Showing posts with label Gita-16. Show all posts
Showing posts with label Gita-16. Show all posts

Saturday, March 14, 2015

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা : ষোড়শ অধ্যায় - দৈবাসুর-সম্পদ্‌-বিভাগযোগ (16-Jagadishchandra)


|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
(গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ)*

শ্রীভগবান্‌ বললেন -
নির্ভীকতা, চিত্তসূদ্ধি, আত্মজ্ঞাননিষ্ঠা ও কর্মযোগে তৎপরতা, দান, বাহ্যেন্দ্রিয় সংযম, যজ্ঞ, শাস্ত্র-অধ্যয়ন, তপঃ, সরলতা, অহিংসা, সত্য, অক্রোধ, ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দাবরজন, জীবে দয়া, লোভহীনতা, মৃদুতা (অক্রৌর্য), কু-কর্মে লজ্জা, অচাঞ্চল্য, তেজস্বিতা, ক্ষমা, ধৃতি, শৌচ, দ্রোহ বা হিংসা না করা, অনভিমান, - হে ভারত, এই সকল গুণ দৈবী সম্পদ্‌ অভিমুখে জাত পুরুষের হইয়া থাকে । ১,২,৩ (অর্থাৎ যাঁহারা পূর্বজন্মের কর্মফলে দৈবী সম্পদ্‌ ভোগার্থ জন্মগ্রহণ করেন তাঁহাদেরই এই সকল সাত্ত্বিক গুণ জন্মিয়া থাকে) ।

হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা এবং অজ্ঞান আসুরী সম্পদ্‌-অভিমুখে জাত ব্যক্তি প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ এই সকল রাজসিক এবং তামসিক প্রকৃতির লোকের ধর্ম । ৪

দৈবী সম্পদ্‌ মোক্ষের হেতু এবং আসুরী সম্পদ্‌ সংসার-বন্ধনের কারণ হয় । হে পাণ্ডব, শোক করিও না; কারণ তুমি দৈবী সম্পদ্‌ অভিমুখে জন্মিয়াছ । ৫

হে পার্থ, এ জগতে দৈব ও আসুর এই দুই প্রকার প্রাণীর সৃষ্টি হয় । দৈবী প্রকৃতির বর্ণনা সবিস্তার করিয়াছি, এক্ষণে আসুরী প্রকৃতির কথা আমার নিকট শ্রবণ কর । ৬

আসুরভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ জানে না যে, ধর্মে প্রবৃত্তিই বা কি আর অধর্ম হইতে নিবৃত্তিই বা কি, অর্থাৎ তাহাদের ধর্মাধর্ম, কর্তব্যাকর্তব্য জ্ঞান নাই । অতএব তাহাদের মধ্যে শৌচ, সদাচার বা সত্য কিছুই নাই । ৭

এই আসুর প্রকৃতির লোকেরা বলিয়া থাকে যে, এই জগতে সত্য বলিয়া কোন পদার্থ নাই, সকলই অসত্য; জগতে ধর্মাধর্মেরও কোন ব্যবস্থা নাই এবং ধর্মাধর্মের ব্যবস্থাপক ঈশ্বর বলিয়াও কোন বস্তু নাই । ইহা কেবল স্ত্রী-পুরুষের অন্যোন্যসংযোগে জাত (কামসম্ভূত) । স্ত্রী-পুরুষের কামই ইহার একমাত্র কারণ, ইহার অন্য কারণ নাই । ৮

পূর্বোক্ত দৃষ্টি (নিরীশ্বরবাদীদিগের মত) অবলম্বন করিয়া বিকৃতমতি, অল্পবুদ্ধি ক্রূরকর্মা ব্যক্তিগণ অহিতাচরণে প্রবৃত্ত হয়; তাহারা জগতের বিনাশের জন্যই জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে । ৯

যাহা কখনও পূর্ণ হইবার নহে, এইরূপ কামনার বশীভূত হইয়া দম্ভ, অভিমান ও গর্বে মত্ত হইয়া, তন্ত্রমন্ত্রাদি দ্বারা স্ত্রী-রত্নাদি প্রাপ্ত হইব, অবিবেকবশতঃ এইরূপ দুরাশার বশবর্তী হইয়া অশুচিব্রত অবলম্বন করতঃ তাহারা কর্মে (ক্ষুদ্র দেবতাদির উপাসনায়) প্রবৃত্ত হইয়া থাকে । ১০

