৩-৫৪

পুরন্দর বিষ্ণুর এবংবিধ বাক্য শ্রবণে উপায় জানিতে পারিয়া বিপ্রবেশ ধারণপূর্বক গোদাবরীতীরে গমন করিলেন; দেখিলেন,- সেখানে কালিকাগ্রাম নামে অনুত্তম পুণ্য পুরী বিরাজিত, তথায় কালমর্দন কালেশ্বর দেব বিদ্যমান । এই গোদাবরীতীরে স্থির, পরম ধার্মিক, করুণাবান্‌, বেদপারগ, দান্তচেতা জনৈক দ্বিজ নিত্য অষ্টাদশাধ্যায় পাঠ করিতেছেন । ৫৪-৫৭

অনন্তর তিনি পরমহর্ষে তাঁহার চরণযুগলে লুণ্ঠিত হইলেন, বিপ্র তাঁহাকে গীতার অষ্টাদশাধ্যায় পাঠ করাইলেন । পুরন্দর তাহা শিক্ষা করিয়া সেই পুণ্যপ্রভাবে ইন্দ্রপদ দেবাদিরও অকিঞ্চিৎকর জানিয়া সেই পদ পরিহারপূর্বক বিষ্ণুসাযুজ্য লাভ করিলেন । ইন্দ্র পরমহর্ষে হরিপুরে উপনীত হইলেন । ৫৮-৬০

এই মুনিজনেরও উত্তম পরম তত্ত্ব দিব্য অষ্টাদশাধ্যায় পাঠমাহাত্ম্য আমি তোমার নিকট কহিলাম; ইহা শ্রবণমাত্রে সর্বপাতক হইতে মুক্তি হয় । তোমার নিকট এই যে গীতামাহাত্ম্য কথিত হইল, ইহা পাপনাশন, পুণ্য, পবিত্র, আয়ুয্য, স্বর্গ্য ও মহাস্বস্ত্যয়ন স্বরূপ । হে মহাভাগে ! যে ব্যক্তি শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া ইহা শ্রবণ করে, সে সর্বযজ্ঞফল লাভ করিয়া বিষ্ণুসাযুজ্য প্রাপ্ত হইয়া থাকে । ৬০-৬৩

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৯২ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


শ্রীশিব বললেন -
হে হিমালয় সূতে পার্বতী, এখন শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য শ্রবণ কর । এই মাহাত্ম্য বেদের চেয়েও মহত ও অপার আনন্দদায়ী যা শুনলে সকল জাগতিক কামনা, বাসনা দূর হয়ে যায় । ভক্তের কাছে এটা দিব্য অমৃত এবং দেবতা, মহাযোগীদের মনে সান্ত্বনা স্বরূপ ।

মেরুপর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে বিশ্বকর্মা নির্মিত অমরাবতী অবস্থিত । এই স্বর্গরাজ্যে দেবরাজ ইন্দ্র ও তাঁর পত্নী শচীদেবী দেবতাদের দ্বারা সেবিত হন । একদিন ইন্দ্রদেব দেখলেন এক সুপুরুষ সেখানে আবির্ভূত হলেন এবং ভগবান বিষ্ণুর ভৃত্যুরা তাঁর সেবা করছে । এই সুপুরূষকে দেখা মাত্রই ইন্দ্র তাঁর আসন থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন আর ইন্দ্রের সেবারত দেবতাগণ মাটি থেকে ইন্দ্রের মুকুটটি তুলে সেই সুপুরুষটির মাথায় পরিয়ে দিলেন । তারপর সমস্ত দেবতা ও স্বর্গবাসীগণ এই নতুন স্বর্গরাজকে আরতি ও অপূর্ব সঙ্গীত দ্বারা বন্দনা করলেন । মহাঋষিগণ সেখানে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের আশীর্বাদ করলেন । এইভাবে নতুন ইন্দ্র, যিনি প্রথানুসারে একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করেননি, স্বর্গরাজের পদে অভিষিক্ত হলেন ।

প্রাক্তন ইন্দ্র এ সব দেখে খুবই বিস্মিত হলেন । তিনি মনে মনে ভাবলেন, "এই লোকটি কখনও কোন কুণ্ড খনন করেননি অথবা অপরের কল্যাণের জন্য কোন বৃক্ষাদি রোপন করেননি এবং অনাবৃষ্টির সময়ে তিনি কাউকে শস্যদানা দিয়েও সাহায্য করেননি । তিনি কখনও হোম-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেননি অথবা তীর্থক্ষেত্রে ব্যাপক দান-ধ্যানও করেননি । তবে কি করে তিনি আমার আসন দখল করলেন ?" এই ভেবে তিনি মহা অশান্তিপূর্ণ হৃদয়ে ভগবান বিষ্ণুর কাছে গিয়ে এর কারন জানতে চাইলেন ।

ভগবান বিষ্ণু বললেন, "এই মহাত্মা জীবনে প্রতিদিন অষ্টাদশ অধ্যায় থেকে পাঁচটি শ্লোক জপ করত । তার ফলে তিনি সমস্ত বৈদিক যজ্ঞ ও পুণ্যকর্মের ফল লাভ করেছেন । এখন তিনি বহুবছর স্বর্গরাজের কর্তব্য পালন করবেন, তারপর আমার নিজধামে আসতে পারবেন । যদি তুমি ওনার মত গীতার অষ্টাদশ অধ্যায় জপ করতে থাক, তবে তুমিও আমার পরম ধাম লাভ করতে পারবে ।"

অতঃপর প্রাক্তন ইন্দ্র ব্রাহ্মণবেশে গোদাবরী নদীতীরে গিয়ে এক পবিত্র, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণকে দেখলেন যিনি প্রতিদিন এক নির্দিষ্ট স্থানে গীতার অষ্টাদশ অধ্যায় পাঠ করতেন । প্রাক্তন ইন্দ্র সেই ব্রাহ্মণের কাছ থেকে এই গীতা মন্ত্র পাঠ শিখে নিয়ে নিরন্তর অনুশীলন করলেন এবং বিষ্ণুলোকের সর্বোচ্চ স্থান প্রাপ্ত হলেন । সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন বিষ্ণুলোকের আনন্দের সঙ্গে তার ফেলে আসা স্বর্গলোকের আনন্দের কোন তুলনাই হয় না ।

প্রিয়ে পার্বতী, এই কারণেই মহা মুনিগণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, বিশেষ করে অষ্টাদশ অধ্যায়টি পাঠ করেন যার ফলে অতি শীঘ্র তাঁরা ভগবান বিষ্ণুর শ্রীপাদপদ্ম লাভ করেন ।


দেবাদিদেব শিব কর্তৃক ভগবদ্গীতার মহিমা কীর্তন সমাপ্ত ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

Saturday, September 5, 2015

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-17)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

মহাদেব কহিলেন
হে শিবে ! ষোড়শাধ্যায়সামর্থ্য কথিত হইল, সম্প্রতি মহিমাম্ভোনিধি সপ্তদশাধ্যায় স্পষ্ট করিয়া বলিতেছি, শ্রবণ কর । ১

দুঃশাসন নামে সেই খড়্গবাহু-ভূপতিতনয়ের এক ভৃত্য ছিল, সে সেই গজকে ধরিতে গিয়া গজ হইতেই যমালয় গমন করে । দুঃশাসনের বাসনা গজের প্রতি একান্ত অভিনিবিষ্ট হইয়াছিল, তাই সে গজযোনি প্রাপ্ত হইল । কিন্তু সেও গীতার সপ্তদশাধ্যায় শ্রবণ করিয়া পরমপদ প্রাপ্ত হইয়াছিল । ২-৩

পার্বতী বলিলেন
হে প্রভো ! দুঃশাসন গজত্ব প্রাপ্ত হইয়া মুক্ত হইয়াছিলেন, ইহা শুনিলাম; হে কল্যাণময় ! তাহাই বিস্তারপূর্বক বর্ণন করুন । ৪

মহাদেব কহিলেন
এই দুঃশাসন পূর্বে দুর্মেধা ছিল, এই ব্যক্তি বহুমূল্য পণে আবদ্ধ হইয়া রাজকুমারগণের সহিত সেই ক্ষিপ্তগজে আরোহণ করিয়াছিল । করিবর কতিপয় পদ গমন করিলে লোক সকল দুঃশাসনকে এ কার্য্যে নিষেধ করিয়াছিল, মূঢ় দুঃশাসন তাহা শুনিল না, সে করীর প্রতি কর্কশ বাক্য প্রয়োগ করিল । অনন্তর তাহার কর্কশ বাক্য শ্রবণে করীর পাদস্খলন হইল, সে ক্রোধে কম্পমান হইয়া দুঃশাসন ও কুমারগণের সহিত ভূতলে পড়িয়া গেল । অনন্তর কৃতান্তোপম নিরঙ্কুশ করী শুণ্ড দ্বারা পৃষ্ঠারূঢ় দুঃশাসনকে ভূপৃষ্ঠে পাতিত ও নিহত করিল । দুঃশাসন পতিত হইয়া শ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে গতাসু হইলে, রোষপরবশ সেই মত্ত গজ তদীয় অস্থিসমূহ নিস্পেষিত করিয়া পৃথক্‌ পৃথক্‌ নিক্ষেপ করিল । ৫-৯

দুঃশাসন তৎকালে কালকবলিত হইয়া গজযোনি প্রাপ্ত হয় । এই গজজন্মে সে সিংহল দ্বীপের ভূপতিসন্নিধানে অনেকদিন অতিবাহিত করে । কিয়দ্দিন পরে সিংহল-মহীপালের খড়্গবাহু মহীপতির সহিত গরীয়সী মৈত্রী হয় । অনন্তর খড়্গবাহুর প্রতি প্রীতিবশতঃ জয়দেবনামক জনৈক মহীভুজ জলপথে ঐ হস্তিকে তাঁহার নিকট আনয়ন করেন । ঐ হস্তি খড়্গবাহু মহীপের গৃহে কিছুদিন অতিবাহিত করিল, সে নিজের জাতি ও সোদর বন্ধুবান্ধবগণকে স্মরণ করিয়া মহাদুঃখে তুষ্ণীম্ভাবে অবস্থান করিতে লাগিল; কিন্তু তাহার তুষ্ণীম্ভাবের কারণ কেহই বুঝিতে পারিল না । ১০-১৩