মৃত্যুকাল পর্যন্ত অপরিমেয় বিষয়-চিন্তা আশ্রয় করিয়া (যাবজ্জীবন নিরন্তর বিষয়চিন্তাপরায়ণ হইয়া) বিষয়ভোগনিরত এই সকল ব্যক্তি নিশ্চয় করে যে, কামোপভোগই পরম পুরুষার্থ, এতদ্ব্যতীত জীবনের অন্য লক্ষ্য নাই, সুতরাং ইহারা শত শত আশাপাশে বদ্ধ এবং কামক্রোধপরায়ণ হইয়া অসৎ মার্গ অবলম্বনপূর্বক অর্থ-সংগ্রহে সচেষ্ট হয় । ১১,১২

অদ্য আমার এই লাভ হইল, পরে এই ইষ্টবস্তু পাইব, এই ধন আমার আছে, এই ধন আমার পরে হইবে, এই শত্রুকে আমি পরাজিত করিয়াছি, অন্যান্যকেও হত করিব; আমি সকলের প্রভু, আমিই সকল ভোগের অধিকারী, আমি কৃতকৃত্য, আমি বলবান্‌, আমি সুখী, আমি ধনবান্‌, আমি কুলীন, আমার তুল্য আর কে আছে ? আমি যজ্ঞ করিব, দান করিব, মজা করিব - এই প্রকার অজ্ঞানে বিমূঢ়, বিবিধ বিষয়-চিন্তায় বিভ্রান্তচিত্ত, মোহজালে জড়িত, বিষয়ভোগে আসক্ত ব্যক্তিগণ অপবিত্র নরকে পতিত হয় । ১৩-১৬

আত্মশ্লাঘাযুক্ত, অবিনয়ী, ধনমানের গর্বে বিমূঢ় সেই আসুর প্রকৃতির ব্যক্তিগণ দম্ভ প্রকাশ করিয়া অবিধিপূর্বক নামমাত্র যজ্ঞ করে । ১৭

সাধুগণের অসূয়াকারী সেই সকল ব্যক্তি অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধের বশীভূত হইয়া স্বদেহে ও পরদেহে অবস্থিত আত্মরূপী আমাকে দ্বেষ করিয়া থাকে । ১৮

এইরূপ দ্বেষপরবশ, ক্রুরমতি, নরাধম, আসুরপুরুষগণকে আমি সংসারে (ব্যাঘ্র-সর্পাদি) আসুরী যোনিতে পুনঃ পুনঃ নিক্ষেপ করিয়া থাকি । ১৯

হে কৌন্তেয়, এই সকল মূঢ় ব্যক্তি জন্মে জন্মে আসুরী যোনি প্রাপ্ত হয় এবং আমাকে না পাইয়া শেষে আরও অধোগতি (কৃমিকীটাদি যোনি) প্রাপ্ত হয় । ২০

কাম, ক্রোধ এবং লোভ - এই তিনটি নরকের দ্বারস্বরূপ, ইহারা আত্মার বিনাশের মূল (জীবের অধোগতির কারণ) । সুতরাং এই তিনটিকে ত্যাগ করিবে । ২১

হে কৌন্তেয়, নরকের দ্বারস্বরূপ এই তিনটি হইতে মুক্ত হইলে মানুষ আপনার কল্যাণ সাধনপূর্বক পরমগতি প্রাপ্ত হয় । ২২

যে ব্যক্তি শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছাচারী হইয়া কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে সিদ্ধি লাভ করিতে পারে না, তাহার শান্তি-সুখও হয় না, মোক্ষলাভও হয় না । ২৩

অতএব কর্তব্য-অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ, সুতরাং তুমি শাস্ত্রোক্ত ব্যবস্থা জানিয়া (ইহায়) যথাধিকার কর্ম করিতে প্রবৃত্ত হও । ২৪