একদা খড়্গবাহু সমস্যাশ্লোকপূরণে সন্তুষ্ট হইয়া জনৈক কবিকে ঐ করী পুরস্কারস্বরূপ প্রদান করেন । কবিও করীর রোগাদি উপদ্রবে ভীত হইয়া শতমুদ্রা মূল্যে মালব দেশের মহীপালের নিকট উহাকে বিক্রয় করিয়া ফেলেন । মালবমহীপাল কিয়ৎকাল যত্নপূর্বক তাহাকে পালন করিলেন, কিছুদিন অতীত হইলে দুর্জ্জর জ্বরে কুঞ্জর মুমূর্ষু হইল ।  গজ শীতলজলের আঘ্রাণ লইত না, ঘাষমুষ্টি খাইত না এবং শয়ন করিয়াও সুখানুভব করিত না; সে কেবল অশ্রু বিসর্জন করিত । ১৪-১৭

অনন্তর মালবরাজ হস্তিপকথিত এই বৃত্তান্ত বিদিত হইয়া সেই জ্বরিত গজের সন্নিধানে আগমন করিলেন । হস্তী মহীপালকে অবলোকনপূর্বক বিগতজ্বর হইয়া জগদ্‌বিস্ময়কর বক্ষ্যমাণ বাক্য বলিতে লাগিল । ১৭-১৯

গজ বলিল
হে রাজন্‌ ! আপনি অশেষ শাস্ত্রজ্ঞ ও রাজনীতির সাগর; আপনা কর্তৃক শত্রুকুল নির্মূল হইয়াছে এবং আপনি মুরারির চরণপ্রিয় । কি ঔষধ, কি বৈদ্য, কি বিধান, কি জাপক - ইহা দ্বারা কোন ফল হইবে না; যিনি গীতার সপ্তদশাধ্যায় নিত্য পাঠ করেন, এইরূপ কোন দ্বিজকে আনয়ন করুন, তিনিই আমার রোগশান্তি করিতে পারিবেন, সংশয় নাই । ১৯-২১

অনন্তর নরপতি গজপ্রার্থিত কার্য্য করিলেন, তারপর গজ নিজযোনি পরিত্যাগপূর্বক দুঃশাসনরূপ প্রাপ্ত হইল । অতঃপর তাদৃশ দ্বিজাভিমন্ত্রিত উত্তম জল তাহার মস্তকে নিক্ষিপ্ত হইলে সে দিব্য বিমানে আরোহণ করিল । রাজা সেই দুঃশাসনকে ইন্দ্রের ন্যায় তেজঃপুঞ্জ অবলোকন করিলেন । ২২-২৪

রাজা বলিলেন
তোমার জাতি কি ? তোমার আত্মা কীদৃশ এবং তোমার বৃত্তিই বা জি ? এই সকল আমাকে বল । তুমি কি কর্ম করিয়া গজ হইয়াছ এবং কেমন করিয়া এখানে আসিলে ? ২৫

বিমুক্ত বিমানস্থ দুঃশাসন, রাজা কর্তৃক এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া স্থিরাক্ষরে নিজ বৃত্তান্ত নিবেদন করিল । অনন্তর মালব মহীপাল নরবর্মাও গীতার সপ্তদশাধ্যায় পাঠ করিয়া অত্যল্পকালে মোক্ষলাভ করিলেন । ২৬-২৭

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৯১ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


রাজা খড়্গবাহুর পুত্রের দুঃশাসন নামে এক শঠ ও অতি মুর্খ ভৃত্যু ছিল । দুঃশাসন একদিন রাজার পোষা হাতির পিঠে চড়তে পারবে বলে রাজকুমারের সঙ্গে বাজি ধরল । লাফিয়ে হাতির পিঠে চড়ে কয়েক পা যাবার পর সবাই তাকে সেই ভয়ঙ্কর হাতিতে না চড়তে অনুরোধ করল । কিন্তু মূর্খ কারও কথা না শুনে অঙ্কুশের খোঁচা ও রূঢ়বাক্য বলে হাতিটিকে উত্তেজিত করে তুলল । এর ফলে হাতিটি উন্মত্ত হয়ে এদিক-ওদিক দৌড়তে লাগল আর হাতির পিঠ আঁকড়ে ধরে না থাকতে পেরে দুঃশাসন মাটিতে পড়ে গেল । হাতিটি তাকে পায়ের তলায় পিষে ফেলল । অতঃপর দুঃশাসন হাতি হয়ে জন্মে সিংহল দ্বীপের রাজপ্রাসাদে দিন কাটাতে লাগল ।

একদিন সিংহল দ্বীপের রাজা হাতিটিকে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু খড়্গবাহুকে উপঢৌকন হিসাবে পাঠালেন । সেখানে হাতিটি তার পূর্বজন্মের বন্ধুবান্ধবদের কথা মনে করে মন মরা হয়ে পড়ল । খড়্গবাহু হাতিটিকে এক কবিকে তার কবিতা শুনে তুষ্ট হয়ে দান করলেন । হাতিটির মন মরা অবস্থা দেখে আশঙ্কিত হয়ে সেই কবি একশত স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে মল্বের রাজাকে বিক্রি করে দিলেন । 

কিছুকাল পর হাতিটি চরম রোগে আক্রান্ত হল । সে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিল, শুধু অশ্রু বিসর্জন করত । এই বৃত্তান্ত শুনে রাজা পীড়িত হাতিটির কাছে আসলে তাকে সেটি বলল, "হে রাজা ! আপনি খুবই ধার্মিক ও শাস্ত্রজ্ঞ এবং আপনি মূরারির চরণপ্রিয় । আমার এসময়ে কোন ওষুধ, বৈদ্য, যাগ-যজ্ঞতে কাজ হবে না । যিনি গীতার সপ্তদশ অধ্যায় নিত্য পাঠ করেন, এরকম কোন ব্রাহ্মণকে নিয়ে আসুন, একমাত্র তিনিই আমার রোগশান্তি করতে পারবেন ।"

হাতিটির অনুরোধ অনুযায়ী কাজ করতেই সে পূর্বেকার দুঃশাসনরূপ প্রাপ্ত হল । গীতার সপ্তদশ অধ্যায় পাঠ করতে করতে ব্রাহ্মণ তার মাথায় জল ছেটাতেই সে মুক্ত হয়ে ইন্দ্রের ন্যায় তেজদীপ্ত হয়ে বিমানে করে বৈকুণ্ঠে চলে গেল । যাওয়ার আগে সে রাজাকে তার পূর্বজন্মের সব কথা বলে দিয়েছিল । অতঃপর রাজাও নিয়মিত গীতার সপ্তদশ অধ্যায় পাঠে নিয়োজিত হলেন এবং অচিরেই মোক্ষলাভ করলেন ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-16)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

মহাদেব কহিলেন
হে হরিণনয়নে ! হর্ষে তোমার উৎকণ্ঠা হইয়াছে, অতএব অতঃপর ষোড়শাধ্যায়-গৌরব বর্ণন করিতেছি, শ্রবণ কর । ১

গুর্জর মণ্ডলে সৌরাষ্ট্রিক নামক নগর বিদ্যমান, তথায় দ্বিতীয় চন্দ্রের ন্যায় খড়্গবাহু নামে এক নৃপতি ছিলেন । ভূপতি খড়্গবাহু সুরভিগর্ভ কুমুদমালামোদিত গুর্জর মণ্ডলে বাস করিতেন, তাঁহাকে দেখিয়া মনে হইত যেন - হরি রমার সহিত জলধি মধ্যে সুস্থ শয়ান রহিয়াছেন । বৈরিকৃত শ্বাসসমীরণে তদীয় নির্মল কীর্তি সর্বত্র সমাকীর্ণ হইয়াছিল, কিন্তু মনে হইত যেন - তাঁহার কর্পূরধবল কীর্তিকণা তারকাচ্ছলে নভোমণ্ডলে উদিত হইয়া রহিয়াছে । তাঁহার অসিধারারূপ তীর্থতোয়ে তদীয় শত্রু নৃপতিগণ স্নান করিয়া স্বর্গগমন করিলেও মনে হইত যেন, অমররমণীগণ দ্বারা বিমোহিত হইয়াই স্বর্গ হইতে প্রত্যাবর্তন করিতেছে না । ২-৫

এবম্ভূত বিভূতিসম্পন্ন ভূপতি খড়্গবাহুর অরিমর্দন নামে এক উদ্ধত দন্তী ছিল, তাহার যে মদধারা ক্ষরিত হইত, তাহাতে মধুপমণ্ডল পতিত হইয়া গুঞ্জন করিত । তাহার কপোল ফলক হইতে যে মদজল নির্গত হইত তাহা দেখিয়া মনে হইত, যেন, অঞ্জন পর্বতের নির্ঝরধারা পতিত হইতেছে । চন্দ্রকিরণের ন্যায় যে সকল উজ্জ্বল চামর তাহার অঙ্গে শোভা পাইত, ঐ সকল চামর কাননপথে পতিত জ্যোৎস্নার ন্যায় অনুমিত হইত । সন্ধ্যাকালীন মেঘসম্পর্কে আকাশমণ্ডল যেরূপ লোহিত বর্ণে শোভিত হয়, কুম্ভসিন্দুরে রঞ্জিত ঐ করিবরও তদ্রূপ শোভা পাইয়াছিল । ৬-৯

একদা ঐ করী বলপূর্বক সুদৃঢ় লৌহস্তম্ভ ভঞ্জনপূর্বক বন্ধনীনিগড় হইতে নির্মুক্ত হইয়া নিশাযোগে নির্গত হয় । গজপালেরা তখন তাহাকে তীক্ষ্ণমুখ অঙ্কুশাঘাত ও তাহার পার্ষ্ণিদেশে বেণুদণ্ড দ্বারা তাড়িত করিতে লাগিল; কিন্তু ক্রুদ্ধ করী তাহা কিছুমাত্র গ্রাহ্য করিল না, সে গজশালা ভাঙ্গিয়া ফেলিল । অনন্তর রাজা এই কৌতুকময় ব্যাপার শ্রবণে করিকলাকুশল কুমারগণের সহিত তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, - সেই মহাবল মাতঙ্গ উদ্ভট বিক্রমে সকলকে মোহিত করিয়া গজশালা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে; পৌরগণ দূরে থাকিয়া সেই মহাভীম মাতঙ্গকে অবলোকন করিতেছে, ভয়াকুল পুরবাসীরা অন্য কার্য্য হইতে নিবৃত্ত হইয়া কেবল শিশুরক্ষায় ব্যস্ত রহিয়াছে, পলায়নপরায়ণ পৌরগণ দ্বারা পথ রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে এবং সেই করীর দানধারাশীকরের উগ্রগন্ধে দিঙ্মণ্ডল বাসিত হইয়াছে । ১০-১৬

তৎকালে জনৈক দ্বিজ সরোবর হইতে স্নান করিয়া গীতার ষোড়শাধ্যায়ের কতিপয় শ্লোক পাঠ করিতে করিতে সেই পথে আসিতেছিলেন; গজরক্ষী ও পৌরগণ তাঁহাকে সে পথে আসিতে অনেক নিষেধ করিলেও তিনি তাহা মানিলেন না, পরন্তু ফুৎকারদ্বারা গজভীত বিচলিত পথিকগণকে আবরণপূর্বক অপসারিত করিয়া চলিয়া গেলেন । তৎকালে ঐ দ্বিজ গজের এতই সন্নিহিত হইয়াছিলেন যে, তাহার মদজল তদীয় গাত্র স্পর্শ করিয়াছিল, কিন্তু ইহাতেও তিনি নির্বিঘ্নে গমন করিতে পারিয়াছিলেন । ১৭-১৯

অনন্তর এই ব্যাপার দর্শনে পৌরগণ ও রাজার মনে এক বাক্যাতীত মহাবিস্ময় উপস্থিত হইল । ফুল্লরাজীবলোচন রাজা বাহন হইতে অবতরণ করিয়া দ্বিজকে আহ্বানপূর্বক জিজ্ঞাসা করিলেন । ১৯-২২

রাজা বলিলেন
হে বিপ্র ! আজ আপনি এক অলৌকিক মহাকাণ্ডের অনুষ্ঠান করিয়াছেন; আপনি কি করিয়া কৃতান্তকল্প এই করীর নিকট হইতে আত্মরক্ষা করিলেন ? হে প্রভো ! আপনি কোন্‌ দেবের অর্চনা করেন ? কি মন্ত্র জপ করেন ? এবং আপনার কোন্‌ সিদ্ধি আছে ? হে দ্বিজ ! তাহা প্রকাশ করুন । ২৩-২৪

দ্বিজ বলিলেন
হে রাজন্‌ ! আমি প্রতিদিন গীতার ষোড়শাধ্যায়ের কতিপয় শ্লোক পাঠ করিয়া থাকি, তাহাতেই আমার সকল সিদ্ধি হইয়া থাকে । ২৫

দ্বিজবাক্যশ্রবণানন্তর রাজা গজ ও তজ্জনিত কৌতুহল-রস পরিত্যাগপূর্বক দ্বিজকে লইয়া নিজ মন্দিরে আগমন করিলেন; তার পর শুভ মুহূর্ত দেখিয়া লক্ষসংখ্যক সুবর্ণ প্রদানে দ্বিজসত্তমের সন্তোষ সাধন করিয়া তাঁহারই নিকট গীতামন্ত্রে উপদিষ্ট হইলেন । ২৬-২৮

অনন্তর তিনি সৎকারপূর্বক সকৌতুকে গীতার ষোড়শাধ্যায়ের কতিপয় শ্লোক সম্যক্‌ অভ্যাস করিয়া একদা সৈনিকগণ সহ বাহনারোহণে পুর হইতে নির্গমনপূর্বক গজশালায় আগমন করিলেন । রাজা গজশালায় আসিয়া সেই মত্তমাতঙ্গকে বন্ধনমুক্ত করিলেন, তিনি স্পষ্টবাক্যে রাজ্যসৌখ্যে অনাদর করিয়া ও জীবনকে তৃণের মত মনে করিয়া গজের অগ্রে উপস্থিত হইলেন । গীতামন্ত্রবিশ্বাসী সাহসিকাগ্রণী রাজা নিজ করে সেই মদমত্ত নিরঙ্কুশ করীর গণ্ড কণ্ডূয়ন করিয়া দিলেন । তিনি রাহুর গ্রাস হইতে চন্দ্রের ন্যায়, কালবদন হইতে ধার্মিকের ন্যায় এবং ধুর্তের কবল হইতে সাধুর ন্যায় সেই গজের নিকট হইতে নির্বিঘ্নে নির্গত হইয়া আসিলেন । ২৯-৩৩

অনন্তর রাজা স্বনগরে আগমনপূর্বক নিজ কুমারকে রাজ্যে অভিষিক্ত করিয়া গীতা-ষোড়শাধ্যায় পাঠে পরম গতি প্রাপ্ত হইলেন । ৩৩-৩৪

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৯০ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


গুজরাটের সৌরাষ্ট্র নগরে খড়্গবাহু নামে এক রাজা ছিলেন । অরিমর্দন নামে তার এক ক্ষেপা হাতি ছিল । একদিন হাতিটি ক্ষেপে গিয়ে শিকল ছিঁড়ে হাতিশালা ভাঙ্গতে লাগল, তারপর নগরবাসীদের তাড়া করল । চারিদিকে হুলুস্থুল পড়ে গেল, অনেকে পদপিষ্ট হল । এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রাজা দেখলেন একজন ব্রাহ্মণ সরোবর থেকে স্নান করে শান্তভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছেন । অনুচ্চকণ্ঠে তিনি গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের প্রথম তিনটি শ্লোক জপ করছিলেন, যার প্রথম শব্দটি ছিল 'অভয়ম্‌' । চারিপাশের লোকেদের নিষেধ উপেক্ষা করে তিনি সোজা পাগলা হাতিটির দিকে এগোতে লাগলেন । ব্রাহ্মণকে তার দিকে আসতে দেখেই হাতিটি সমস্ত ক্রোধ হারিয়ে শান্তভাবে শুয়ে পড়ল । ব্রাহ্মণ তার গায়ে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন ।

কিছুক্ষণ হাতিটিকে আদর করার পর ব্রাহ্মণটি ধীর গননে সেখান থেকে চলে গেলেন । রাজা ও শহরবাসী এই বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করে অবাক হয়ে গেলেন । রাজা ছুটে গিয়ে ব্রাহ্মণের পায়ে পড়ে তার এই বিস্ময়কর শক্তির রহস্য জানতে চাইলেন । উত্তরে ব্রাহ্মণ বললেন, "আমি প্রতিদিন গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের কয়েকটি শ্লোক পাঠ করে থাকি ।"

অতঃপর ব্রাহ্মণকে রাজা সমাদরে তার প্রাসাদে নিয়ে এসে একশত স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করে এই গীতামন্ত্রের উপদেশ নিলেন । কিছুকাল এই শ্লোকগুলো পাঠ করার পর রাজা খড়্গবাহু একদিন হাতিশালায় গিয়ে নিজের হাতে ক্ষেপা হাতিটিকে মুক্ত করলেন । হাতিটি শান্তভাবে শুয়ে থাকল ও রাজা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন । রাজা রাহুর গ্রাস থেকে চাঁদের মতন, ধুর্তের কবল থেকে সাধুর মতন সেই হাতিটির কাছ থেকে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে আসলেন । তারপর তাঁর পুত্রকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের নিরন্তর পাঠ করে অচিরেই পরম গতি প্রাপ্ত হলেন ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicaran Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-15)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

ঈশ্বর কহিলেন
হে বিশালাক্ষি ! হে হিমালয়কন্যকে ! গীতার পঞ্চদশাধ্যায়মাহাত্ম্য বর্ণন করিতেছি, অবধারণ কর । ১

গৌড়দেশে নরসিংহ নামে জনৈক কৃপালু নরপাল ছিলেন, ঐ অসাধারণ বীর্য্যশালী ধরাপালের অসিধারায় সমরে রিপুগণ অসংখ্য দেবতারূপে পরিগণিত হইত । তদীয় মাতঙ্গগণের মদজলে ইলা পরিপূর্ণ থাকায় অনায়াসে নিদাঘের সূর্য্যতাপ-বেদনা সহ্য করিতে পারিত । তদীয় দীপ্তিশালী মত্তদন্তিকুল দেখিলে বোধ হইত যেন সচল পর্বত সকলই ইন্দ্র হইতে ভয়াকুল হইয়া ইহাঁরই শরণাপন্ন হইয়া রহিয়াছে । সেই প্রজাপাল কৃপালু রাজার রাজ্যমধ্যগত ভূধর সকলে মত্তমাতঙ্গগণ যে উচ্চ চীৎকার করিত, তাহাতে মনে হইত যেন সেই সকল ভূধর ঐ মাতঙ্গধ্বনিচ্ছলে প্রতিধ্বনি দ্বারা সেই রাজার অভিনন্দন করিতেছে । তৎকালে ভূতলে এমন ভূখণ্ড ছিল না যে, তদীয় ধাবমান তুরগের ক্ষুরখাতে জর্জরিত হইয়া বিচিত্রিত হয় নাই । এই ইন্দ্রতুল্য প্রভাবান্‌ রাজার শাসনকালেই ফণীশ্বর তদীয় মহাভাষ্যকে প্রতিসংস্কারপূর্বক উজ্জ্বলীকৃত করিয়াছিলেন । ২-৭