___________________________

(১-৩) আসুরিক প্রকৃতির লোক তাঁহাকে চিনে না, সুতরাং অবজ্ঞা করে; দৈবী বা সাত্ত্বিক প্রকৃতির লোক তাঁহাকে ভক্তি করে [৯|১১-১৩] । এই উভয় প্রকৃতির বিস্তারিত বর্ণনা এই অধ্যায়ে করা হইতেছে এবং আসুরী প্রকৃতির কিরূপে সংশোধন হয় তাহাও উপদেশ দেওয়া হইয়াছে । 
(৮) অথবা মতান্তরে, জগতের শাস্ত্রোক্ত কোন সৃষ্টি-পরম্পরা নাই । জগতের সকল পদার্থই মনুষ্যের কামনা-বাসনা তৃপ্ত করিবার জন্য । তাহাদের অন্য কোনও উপযোগ নাই । 
(১৭) এই সকল বিবেকহীন ব্যক্তি, বুদ্ধিভ্রংশকারী তামসী ও রাজসী প্রকৃতির বশে, আমাকে অবজ্ঞা করিয়া থাকে । উহাদের আশা ব্যর্থ, কর্ম নিষ্ফল, জ্ঞান নিরর্থক এবং চিত্ত বিক্ষিপ্ত । [৯|১২]

(১৮) আমি অন্তর্যামিরূপে সকলের মধ্যেই আছি, কিন্তু দম্ভবশে আমার অন্তর্যামিত্ব অস্বীকার করিয়া স্বদেহস্থিত আমাকে দ্বেষ করে এবং প্রাণি-হিংসাদি দ্বারা অন্য দেহেও আমাকে দ্বেষ করিয়া থাকে । 
(২৩) সিদ্ধি = পুরুষার্থ প্রাপ্তির যোগ্যতা (শঙ্কর); তত্ত্বজ্ঞান (শ্রীধর) ।

(২৪) শাস্ত্র = শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি । ধর্মশাস্ত্র = কর্তব্যাকর্তব্য নির্ণায়ক শাস্ত্র; আধুনিকগণ ইহাকে নীতিশাস্ত্র বলেন । কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্যে নীতিশাস্ত্র বলিতে কেবল রাজনীতিই বুঝায় । উহা ধর্মশাস্ত্রেরই অন্তর্গত ।

(২৪) ইহ = কর্মাধিকারে বর্তমান থাকিয়া (শ্রীধর); এই লোকে (তিলক); এই কর্মাধিকার-ভূমিতে অর্থাৎ ভারতবর্ষে (শঙ্কর) । ভারতবর্ষ কর্মভূমি, মোক্ষ সাধনার শ্রেষ্ঠ স্থান, দেবগণও এস্থানে জন্মগ্রহণ বাঞ্ছা করেন [বৃহন্নারদীয় পুরাণ ৩|৪৯-৫৬, ৬৯-৭৯; অপিচ, ভাগবত ৫|১৯-২৭] ।
___________________________
*Hard Copy Source:

"Sri Gita" or "Srimadbhagabadgeeta" by Gitashastri Jagadish Chandra Ghosh & Anil Chandra Ghosh. 26th Edition - June 1997 (1st Edition, 1925 from Dhaka now in Bangladesh). Published by Subhadra Dey (Ghosh), Presidency Library, 15 Bankim Chatterjee Street, Kolkata-700073. Printed by Web Impressions Pvt.Ltd., 34/2 Beadon Street, Kolkata-700006.



Disclaimer: This site is not officially related to Presidency LibraryKolkataThis is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

Sunday, August 17, 2014

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : ষোড়শ অধ্যায় – দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ (Gita : Chapter 16)

|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
 (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)*
 
[নবম অধ্যায়ে সূচিত দৈবী, আসুরী ও রাক্ষসী নামক প্রকৃতিত্রয়ের বিস্তৃত ব্যাখ্যার জন্য এই অধ্যায় আরম্ভ হইতেছে । দৈবী প্রকৃতি মোক্ষ সম্পাদন করে এবং আসুরী ও রাক্ষসী প্রকৃতি বন্ধন সৃষ্টি করে । অতএব দৈবী প্রকৃতি গ্রহণ ও অপর প্রকৃতিদ্বয় পরিবর্জনের জন্য ] -