এই নৃপতির প্রচণ্ড-ভূজমণ্ডল সরভভেরুণ্ড নামে জনৈক সৈনিক ছিল, সর্বশাস্ত্রকলানিধি ধীমান্‌ সরভভেরুণ্ড ধন, তুরগ, বীররসগর্বী ভট এবং অত্যন্ত দুর্গম দুর্গশ্রেণী দ্বারা ভূপালের তুল্যবলশালী হইয়াছিল । ৮-৯

সে একদা পাপে চিত্ত সমাধান করিয়া স্বয়ং রাজ্য করিতে ইচ্ছা করিল এবং রাজকুমারগণের সহিত নৃপতিকে বলপূর্বক নিহত করিতে উদ্যত হইল । ঐ সৈনিক এইরূপ করিতে অভিলাষী হইয়া স্বল্প দিবস অধ্যবসায়ের পর বিসূচিকা রোগে আশু গতাসু হইল । ১০-১১

হে কৃশোদরি ! পাপাত্মা সৈনিক এই পাপকর্ম-ফলে অল্পকাল মধ্যে প্রেতপুরে প্রস্থান করিয়া সিন্ধুদেশে তেজস্বী তুরগ হইয়া জন্মগ্রহণ করিল । অনন্তর জনৈক অশ্বতত্ত্বজ্ঞ বৈশ্যসুত বহু মূল্য দ্বারা ঐ অশ্ব ক্রয় করিয়া অনেক যত্নে গৃহে আনয়ন করিল । এদিকে নরসিংহও সেই সৈনিকের মৃত্যুর পর কালে বার্ধক্যদশায় উপনীত হইয়া পুত্র-পৌত্রাদির সহিত রাজ্য পালন করিতে লাগিলেন । একদা বৈশ্যনন্দন রাজাকে সেই অশ্ব বিক্রয় করিবার জন্য রাজদ্বারে উপনীত হইয়া তাঁহার সাক্ষাৎকারের প্রতীক্ষা করিতে লাগিল । প্রতিহার বৈশ্বকে সমাগত দেখিয়া নৃপতির সহিত দেখা করাইয়া দিল । ১২-১৫

অনন্তর রাজা বৈশ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন, - তুমি কি জন্যে আগমন করিয়াছ ? বৈশ্য রাজা কর্তৃক এইরূপে পৃষ্ট হইয়া স্পষ্ট বাক্যে বলিল, - দেব ! এই সাধুলক্ষণ অশ্বকে দিব্যগতি রত্ন মনে করিয়া বহু অযুতমূল্যে আমি ইহাকে গ্রহণ করিয়াছি । ১৬-১৭

অনন্তর নৃপতি পার্শ্ববর্তী অমাত্যগণের মুখের দিকে তাকাইলেন এবং বণিক্‌কে বলিলেন, - এইস্থানে অশ্ব আনয়ন কর । ১৮

অশ্ব আনীত হইল; তাহাকে দেখিয়া অশ্বলক্ষণ-তত্ত্বজ্ঞগণ প্রশংসাসূচক শিরঃকম্পন করিলেন এবং শূরগণের মনও মুহুর্মুহু উৎসাহিত হইল; তাহার যে লালাফেন ক্ষরিত হইতেছিল, তাহা দেখিয়া বোধ হয় যেন, বেগবেশে বহুবার সমগ্র মেদিনী ভ্রমণার্জিত শুভ্রতর যশই ক্ষরণ করিতেছে । গুণসাম্যে সে প্রকৃতই উচ্চৈঃশ্রবার তুল্য; কিন্তু তদীয় তেজস্বিতায় তাহা ব্যক্ত হইতেছিল বলিয়াই যেন লজ্জায় তাহার কন্ধর নত হইয়াছিল । তাহার ইন্দুধবল চামর দ্বারা নিরন্তর দিগন্তের বীজিত হইতেছিল এবং সে ক্ষীরাব্ধি তুল্য ললিত উচ্চ শ্বাস দ্বারা উচ্চৈঃশ্রবার অনুকরণ করিল । অশ্ববর নীলাতপত্রযুগল ধারণ করায় ঘনচ্ছায়ার তুল্যশ্রী মেঘচুম্বী হিমাদ্রিশিখরের আকার ধারণ করিল এবং মেদিনীমণ্ডল সংস্পর্শী সংক্রান্ত পাবকের প্রভা প্রাপ্ত হইল । অশ্ব যেন বৈরিগণের হৃদয় বিদারণ ও জয়শ্রী করায়ত্ত করিয়া মুহুর্মুহু বন্ধুর কন্ধরাতট উৎক্ষিপ্ত ও কম্পিত করিল, গুরু গম্ভীর হ্রেষরবে দিক্‌সকলে যশোরাশি প্রখ্যাপিত করিতে লাগিল এবং উচ্চ গতি পরম্পরা দ্বারা বিপুল বলের পরিচয় প্রদান করিল । ১৯-২৬

এবংবিধ রূপের নিলয় এবং সুলক্ষণসমূহের সাক্ষাৎ পয়োনিধি স্বরূপ অশ্বকে বৈশ্য আনয়ন করিলে রাজা দর্শন করিলেন, অশ্বলক্ষণাবদ্‌ অমাত্যগণ তাহার গুণ বহুধা বর্ণন করিল । অনন্তর মহীপতি সত্বর বৈশ্যকথিত বহু স্বর্ণ দানে সেই অশ্ব গ্রহণ করিয়া সাতিশয় আনন্দনিমগ্ন হইলেন এবং অশ্বরক্ষিগণকে আহ্বানপূর্বক সযত্নে অশ্বরক্ষার ব্যবস্থা করিয়া দিয়া গৃহান্তরে গমন করিলেন, সভাসদ্‌গণও বিদায় লইয়া তাহাদের স্বস্থানে প্রস্থান করিল । ২৬-২৯

এই বলশালী অশ্ব বহুবার রাজার সহিত রণাঙ্গনে গমন করিয়াছিল, কিন্তু নিজে শস্ত্রব্রণের কিণশ্রেণীর দ্বারা ভূষিত হইয়াও নৃপকে পরিত্যাগ করে নাই । ৩০

একদা মৃগয়া ক্রীড়ায় কুতুহলমনা মহীপাল ঐ অশ্বে আরোহণ করিয়া অরণ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন; তিনি কতিপয় হরিণ কর্তৃক আকৃষ্যমাণ হইয়া তদীয় পশ্চাদাগত সৈন্যসকলকে পরিত্যাগ করিয়া অগ্রসর হন । এই সময় তিনি পিপাসাকুল হইয়া অশ্ব হইতে অবতরণপূর্বক জলান্বেষণে প্রবৃত্ত হন এবং অশ্বকে তরুশাখায় আবদ্ধ করিয়া এক শিলাতলে আরোহণ করেন । তিনি যে শিলাখণ্ডে আরোহণ করিয়াছিলেন, তথায় একখণ্ড পত্র পাইলেন, পত্রে গীতার পঞ্চদশাধ্যায়ের শ্লোকার্ধ লিখিত রহিয়াছে; উহা বায়ু দ্বারা বিচালিত হইয়া ঐ শিলার উপরে আসিয়া পড়িয়াছে । ৩১-৩৪

নৃপতি পত্র পাইয়া পাঠ করিলেন, এদিকে অশ্ব সেই নৃপতিপঠিত গীতাক্ষরাবলী শ্রবণ করিয়া মুক্তিপদ প্রাপ্ত হইল, - তুরগ ত্বরায় ক্ষিতিতলে পতিত হইল । রাজা তাহার বল্‌গাদি বন্ধনগ্রন্থিচ্ছেদন ও পৃষ্ঠ হইতে আসনাদি অবতারণ করিয়া তাহাকে উত্তোলিত করিতে গেলেন, অশ্ব উঠিল না, মরিয়া গেল । অনন্তর অশ্ব সরভভেরুণ্ড সৈনিকের বেশে সুস্বরে নৃপতিকে সম্ভাষণ করিয়া দিব্য বিমানারোহণে স্বর্গে গমন করিল । ৩৫-৩৭

অতঃপর নৃপতি পর্বতে আরোহণ করিয়া এক উত্তম আশ্রম দর্শন করিলেন । ঐ আশ্রম পুন্নাগ, কদলী, আম্র, নারিকেল, পূগ, নাগকেশর ও চম্পক তরুসমন্বিত এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্রাক্ষা ও ইক্ষু উদ্যানে পরিশোভিত । করিশাবক, সারঙ্গ ও ময়ূরগণ তথায় নৃত্য করিয়া থাকে । নৃপতি তথায় তৃণনির্মিত কুটীরমধ্যস্থ দ্বিজকে প্রণাম করিয়া সংসারবাসনা পরিত্যাগ মানসে পরম ভক্তিসহকারে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, - কি কারণে তুরগ স্বর্গে গমন করিল, তাহা বর্ণন করুন । ৩৮-৪১

রাজার এইরূপ বাক্য শুনিয়া দ্বিজ তাঁহার সৈনিক মরিয়া গিয়া বহুকাল যে পাপে অশ্ব হইয়াছিল, তাহা ব্যক্ত করিলেন । আর বলিলেন, - কোন এক স্থানে গীতার পঞ্চদশাধ্যায়ের শ্লোকার্ধ লিখিত ছিল, তুমি তাহা পাঠ করিয়াছিলে, তোমার মুখ হইতে উহা শুনিয়া অশ্ব স্বর্গে গমন করিয়াছে । ৪১-৪৩

অনন্তর রাজার পরিজনগণ তথায় আগমন করিল, রাজা তাহাদিগের সহিত মিলিত হইয়া দ্বিজকে প্রণামপূর্বক হৃষ্ট হইলেন । ৪৩-৪৪

অতঃপর যে পত্রে পঞ্চদশাধ্যায় গীতাশ্লোকার্ধ লিখিত ছিল, তাহা পাঠ করিয়া রাজা শুদ্ধ হইলেন, হর্ষে তাঁহার লোচনযুগল উৎফুল্ল হইল, তিনি মন্ত্রিগণের মতানুসারে সিংহবল তনয়কে সিংহাসনে অভিষিক্ত করিয়া মুক্তি লাভ করিলেন । ৪৪-৪৬

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৮৯ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


গৌড়দেশে নরসিংহ নামে এক রাজা ছিলেন । তিনি এত শক্তিশালী ছিলেন যে দেবতাদেরও যুদ্ধে হারিয়ে দিতে সক্ষম ছিলেন । তাঁর সেনাপতি সরভ্‌মেরুন্দ্‌ ছিল খুব লোভী । তাই সে রাজপুত্রের সঙ্গে মিলে রাজাকে হত্যা করে গৌড়দেশের শাসক হতে ষড়যন্ত্র করল । কিন্তু তার চক্রান্ত কার্যকরী করার পূর্বেই কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয় । পরজন্মে সিন্ধুদেশে সে ঘোড়া হয়ে জন্মায় । ঘোড়াটি ছিল সুন্দর ও দ্রুতগামী, যে কোন প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হওয়ার সকল গুণাবলীই সেটির ছিল । একদিন গৌড়দেশের এক ধনীব্যক্তির ছেলে ঘোড়াটিকে কিনে রাজার কাছে উচ্চমূল্যে বিক্রী করতে এল । রাজা ঘোড়াটিকে পরীক্ষা করে দেখে খুশি হয়ে ব্যবসায়ীর প্রার্থিত মূল্যের অধিক দিয়ে সেটিকে কিনলেন ।

কিছুদিন পর সেই ঘোড়ায় চড়ে শিকার করার সময় এক হরিণের পিছনে অনেকক্ষণ ধাওয়া করার পর ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়ে রাজা ঘোড়াটিকে একটা গাছে বেঁধে একটা বড় পাথরের ওপর বসলেন । কিছুক্ষণ পর এক টুকরো পশুচর্ম হাওয়ায় উড়ে এসে তাঁর পাশেই পাথরে ওপর পড়ল । সেই চামড়ার ওপর গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের একটি শ্লোকের অর্ধাংশ লেখা ছিল । রাজা সেটা জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করতেই ঘোড়াটি মাটিতে পড়ে গিয়ে অশ্বদেহ ত্যাগ করে দিব্য মূর্তি লাভ করে বৈকুণ্ঠে চলে গেল ।

কাছেই এক আশ্রমে বিষ্ণুশর্মা নামে এক জিতেন্দ্রিয় ব্রাহ্মণ বসে ছিলেন । তাকে রাজা এই ঘটনা জানালে তিনি রাজাকে তার দুষ্ট প্রাক্তন সেনাপতির অশ্বজন্মের ইতিবৃত্ত শোনালেন । দৈবক্রমে সেই অশ্ব গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের কিছু শব্দ শুনতে পায় এবং তাতেই তার মুক্তি লাভ হয় ।

ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ওই চর্ম-পত্রটি যত্ন করে রাজা তাঁর রাজধানীতে নিয়ে এলেন । অতঃপর সেই চর্ম-পত্রে লেখা গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের শ্লোকের অর্ধাংশ নিয়মিত পাঠ করে রাজা শুদ্ধ হন । অল্পকাল পরেই তিনি তাঁর পুত্রকে সিংহাসনে বসিয়ে মুক্তি লাভ করলেন ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-14)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

মহাদেব কহিলেন
ভবানি ! ভবমুক্তির জন্য অতঃপর গীতার চতুর্দশাধ্যায় বর্ণন করিতেছি, হে সুস্মিতে ! অবধারণ কর । ১

মেদিনী মধ্যে মনোহর বিশাল কাশ্মীরমণ্ডল বিদ্যমান, উহা সরস্বতীর রাজধানী । বাগ্‌দেবী তত্রত্য জনগণকে ব্রহ্মলোক প্রদান করিয়া থাকেন । সেখানে হংসাসনা সাবিত্রী সরস্বতীর সেবাভিলাষিণী হইয়া হংসপক্ষপুটে কুঙ্কুম লইয়া তদীয় পাদপদ্মে নিক্ষেপ করেন তাহাতে ইহার দশদিক্‌ উদ্ভাসিত হয়, এবং সরস্বতীর প্রসাদে নিমেষমাত্রে তত্রত্য জনগণের দেবভাষা উন্মেষিত হইয়া থাকে । কাশ্মীরমণ্ডল  এমনই কুঙ্কুমবহুল যে, প্রভাতে গৃহাঙ্গণে যে সকল কুঙ্কুমরজ পড়িয়া থাকে, তাহাতে সর্বত্র অরুণিত হইয়া যায়; এমন কি সূর্য্যচন্দ্রমণ্ডল পর্য্যন্তও অরুণিত হয় । ২-৬

এই কাশ্মীরমণ্ডলে তেজোরাশি নরেশ্বর শৌর্য্যবর্মা বাস করিতেন, তাঁহার উদ্যত উজ্জ্বল শরজালে শত্রুমণ্ডল বিখণ্ডিত হইত । তৎকালে সিংহল দ্বীপে সিংহপরাক্রম বিক্রমবেতাল নামে কলাবিদ্যানিধি জনৈক রাজা ছিলেন । নিজ নিজ রাজ্যজাত প্রচুর উপহারপরম্পরা প্রদান দ্বারা ক্রমে এই উভয় ভূপতি মধ্যে পরস্পর মৈত্রীবন্ধন হইল । ৭-৯

একদা রাজা শৌর্য্যবর্মা প্রেমবশে প্রভূত উপহার প্রদান করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে দুইটী কুক্কুরী ছিল । রাজা বিক্রমবেতাল কুক্কুরীযুগল অবলোকন করিয়া মত্ত মাতঙ্গ, তুরঙ্গ ও মণিভুষিত চামর প্রভৃতি প্রভূত উপহার শৌর্য্যবর্মাকে প্রদান করিলেন । এক সময়ে মৃগয়াকৌতুকে উৎসুক বিক্রমবেতাল শিবিকারোহণে চারু চামর দ্বারা বীজিত হইয়া গমন করিলেন; কুক্কুরীযুগল স্বর্ণশ্রৃঙ্খলে আবদ্ধ হইয়া তাঁহার সহিত গমন করিল এবং মহাড়ম্বরে ডিণ্ডিম প্রভৃতি বাদ্য হইতে লাগিল । রাজকুমারগণও পৃথক্‌ পৃথক্‌ বাহনে বাহিত হইয়া রাজার সহিত গমন করিয়াছিলেন । ১০-১৩

তাঁহারা পরস্পর পণবদ্ধ হইয়া শশামিষের অনুসন্ধিৎসু হইলেন । তৎকালে রাজকুমারগণের মধ্যে এক মহা কোলাহল উপস্থিত হইল । রাজা সমানবয়স্ক রাজকুমারগণের মধ্যে একজনের সহিত বহুমূল্যপণে আবদ্ধ হইয়া সকৌতুকে মৃগয়াক্রীড়া করিতেছিলেন, কুক্কুরীদ্বয়ের মধ্যে একটী রাজার নিকট ও অপরটী রাজকুমারের নিকট রহিল । ১৪-১৫

তৎকালে এক শশক ঘন লতাবলীসমাকুল স্থানের দিকে অতিবেগে ধাবিত হইয়াছিল, রাজা দোলা হইতে অবতরণ করিয়া সেই শশকের পশ্চাতে তাঁহার কুক্কুরীকে ছাড়িয়া দিলেন । এদিকে রাজার প্রিয়পাত্র রাজকুমারও সেই শশকের পশ্চাতে তাঁহার কুক্কুরীকে সেই ঘনলতাকুঞ্জের উল্লেখপূর্বক পরিত্যাগ করিলেন । উহারা এমনই বিষম বেগে শশকের পশ্চাদ্ধাবন করিল যে, তাহাদের গতি লক্ষ্য হইল না । তখন শশকও এমনই বেগে ধাবিত হইয়াছিল যে বোধ হইল যেন সে আকাশেই যাইতেছে । ১৬-১৮

ক্রমে অতি শ্রমবশে শশক একটা মহাগর্তে পতিত হইল, তাই কুক্কুরী তাহাকে ধরিতে পারিল না । অনন্তর রাজার কুক্কুরী ক্রুদ্ধা হইয়া বেগে ধাবমান সেই শশককে আক্রমণ করিল, শশক ফেন বমন করিতে লাগিল । অতঃপর শশক কোনরূপে লম্ফপ্রদানপূর্বক স্খলিত গতিতে কিছুদূর গমন করিল । ইত্যবসরে যেমন রাজকুমারের কুক্কুরী আসিয়া শশকের কন্ধরদেশ কামড়াইয়া ধরিল, অমনি রাজকুমারগণ আমাদের জয় হইয়াছে বলিয়া উচ্চ চীৎকার করিয়া উঠিলেন । তাঁহাদের কোলাহলে তদীয় কুক্কুরী শঙ্কিত হইয়া পড়িল তাই শশক সেই কুক্কুরীর মুখ হইতে মুক্ত হইল, কিন্তু কুক্কুরীদংষ্ট্রাক্ষত হইতে রুধিরধারা পড়িতে লাগিল । শশক সত্বর গমনে কোন মর্মর ভূভাগে গিয়া লুকাইয়া রহিল । ঘনরোষাবিষ্টা রাজকুক্কুরী ভূভাগের গন্ধ গ্রহণ করিতে করিতে তথায় যাইয়া শশককে দেখিয়া ফেলিল । শশক কুক্কুরী কর্তৃক দৃষ্ট হইবামাত্র অতিত্রস্ত হইয়া হস্তমাত্র অগ্রসর হইল । ১৯-২৪