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
হে অর্জুন, যাঁহারা দৈবী (সাত্ত্বিকী) অবস্থালাভের যোগ্য হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহাদের ভয়শূন্যতা, ব্যবহারকালে পরবঞ্চন- ও মিথ্যাকথন-বর্জন, জ্ঞান ও যোগে নিষ্ঠা, সামর্থ্যানুসারে দান, বাহ্যেন্দ্রিয়ের সংযম, যজ্ঞ (বেদবিহিত অগ্নিহোত্রাদি এবং স্মৃতিশাস্ত্র-বিহিত পঞ্চবিধ যজ্ঞ), স্বাধ্যায় (বেদপাঠ, ব্রহ্মযজ্ঞাদি), তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, শান্তি, পরদোষ প্রকাশ না করা, দীনে দয়া, লোভরাহিত্য, মৃদুতা, অসৎ চিন্তা ও অসৎ কর্মে লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ক্ষমা, ধৈর্য, বাহ্যাভ্যন্তর শৌচ, অবৈরভাব, অনভিমান - এই ছাব্বিশটি সদ্‌গুণ লাভ হয় । ১-৩

হে পার্থ, যাহারা আসুরী অবস্থালাভের যোগ্য হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের মধ্যে ধর্মধ্বজিত্ব, ধন ও স্বজননিমিত্ত দর্প, অহঙ্কার, ক্রোধ, বাক্যে ও ব্যবহারে কর্কশভাব ও কর্তব্যাকর্তব্য বিষয়ে অবিবেক - এই সকল (ভাবী অকল্যাণের কারণ) আসুরী সম্পদ্‌ আবির্ভূত হয় । ৪

দৈবী সম্পদ্‌ সংসার-বন্ধন হইতে মুক্তির হেতু এবং আসুরী সম্পদ্‌ সংসার-বন্ধনের কারণ । হে পাণ্ডব, শোক করিও না । তুমি দৈবী সম্পদের যোগ্য হইয়াই জন্মগ্রহণ করিয়াছ । ৫

হে পার্থ, এই জগতে দেবস্বভাব ও অসুরস্বভাব - এই দুই প্রকার মানুষ সৃষ্ট হইয়াছে । দেবস্বভাবসম্পন্ন মানুষের কথা বিস্তৃতভাবে বলিয়াছি । এখন অসুরস্বভাববিশিষ্ট মানুষের কথা আমার নিকট শ্রবণ কর । ৬

অসুরস্বভাব ব্যক্তিগণ ধর্মবিষয়ে প্রবৃত্ত এবং অধর্মবিষয় হইতে নিবৃত্ত হইতে জানে না; তাহাদের শৌচ নাই, সদাচার নাই এবং সত্যও নাই । ৭

আসুরস্বভাববিশিষ্ট ব্যক্তিগণ বলে, এই জগৎ সত্যশূন্য; ইহা ধর্মাধর্মের ব্যবস্থাহীন । ইহার কর্মফলদাতা ঈশ্বর নাই এবং কামবশতঃ স্ত্রী-পুরুষের সংযোগেই ইহা উৎপন্ন; ইহার উৎপত্তির অদৃষ্ট ধর্মাধর্মাদি অন্য কারণ নাই । ৮

এই লোকায়তিক মত আশ্রয়পূর্বক পারলৌকিক-সাধনচ্যুত ক্রুরকর্মা, অনিষ্টকারী ও অল্পবুদ্ধি আসুরপ্রকৃতি ব্যক্তিগণ জগতের বিনাশের জন্য জন্মগ্রহণ করে । ৯

তাহাদের হৃদয় দুষ্পূরণীয় বাসনায় পূর্ণ । দম্ভ, অভিমান ও মদযুক্ত হইয়া অবিবেকবশতঃ অশুভনিচয় গ্রহণপূর্বক সেই অশুদ্ধব্রত ব্যক্তিগণ দুরদৃষ্ট-উৎপাদক কর্মে প্রবৃত্ত হয় । ১০

কামভোগই জীবনের পরম পুরুষার্থ - এইরূপ নিশ্চয়পূর্বক মৃত্যুকাল পর্যন্ত স্বীয় যোগক্ষেমবিষয়ে অপরিমেয় চিন্তার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া অসংখ্য আশাপাশে আবদ্ধ এবং কাম ও ক্রোধের অধীন হইয়া তাহারা বিষয়ভোগের জন্য পরস্বাপহরণাদিরূপ অসদুপায়ে অর্থসংগ্রহের চেষ্টা করে । ১১-১২

'আজ আমার ইহা লাভ হইল', ভবিষ্যতে আমার এই মনোরথ পূর্ণ হইবে', 'এই ধন আমার আছে', 'ভবিষ্যতে এই ধনও লাভ হইবে' । ১৩