শশক যেখানে উপস্থিত হইল উহা বৎস নামক জনৈক জিতেন্দ্রিয় দ্বিজের আশ্রম । ঐ আশ্রম কর্পূর-কদলী-সমাকুল ও উহার সন্নিহিত পর্বতের গুহাগৃহে বরাহ ও ব্যাঘ্রগণ বাস করে । তথায় প্রফুল্ল কেতকী কুসুমের পরাগরাশি দেহে মাখিয়া এবং চোলীকপোলফলকসমূহ চুম্বন করিয়া সমীরণ প্রবাহমাণ হয় । সে স্থানে বিশুদ্ধ হরিণগণ তরুচ্ছায়ায় বিশ্রাম করে, বৃক্ষ হইতে নারিকেল ফল সকল স্বয়ং ভূতলে পতিত হয়, শাখামৃগগণ পক্ক আম্র ফল দ্বারা পরম তৃপ্তি পায়, সিংহসমূহ করিশাবকগণের সহিত ক্রীড়া করে এবং সর্প সকল ময়ূরগণের সহিত নির্ভয়ে খেলা করিয়া থাকে । এবম্ভূত আশ্রম মধ্যে থাকিয়া শান্ত দ্বিজ বৎস অহর্নিশ গীতার চতুর্দশাধ্যায় জপ করিতেন । ২৫-২৯

তথায় তদীয় শিষ্য যে জল দ্বারা পাদপদ্ম বিধৌত করিতেন সেই জলে যে স্থান কর্দমাক্ত হইয়াছিল, অল্পাবশিষ্টজীবনে শশক মুহুর্মুহু শ্বাস পরিত্যাগ করিতে করিতে গিয়া সেই কর্দমে পতিত হইল । অতঃপর শশক কর্দমসম্পর্ক মাত্র সংসার হইতে উত্তীর্ণ হইল, সে দিব্য বিমানে আরুঢ় হইয়া স্বর্গে গমন করিল । শুনীর অঙ্গেও অল্পবিস্তর কর্দম লিপ্ত হইয়াছিল, তাহাতেই তাহার ক্ষুধা ও পিপাসাপীড়া দূরীভূত হইল, সেও শুনীরূপ পরিত্যাগ করিয়া অমরনারীপরিশোভিত গন্ধর্বগণবিভিষিত দিব্য বিমানারোহণে অমরপুরে প্রস্থান করিল । ৩০-৩৩

তখন স্বকন্ধর নামক মেধাবী দ্বিজশিষ্য হাসিলেন এবং তিনি তির্য্যক্‌দ্বয়ের পুর্বজন্মের বৈরকারণ বিচার করিয়া বিস্মিত হইলেন । ৩৪

এই ব্যাপারে রাজারও বিস্ময়ে নয়ন প্রফুল্ল হইল । সেই অদ্বিতীয় বিনয়সাগর রাজা পরম ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন - "হে বিপ্র ! হীন শুনী ও শশকশাবক স্বর্গে গমন করিল, আমার নিকট এতদ্বিষয়ক কথা কীর্তন করুন ।" ৩৫-৩৬

শিষ্য কহিলেন
এই বনে বৎস নামক জনৈক জিতেন্দ্রিয় দ্বিজ আছেন; তিনি নিরন্তর গীতার চতুর্দশাধ্যায় জপ করেন । হে ভূপাল ! আমি তাঁহার ব্রহ্মবিদ্যাবিশারদ শিষ্য । হে নৃপ ! আমিও প্রত্যহ গীতার চতুর্দশাধ্যায় জপ করিয়া থাকি । হে ভূপতে ! আমার পাদপদ্মপ্রক্ষালিত জলে শরীর বিলুণ্ঠিত করিয়া শুনী শশকসহ স্বর্গে গমন করিয়াছে । ৩৭-৩৯

রাজা জিজ্ঞাসিলেন
হে দ্বিজোত্তম ! আপনি হাসিলেন কেন ? আমার মনে হয়, ইহার কোন কারণ থাকিবে, তাই আমি এ বিষয়ে শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়াছি । ৪০

শিষ্য উত্তর করিলেন
মহারাষ্ট্রদেশে প্রত্যুদক নামে এক মহানগর আছে, সেখানে ধূর্তাগ্রণী কেশব নামক জনৈক দ্বিজ বাস করতেন । তাহার পত্নীর নাম বিলোভনা, বিলোভনা ব্যভিচারিণী । একদা কেশব আজন্মের বৈর বিচারপূর্বক ক্রুদ্ধ হইয়া বিলোভনাকে বধ করে এবং সেই নারীবধপাতকে কেশব শশক হইয়া জন্ম লয় । আর ব্যভিচার পাপে বিলোভনা শুনী হইয়া জন্মগ্রহণ করে । উহারা বহুধা যোন্যন্তর পরিগ্রহ করিলেও পূর্বজন্মাভ্যস্ত বৈর ভাব পরিত্যাগ করে নাই । ৪১-৪৪

অনন্তর ভূপাল বিক্রমবেতাল এই সকল শুনিয়া শ্রদ্ধান্বিত হইলেন । তিনি সমগ্র গীতা অভ্যাস করিয়া পরম গতি প্রাপ্ত হইলেন । ৪৫


[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৮৮ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


সিংহলদ্বীপে বিক্রম-বেতাল নামে এক রাজা ছিলেন । একদিন বনে মৃগয়া করার সময় এক খরগোশের পেছনে তিনি তার শিকারী কুকুরী লেলিয়ে দেন । কুকুরের তাড়া খেয়ে খরগোশটি ঊর্দ্ধশ্বাসে যেন উড়তে উড়তে এক সুন্দর, শান্ত আশ্রমে এসে পৌছল । সেখানে হরিণেরা গাছের ছায়ায় সুখে বসে আছে । ব্যাঘ্র শিশুরা হস্তিশাবকদের সাথে খেলা করছে, আর সাপেরা ময়ুরের গায়ের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছে ।

ওই আশ্রমটি ছিল জিতেন্দ্রিয় মুনি বৎসের, যিনি অহর্নিশ গীতার চতুর্দশাধ্যায় জপ করতেন । কাছেই এক জায়গায় তার শিষ্যের নিত্য পা ধোয়ার ফলে মাটি ভিজে কাদা হয়ে গিয়েছিল । দৌড়তে দৌড়তে ক্লান্ত খরগোশটি সেই কাদায় পা পিছলে পড়ে যাওয়া মাত্র সংসার থেকে উত্তীর্ণ হল এবং তখন সে এক দিব্য বিমানে চড়ে স্বর্গে চলে গেল । মুহুর্তকাল পরে খরগোশের খোঁজে কুকুরটা সেখানে আসার পর তারও একই অবস্থা হয় ।

এসব দেখে বৎসের শিষ্যটি হাসতে লাগল । তখন বিস্মিত রাজা বিক্রম-বেতাল তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে ব্রাহ্মণ, হীন যোনি, অজ্ঞান এই খরগোশ ও কুকুরী কি করে স্বর্গ লাভ করল ? আপনি হাসিলেনই বা কেন ?" উত্তরে শিষ্যটি বলল, "হে মহারাজ, মহামুনি বৎসের ব্রহ্মবিদ্যাবিশারদ শিষ্য আমি । আমার গুরুর মত আমিও প্রতিদিন গীতার চতুর্দশাধ্যায় জপ করে থাকি । আমার পা ধোয়ার জলে ভিজে যাওয়া মাটির স্পর্শে ওই খরগোশ ও কুকুরী স্বর্গ লাভ করেছে ।"

শিষ্যটি আরো বলল, "একদা মহারাষ্ট্রের প্রতুধক শহরে কেশব নামে এক ব্রাহ্মণ ছিল । তার পত্নীর নাম ছিল বিলোভনা । বিলোভনা ব্যভিচারিণী ছিল, যার ফলে একদিন রেগে গিয়ে কেশব তাকে হত্যা করে । নারীবধ পাপের ফলে কেশব পরজন্মে খরগোশ হল, আর ব্যভিচার পাপের ফলে বিলোভনা পরজন্মে কুকুরী হল । আমি এই ভেবেই হাসছি যে পূর্বজন্মের শত্রুতা এরা পরের জন্মেও বজায় রেখেছিল ।"

গীতার চতুর্দশাধ্যায়ের এই মাহাত্ম্য শুনে রাজাও তখন তা অভ্যাস করা শুরু করলেন এবং অচিরেই পরম গতি প্রাপ্ত হলেন ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk
 
<Previous--Contents--Next>

Tuesday, August 18, 2015

শ্রীশ্রীগীতামাহাত্ম্যম্‌ (Padmapuran-13)


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়ের মাহাত্ম্য

(শ্রীতারাকান্ত দেবশর্মা)*

পার্বতী বলিলেন
আপনি দ্বাদশাধ্যায়মাহাত্ম্য আমার নিকট কহিলেন, সম্প্রতি অতিসুন্দর ত্রয়োদশাধ্যায়মাহাত্ম্য বর্ণন করুন । ১

মহাদেব কহিলেন
হে শিবে ! মাহাত্ম্যসাগর ত্রয়োদশাধ্যায় শ্রবণ কর, ইহা শ্রবণমাত্রেই অতিমাত্র আমোদ প্রাপ্ত হইবে । ২

দক্ষিণাপথে মহানদী তুঙ্গভদ্রা বিদ্যমানা, তুঙ্গভদ্রাতটে হরিহরপুর নামে রম্য নগর বিরাজিত । হে দেবী ! হরিহরপুর নগরে স্বয়ং ভগবান্‌ হরিহর অবস্থিত, তাঁহার দর্শনমাত্রেই পরম মঙ্গল লাভ হয় । ৩-৪