'এই দুর্জয় শত্রু আমি নাশ করিয়াছি', 'অন্য তুচ্ছ শত্রুসকলও নাশ করিব', 'আমি সকলের নিগ্রহে সমর্থ', 'আমি ভোগী', 'আমি পুরুষার্থসম্পন্ন, বলবান্‌ ও সুখী' । ১৪

'আমি ধনী ও উচ্চবংশজাত কুলীন', 'আমার সমান আর কে আছে', 'আমি যজ্ঞ করিব, দান করিব, আনন্দ করিব' - এইরূপে অসুরস্বভাব ব্যক্তিগণ অবিবেকমুগ্ধ হয় এবং বহু সংকল্পে বিক্ষিপ্তচিত্ত, মোহজালে জড়িত ও বিষয়ভোগে আসক্ত হইয়া বিন্মুত্রাদিময় রৌরবাদি নরকে পতিত হয় । ১৫-১৬

তাহারা আত্মশ্লাঘাবিশিষ্ট এবং ধননিমিত্ত মান ও স্ফীত হইয়া দম্ভের সহিত শাস্ত্রবিধি লঙ্ঘনপূর্বক নামমাত্র (বিহিত অঙ্গ ও ইতিকর্তব্যত্যশূন্য) যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে । ১৭

তাহারা সন্মার্গবর্তীদের গুণে দোষাবিষ্কার করে এবং তাঁহাদের অনুকরণ না করিয়া অহঙ্কার, পরপীড়াদায়ক বল, ধর্মলঙ্ঘনের হেতু দর্প, স্ত্রী প্রভৃতি বিষয়ে কাম ও ক্রোধ সম্যক্‌-রূপে আশ্রয়পূর্বক স্বীয় দেহে ও অপর দেহে (বুদ্ধি ও কর্মের সাক্ষিরূপে) অবস্থিত আমাকে (ঈশ্বরকে) দ্বেষ করে (শ্রুতি ও স্মৃতিরূপ আমার শাসন অতিক্রম করে) । ১৮

ধর্মাধর্মফল-প্রদাতা আমি সন্মার্গ-দ্বেষপরায়ণ, ক্রূর, অশুভকারী নিকৃষ্ট নরগণকে অধর্মদোষবশতঃ এই নরকরূপ সংসারপথে আসুর যোনিতে পুনঃপুনঃ নিক্ষেপ করি । ১৯

হে অর্জুন, মূঢ়গণ জন্মে জন্মে আসুর জন্ম প্রাপ্ত হয় এবং আমাকে লাভ করা দূরে থাকুক, সন্মার্গ ও ঊর্ধ্বগতি প্রাপ্ত না হইয়া পূর্বজন্মাপেক্ষা আরও নীচযোনি লাভ করে । ২০

[সমস্ত আসুরী সম্পদ্‌ যে তিনটির অন্তর্ভুক্ত, যাহাদের ত্যাগে সমস্ত আসুরী সম্পদ্‌ ত্যাগ হয়, সেই তিনটি বলা হইতেছে ।]

কাম, ক্রোধ এবং লোভ - এই তিনটি নরকের দ্বারস্বরূপ । ইহারা জীবের অধোগতিদায়ক । এই সকল দ্বারে প্রবেশ করিলে মানুষ পুরুষার্থের অযোগ্য হয় । অতএব এই তিনটি বিষবৎ ত্যাগ করা উচিত । ২১

হে কৌন্তেয়, দুঃখমোহাত্মক ও শ্রেয়ঃপ্রবৃত্তির প্রতিবন্ধক এই তিনটি নরকদ্বার হইতে মুক্ত হইলে মানুষ ঈশ্বরারাধনাদিরূপ স্বীয় কল্যাণসাধনে সমর্থ হয় এবং সেই শ্রেয়ঃ অনুষ্ঠানবশতঃ ইহলোকের সুখভোগ ও মনুষ্যজন্মের সার্থকতারূপ শ্রেষ্ঠ গতি (মোক্ষ) লাভ করে । ২২

[এই সকল আসুরী সম্পদ্‌ পরিত্যাগপূর্বক শ্রেয়ঃ আচরণ করা শাস্ত্রনির্দেশ অনুসারেই সম্ভব, অন্যপ্রকারে নহে । অতএব] -