ঐ নগরে তপঃস্বাধ্যায়নিরত বেদপারগ শ্রোত্রিয় হরিদীক্ষিত নামক জনৈক দ্বিজ বাস করিতেন । তাঁহার পত্নীর নাম দুরাচারা । দুরাচারা নামে ও কার্য্যেও দুরাচারা । স্বৈরচারিণী দুরাচারা কদাচ পতির সহিত শয়ন করিত না এবং ক্ষণকালও গৃহে থাকিত না । দুরাচারা পতির সম্মুখে আকণ্ঠ বারুণী-মদ্যপান করিয়া পতিসম্বন্ধী বান্ধবগণকে নিরতিশয় তিরস্কার করিত এবং সর্বদা উন্মত্ত হইয়া উপপতিদিগের সহিত রত থাকিত । ৫-৮

নিজ যৌবনগর্বিতা ধুর্তা দুরাচারা একদা পৌরগণ কর্তৃক পুর ইতস্ততঃ সমাকুল অবলোকন করিয়া নির্জন কান্তারে এক সঙ্কেত গৃহ নির্মাণ করিয়া তথায় উপপতিগণের সহিত রতিক্রিয়ায় বহুকাল অতিবাহিত করিতে লাগিল । অনন্তর নির্বিঘ্নে সেই রমণী রম্য হরিহরপুরে এই ভাবে বাস করিতে থাকিলে একদা মদনসখা বসন্ত কাল আসিয়া সমুপস্থিত হইল, তখন আম্র বৃক্ষের আমূল পল্লবে সমাকীর্ণ হইল, পিকগণের পঞ্চমালাপে মৃত মদন যেন পুনর্জীবন পাইল, প্রফুল্ল চম্পক কুসুমের সুরভি হার পরিধান করিয়া মলয়মারুত মন্দ মন্দ প্রবাহে বনদ্রুম আন্দোলিত করিল এবং উৎফুল্ল মল্লিকা কুসুমের আমোদ-মদিয়া-পানাকুল অলিকুলের কলটঙ্কারে কাননের সর্বস্থান শোভিত হইতে লাগিল । সুগন্ধি সরোবরসমূহের প্রসন্ন ও মনোজ্ঞ গন্ধে বসন্তের বিকাশ হইল, চঞ্চল মরালমালাকুল সরোবরসমূহ দ্বারা বসন্ত আত্মবিকাশ করিল । হরিণগণ স্ব-স্ব শিশু সঙ্গে লইয়া বনের ঘনচ্ছায়ায় সুখে সমাসীন হইল এবং ঘনপল্লবশালী শাখিসমূহে কানন নিরতিশয় সমৃদ্ধ হইয়া উঠিল । ৯-১৬

এবংবিধ বসন্ত সময়ের নিশীথে সেই প্রমুদিতা অভিসারিকা রমণী অবলোকন করিল - জগদানন্দদায়িনী চন্দ্রিকা সমুদিতা হইয়াছে, চকোরের চঞ্চুর অগ্রে হিম পতিত হইয়াছে, সেই হিম চকোরচঞ্চুর অগ্রভাগ হইতে পীযুষ-শীকরাকরে গলিত হইতেছে । শিলা সকলের উপর হিমবিন্দু পতিত হইয়াছে, সেই বিন্দু গাঢ় সুধানির্ঝরাকারে গলিয়া পড়িতেছে এবং বিকশিত কুসুমের ক্রোড়ে শিশিরসমূহ পতিত হইয়া ঘনীভূত হইয়া রহিয়াছে । আকাশতল যেন উল্লাসিত জলরাশির কল্লোলে আলিঙ্গিত রহিয়াছে । সেই চন্দ্রিকা মদনের মহা খড়্গরূপিনী, যেহেতু কুলটাগণের কণ্ঠ কর্তনে উহা যোগ্য । পরার্থসাধিনী হিমগর্ভিনী জ্যোৎস্না ঘনান্ধকারনিকর বিদারণ করিয়া নিজ পটুতা প্রদর্শন করিতেছে, সতী রমণীর হৃদয় স্বচ্ছ করিয়া দিতেছে এবং দুঃখিত জনের হৃদয়ে আনন্দ প্রদান করিতেছে । নলিনী মলিনা হইয়া সঙ্কুচিত হইতেছে । চক্রবাক চক্রবাকীর বক্ত্র ধারণ করিয়া করুণক্রন্দনপূর্বক বসন্তের যে প্রভাব বুঝাইয়া থাকে, বসন্তজ্যোৎস্না তাহার সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে এবং মুক্তাপঙ্‌ক্তির অমল কিরণে দিগন্ত উদ্‌ভাসিত হইয়াছে । ১৭-২২

অনন্তর এইরূপে সেই জ্যোৎস্না প্রভূত প্রভায় দশদিক্‌ উদ্‌ভাদসিত করিলে কামিনী কামান্ধ হইয়া পথমধ্যবর্তী সৌধে বিহার করিতে লাগিল, কিন্তু সে রাত্রিতে তাহার উপপতিরা আসিল না; কামিনী উপপতিগণকে অনাগত দেখিয়া গৃহের অর্গল খুলিয়া নির্গত হইল এবং ক্রমে সেই নগরবহিস্থ সঙ্কেতগৃহে গমন করিল । কামমোহিতমনা ঐ কামিনী সে স্থানে উপস্থিত হইয়া কোন প্রিয়তমকে দেখিতে পাইল না; সে কুঞ্জে কুঞ্জে বনে বনে অন্বেষণ করিয়াও কাহাকেও দেখিল না, কেবল পদে পদে প্রিয়কান্তের মন্দালাপ তাহার কর্ণে প্রবেশ করিতে লাগিল । সে কখন কিছুদূর গমন ও কখন বা নিজে নিজে ক্রীড়া করিতে থাকিলে এক মনোহর রব তাহার শ্রুতিগোচর হইল, চক্রাবাকরব শ্রবণে সে কান্তরবভ্রমে মুহুর্মুহু সরোবরে পর্য্যটন করিল; আবার আমি আসিয়াছি বলিয়া তরুতলপ্রসুপ্ত হরিণগণকে পতিভ্রমে উচ্ছ্বাসসহকারে প্রবোতিত করিতে লাগিল । প্রাণেশ্বর মনে করিয়া স্থাণূকে আলিঙ্গন ও নিজ কান্তের মুখভ্রমে বিকসিত কমলে চুম্বন করিল; কিন্তু পদে পদে প্রিয়ের অদর্শনে ব্যররথমনোরথ হইয়া শ্রান্ত হইল এবং বিবিধ বাক্যে বিলাপ করিয়া সেই বনে মূর্চ্ছিতপ্রায় হইয়া পড়িল । ২৩-৩০

কামিনী কহিল
হা কান্ত ! আমি তোমার গুণে আক্রান্ত, তুমি আমার চৈতন্যনায়ক । হে মনোহর; হে সৌভাগ্য ! হে ভাগ্যলাবণ্যনিধি ! হায় হায় পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় তোমার বদন, নলিনীর ন্যায় তোমার নয়ন । হা কান্ত ! তুমি তপ্ততাপনাশে কল্পতরুতুল্য, যদি কোনরূপ রোষবশে গুপ্তবেশে এখানে থাক তবে হে কান্ত ! প্রিয় প্রাণের অন্ত করিয়াও তোমায় প্রসন্ন করিতেছি । ৩০-৩৩

সেই বিরহিণী সর্বদিকে এইরূপ উচ্চ বিলাপবাণী উচ্চারণ করিতে লাগিল । তাহার বাক্য শুনিয়া এক সুপ্ত শার্দুল প্রবুদ্ধ হইল, ব্যাঘ্র ঘুর্‌ ঘুর্‌ শব্দ করিয়া রোষবশে সকল দিক্‌ নিরীক্ষণ করিতে লাগিল; সে নখনিকর দ্বারা ভুমিতলে আস্ফালন করিয়া মেঘগর্জনে গর্জিয়া উঠিল, পৃষ্ঠদেশে লাঙ্গুল তুলিয়া বেগভরে সত্বর উঠিয়া পড়িল এবং সেস্থানে সেই অভিসারিকা অবস্থিত ছিল, লম্ফ প্রদানপূর্বক তথায় পতিত হইল । ৩৪-৩৬

অনন্তর পতিভ্রমে প্রেমনির্ভরমনা অভিসারিকাও শার্দুলকে সমাগত দেখিয়া তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইল । অনন্তর এই অসতী কামিনী ক্রূর ব্যাঘ্রের নখক্রীড়ায় অন্ধ হইল, এবং ঊর্জিত গর্জন শুনিয়া প্রিয়শরীর-ভ্রমও পরিহার করিল । ৩৬-৩৭

সেই নারী সেই অবস্থায়ও ভ্রান্তি পরিহার করিয়া সত্বর ব্যাঘ্রকে বলিল
হে ব্যাঘ্র ! কিজন্য তুমি আমাকে নিহত করিতে এখানে আগমন করিয়াছ ? কেন তুমি আমার বধার্থী হইয়াছ ? এ সকল আমাকে বল । ৩৮-৩৯

চণ্ডবিক্রম ব্যাঘ্র নারীর এইরূপ প্রশ্নশ্রবণে ক্ষণকালের জন্য ভক্ষণে বিরত হইয়া যেন হাসিতে হাসিতে উত্তর করিল, - ৪০

দক্ষিণদেশে মলাপহানাম্নী এক নদী আছে, তাহার তটে মুনিপর্ণানাম্নী নগরী বিরাজ করে । সেখানে সাক্ষাৎ পঞ্চলিঙ্গ মহেশ্বর বিরাজ করেন । সেই মুনিপর্ণা পুরীতে আমি জনৈক দ্বিজতনয় হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিলাম, আমি অযাজ্য যাজন ও সেই নদীতটে একোদ্দিষ্টের অন্ন ভক্ষণ করিতাম । আমি লোভবশে ধনাকাঙ্খায় বেদপাঠফল বিক্রয় করিতাম, দুর্বাক্য দ্বারা অপরাপর ভিক্ষুকগণকে তিরস্কার করিতাম, অদেয় ধন গ্রহণ করিতাম এবং ক্ষণকাল পরে প্রত্যর্পণ করিব বলিয়া অনিশ সকলকে বঞ্চিত করত তাহাদের ধন গ্রহণ করিয়া প্রত্যর্পণ করিতাম না । অনন্তর কিয়ৎকাল অতীত হইলে আমার বার্ধক্য উপস্থিত হইল, আমি বলীপলিতবান্‌ ও অন্ধ হইলাম, আমার গতি স্খলিত হইল, আমি চলিতে গিয়া পড়িয়া যাইতে লাগিলাম এবং আমার দন্ত পড়িয়া গেল । এইরূপ বার্ধক্য দশায় উপনীত হইয়া আমি ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিলাম । করে কুশ ধারণ করিয়া তীর্থসন্নিধানে সমাগত হইলাম, এবং ধনপ্রাপ্তির আশায় পর্বে পর্বে পরিভ্রমণ করিয়া শিথিলাঙ্গ হইলাম । অনন্তর আহারার্থ প্রার্থনা করিবার জন্য জনৈক ব্রাহ্মণের গৃহে গমন করিলাম, পথমধ্যে আমার পদে কুকুর দংশন করিল, আমি মুর্ছিত হইয়া ক্ষণকালমধ্যে ক্ষিতিতলে পতিত হইলাম । তারপর আমি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া শার্দুলযোনি লাভ করিলাম । ৪১-৪৯

আমি পূর্বপাপ স্মরণ করিয়া এই কান্তারে বাস করিতেছি । আমি ধার্মিক, সাধু, সতী ও মুনিজনকে ভক্ষণ করি না কিন্তু পাপী, দুরাচার ও অসতীদিগকে ভক্ষণ করিয়া থাকি । তুমি যথার্থ অসতী । তাই তুমি আমার কবলিত হইবে । শার্দুল এইরূপ বলিয়া ক্রূর নখর দ্বারা তাহার দেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া খাইয়া ফেলিল । ৫০-৫২

ব্যাঘ্রভক্ষিত হইয়া সে পাপ-দেহ ধারণ করিলে যমদূতেরা তৎক্ষণাৎ যমপুরে লইয়া গেল এবং যমের আদেশে সত্বর বিষ্ঠামূত্র ও রক্তপূর্ণ ঘোর নরকে তাহাকে অনেকবার পাতিত করিল । অনন্তর কোটিকল্পকাল বিষ্ঠামূত্রাদি পানের পর যমকিঙ্করেরা তাহাকে তথা হইতে আনয়ন করিয়া শত মন্বন্তর পর্য্যন্ত রৌরব নরকে রাখিয়া দিল । তারপর ঐ ভগ্নদেহা মুক্তকেশা সর্বতোমুখ-রোদনপরায়ণা দীনা পাপিনীকে বহ্নিমুখে নিক্ষেপ করিল । অনন্তর এবংবিধ ক্লেশসঙ্কুল ঘোর নরকযাতনা ভোগ করিয়া ঐ মহাপাপা ইহলোকে পুনরায় চণ্ডালযোনিতে জন্মগ্রহণ করিল । অতঃপর শ্বপচগৃহে দিনে দিনে বর্ধমানা হইয়া সে পূর্বপাপবশে পূর্বের ন্যায় ব্যভিচারিণী হইল । ৫২-৫৮

অনন্তর কতিপয় কাল অতীত হইলে যেস্থানে শিবের অন্তঃপুরেশ্বরী জৃম্ভকা দেবী অবস্থিতা ছিলেন চণ্ডালী তথায় উপস্থিত হইল । সেস্থানে বসুদেব নামক জনৈক শুদ্ধচেতা দ্বিজ নিরন্তর গীতার ত্রয়োদশাধ্যায় পাঠ করিতেন, চণ্ডালী তাঁহাকে দর্শন ও তাঁহার মুখে গীতাধ্যায় শ্রবণ করিবামাত্র চণ্ডালদেহ হইতে মুক্ত হইল এবং দিব্যদেহ প্রাপ্ত হইয়া ত্রিদশালয়ে গমন করিল । ৫৮-৬১

[পদ্মপুরাণ, উত্তর খণ্ড, ১৮৭ অধ্যায়]
_________________________________________

চলিত বাংলায় সারাংশ


দক্ষিণ ভারতে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে হরিহরপুর নামে এক সুন্দর শহর আছে । সেখানে হরিহর নামে শিবের এক বিগ্রহ পূজিত হয়ে থাকেন, যাঁর দর্শনে কল্যাণকারী বস্তু লাভ হয় ।

এই হরিহরপুরে হরিদীক্ষিত নামে এক সরল, অনাড়ম্বর জীবন যাপনকারী এক পণ্ডিত ব্রাহ্মণ বাস করতেন । কিন্তু তাঁর স্ত্রী ছিল অতি দুরাচারী । সব সময় সে তার স্বামীকে কটু কথা বলত; স্বামীর বন্ধুদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করত; আর পর পুরুষের সাথে কাম পিপাসা চরিতার্থ করত । এ ছাড়াও সে বিভিন্ন রকমের মাদকাসক্ত ছিল । তার প্রেমিকদের সাথে অবাধ মেলা-মেশার জন্য সে বনের মধ্যে নির্জনে এক কুটির বানিয়েছিল ।

একদিন রাত্রিতে সে খুবই কামার্ত হয়ে সেই কুটিরে গিয়ে কোন প্রেমিককে না পেয়ে বনের মধ্যে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল পুরুষের সন্ধানে । সেই সময় এক বাঘ এসে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে কামার্তা নারীটি বাঘটির কাছে জানতে চাইল কেন সে তাকে মারতে চাইছে ।

বাঘের কথা
দক্ষিণ দেশে মালাপহা নদীর তীরে মুনিপূর্ণ নামে এক শহর আছে । সেখানে পঞ্চলিঙ্গ নামে ভগবান শিবের এক বিখ্যাত বিগ্রহ আছে । সেই শহরে, এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আমার জন্ম হলেও আমি খুবই লোভী ছিলাম । নিজের ইন্দ্রিয়ের উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না । আমি নদী-তীরে বসে অর্থের লোভে অযোগ্য লোকেরও যজ্ঞ সম্পাদন করে দিতাম; বিষয়ী লোকদের বাড়িতেও আমি আহার করতাম; যজ্ঞ ও বিগ্রহ অর্চনার নামে আমি প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করতাম এবং নিজের ইন্দ্রিয়-সুখের জন্য সেই অর্থ ব্যয় করতাম । আমি সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণদের নিন্দা করতাম এবং কাউকে কখনও দান দিতাম না । ক্রমে আমি বৃদ্ধ হলাম - চুল পেকে গেল, দাঁত পড়ে গেল, দৃষ্টিশক্ত কমে গেল - কিন্তু তবুও আমার লোভ ও লালসার নিবৃত্তি হল  না । একদিন আমি ভুল করে কতগুলি শঠ ও নিষ্ঠুর ব্রাহ্মণের বাড়িতে খাদ্য ভিক্ষা করতে গেলে তারা আমার ওপর কুকুর লেলিয়ে দিল । কুকুরের কামড় খেয়ে আমি পড়ে গিয়ে মরে যাই । তারপর থেকে আমি এই বাঘের দেহ লাভ করে এই বিপদসঙ্কুল বনে বাস করছি । আমার পূর্বজন্মের স্মৃতি লুপ্ত না হওয়ায় এই জন্মে আমি কোন ভক্ত, সন্ন্যাসী বা সাধ্বী নারীকে আক্রমণ করি না । শুধু পাপাত্মা ও অসতী নারীদের খাই । তুই হলি সবচেয়ে অসতী ও পাপী নারী । তাই তোকে দিয়েই আমার দুপুরের খাবার হবে ।"

কাহিনী শেষ করেই বাঘটি সে নারীকে খেয়ে ফেলল । এরপর যমদূতেরা তাকে 'দুয়াড়' নামক নরকে (মল, মূত্র ও রক্তের সরোবরে) নিক্ষেপ করল ।  দশ কোটি কল্প 'দুয়াড়' নরকের পর একশ মন্বন্তর 'রৌরব' নরকে তাকে থাকতে হয় । এরপর সে চণ্ডালিনী হয়ে মর্তে জন্মে আবার সেই পাপ-পথে জীবন যাপন করে । এই পাপের ফলে তার কুষ্ঠ ও যক্ষা রোগ হয় ।

ভাগ্যক্রমে আর একবার সে হরিহরপুরের তীর্থে যায় । অম্বিকাদেবীর (পার্বতী) মন্দিরের কাছে সে মহামুনি বসুদেবের নিরত গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায় পাঠ শুনে আকৃষ্ট হল । বার বার এই পাঠ শুনে সে তার চণ্ডালিনীর দেহ ত্যাগ করে তার অতীব পাপপূর্ণ কাজের প্রতিক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হল ।


_________________________________________
*Hard Copy Source:
"Padmapuran, Uttarkhanda (Bengali)" by Veda Vyas, translated by Sri Tarakanta Debasharrma, Krishnadas Shastri and Sriramdas Shastri, edited by Pandit Panchanan Tarkaratna. Bangabasi-Electro-machine edition, 1915. Published & printed by Sri Natabar Chakraborty for Bangabasi Karyalay, 38/2 Bhabanicharan Datta Street, Kolkata. First Nababharat Edition, 2013 (with identical page layout). Nababharat Publishers, 72 D, Mahatma Gandhi Road, Kolkata-700009. 1062p.

Hard Copy Reference:
"Srimadvagabadgeeta Mahatmya (Bengali)compiled by Sri Sanatangopal Das Brahmachari. 6th Edition, 2014 (First Edition 2005)Printed & published by Bhaktivedanta Book Trust, Mayapur-741313, Nadia, West Bengal, India. © 2014 by Bhaktivedanta Book Trust.

Sanskrit Source
English Translation

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk


<Previous--Contents--Next>