যে কর্তব্যাকর্তব্য-নির্ধারণের কারণ শাস্ত্রীয় বিধি ও নিষেধ উল্লঙ্ঘনপূর্বক স্বেচ্ছাচারী হইয়া বিহিতের আচরণ করে না, অথচ নিষিদ্ধের আচরণ করে, সে চিত্তশুদ্ধিরূপ পুরুষার্থলাভের যোগ্য হয় না । সে ইহলোকে সুখ, পরলোকে স্বর্গ বা মুক্তি লাভ করিতে পারে না । ২৩

অতএব কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার জ্ঞাপক (উপদেষ্টা); নিজের বা অন্যের কল্পনাদি নহে । অতএব শাস্ত্রীয় বিধি ও নিষেধের স্বরূপ জানিয়া ইহলোকে তোমার কর্ম করা উচিত, অর্থাৎ নিষিদ্ধ পরিত্যাগপূর্বক বিহিতানুষ্ঠান করা উচিত । ২৪

ভগবান্ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে দৈবাসুরসম্পদবিভাগযোগ নামক ষোড়শ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________
১) জ্ঞান : আচার্য ও শাস্ত্র হইতে ব্রহ্ম ও আত্মাদি বস্তুর অবগতিই জ্ঞান ।
যোগ : ইন্দ্রিয়সংযমাদি ও একাগ্রতা দ্বারা অবগত বস্তুর সাক্ষাৎকারের প্রচেষ্টাই যোগ ।
ব্যবস্থিতি : এই উভয়ে অবস্থিতি, নিষ্ঠা বা একাগ্রতা ।
 
অভয়, সত্ত্বসংশুদ্ধি ও জ্ঞানযোগব্যবস্থিতি - এই তিনটি প্রধান দৈবী সম্পদ ।
অভয় - শাস্ত্রোপদেশে সন্দেহরাহিত্য ও তদনুষ্ঠাননিষ্ঠত্ব । তত্ত্ববিচারের দ্বারা ভবভয় দূর করিবে ।
 
পঞ্চবিধ যজ্ঞ = দেব-, ঋষি-, ভূত-, নৃ- ও পিতৃযজ্ঞ ।
বাহ্য শৌচ = জল ও মৃত্তিকাদি দ্বারা শরীর ধৌত ও মার্জনা করা
আভ্যন্তর শৌচ = মন ও বুদ্ধির কলুষতার অভাব
 
৬) প্রজাপতির (ব্রহ্মার) অপত্য দুই প্রকার - দেবগণ ও অসুরগণ । শাস্ত্রজনিত জ্ঞান ও কর্ম দ্বারা প্রভাবিত ইন্দ্রিয়বর্গ দেব এবং স্বাভাবিক (অশাস্ত্রজনিত) এবং ঐহিক জ্ঞান ও কর্ম দ্বারা প্রভাবিত ইন্দ্রিয়বর্গ অসুর ।

১০) দম্ভ : অধার্মিক হইয়াও নিজের ধার্মিকত্বজ্ঞাপন ।
অভিমান : অপূজ্য হইয়াও নিজের পূজ্যত্বের অভিমান ।
মদযুক্ত : নিকৃষ্ট হইয়াও নিজেতে উৎকৃষ্টত্বের আরোপ; সুতরাং মহতের অবজ্ঞা ।
অশুভনিচয় গ্রহণ : অমূক মন্ত্রে বশীকরণ, উচাটন, মারণাদি সম্পাদনরূপ দুরাগ্রহ ।
অশুদ্ধব্রত : অমঙ্গলকর নরকাদিতে পতনের কারণ যাহাদের ব্রত, নিয়ম ।
 
২৪) শাস্ত্র : যাহার দ্বারা ধর্মাধর্ম ও মোক্ষ প্রভৃতি অজ্ঞাত পদার্থের জ্ঞান হয়, তাহাই শাস্ত্র । বেদ ও বেদমূলক স্মৃতি-ইতিহাস-পুরাণাদি শাস্ত্র ।

ইহলোক : মনুষ্যলোকই কর্মাধিকার-ভূমি । লোকান্তরে কর্মাধিকার নাই - [নীলকণ্ঠ]
_________________________________________

*Hard Copy Source:
"Srimadbhagabadgeeta" translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint - January, 1997 (1st Edition - 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation

Disclaimer:
This site is not officially related to Ramakrishna Mission & MathThis is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>