Showing posts with label Gita-13. Show all posts
Showing posts with label Gita-13. Show all posts

Thursday, March 12, 2015

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা : ত্রয়োদশ অধ্যায় - ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-বিভাগযোগ (13-Jagadishchandra)


|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
(গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ)*

অর্জুন কহিলেন -
হে কেশব, প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ এবং জ্ঞান ও জ্ঞেয় এইগুলি জানিতে আমি ইচ্ছা করি । (প্রক্ষিপ্ত ? শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য ও শ্রীধরস্বামী এই শ্লোকটি গ্রহণ করেন নাই ।)

শ্রীভগবান্‌ কহিলেন -

হে কৌন্তেয়, এই দেহকে ক্ষেত্র বলা হয় এবং যিনি এই ক্ষেত্রকে জানেন (অর্থাৎ ‘আমি’ ‘আমার’ এইরূপ মনে করেন) তিনিই ক্ষেত্রজ্ঞ (জীবাত্মা); ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞবেত্তা পণ্ডিতগণ এইরূপ বলিয়া থাকেন । ১

হে ভারত, সমুদয় ক্ষেত্রে আমাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিও; ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের যে জ্ঞান তাহাই প্রকৃত জ্ঞান, ইহাই আমার মত । অথবা ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞের যে জ্ঞান তাহাই আমার (পরমেশ্বরের) জ্ঞান, ইহাই সর্বসম্মত । ২

সেই ক্ষেত্র কি, উহা কি প্রকার, উহা কি প্রকার বিকার-বিশিষ্ট, ইহার মধ্যেও কি হইতে কি হয়, এবং সেই ক্ষেত্রজ্ঞ কে এবং তাহার প্রভাব কিরূপ, এইসকল তত্ত্ব সংক্ষেপে আমার নিকট শ্রবণ কর । ৩

ঋষিগণ কর্তৃক নানা ছন্দে পৃথক্‌ পৃথক্‌ নানা প্রকারে এই ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞ-তত্ত্ব ব্যাখ্যাত হইয়াছে । ব্রহ্মসূত্র-পদসমূহেও যুক্তিযুক্ত বিচারসহ নিঃসন্দিগ্ধরূপে এই বিষয় ব্যাখ্যাত হইয়াছে । ৪
 

ক্ষিতি আদি পঞ্চমহাভূত, অহঙ্কার, বুদ্ধি (মহত্তত্ত্ব), মূল প্রকৃতি, দশ ইন্দ্রিয়, মন এবং রূপরসাদি পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বিষয় (পঞ্চতন্মাত্র) এবং ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা ও ধৃতি এই সমুদয়কে সবিকার ক্ষেত্র বলে । ৫,৬

শ্লাঘা-রাহিত্য, দম্ভ-রাহিত্য, অহিংসা, ক্ষমা, সরলতা, গুরুসেবা, শৌচ, সৎকার্যে একনিষ্ঠা, আত্মসংযম, বিষয়-বৈরাগ্য, নিরহঙ্কারিতা, জন্ম-মৃত্যু-জরাব্যাধিতে দুঃখ দর্শন, বিষয়ে বা কর্মে অনাসক্তি, স্ত্রীপুত্রগৃহাদিতে মমত্ববোধের অভাব, ইষ্টানিষ্টলাভে সমচিত্ততা, আমাতে (ভগবান্‌ বাসুদেবে) অনন্যচিত্তে ঐকান্তিক ভক্তি, পবিত্র নির্জন স্থানে বাস, প্রাকৃত জনসমাজে বিরক্তি, সর্বতা অধ্যাত্মজ্ঞানের অনুশীলন (নিত্য আত্মজ্ঞাননিষ্ঠা), তত্ত্বজ্ঞানের প্রয়োজন আলোচনা - এই সকলকে জ্ঞান বলা হয়; ইহার বিপরীত যাহা তাহা অজ্ঞান । ৭-১১

যাহা জ্ঞাতব্য বস্তু, যাহা জ্ঞাত হইলে অমৃত অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করা যায়, তাহা বলিতেছি; তাহা আদ্যন্তহীন, আমার নির্বিশেষ স্বরূপ-ব্রহ্ম; তৎসন্বন্ধে বলা হয় যে, তিনি সৎও নহেন, অসৎও নহেন । ১২

সর্বদিকে তাঁহার হস্তপদ, সর্বদিকে তাঁহার চক্ষু, মস্তক ও মুখ, সর্বদিকে তাহার কর্ণঃ এইরূপে এই লোকে সমস্ত পদার্থ ব্যাপিয়া তিনি অবস্থিত আছেন । ১৩

তিনি চক্ষুরাদি সমুদয় ইন্দ্রিয় বৃত্তিতে প্রকাশমান অথচ সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিত, নিঃসঙ্গ অর্থাৎ সর্বসঙ্গশূন্য অথচ সকলের আধারস্বরূপ, নির্গুণ অথচ সত্ত্বাদি-গুণের ভোক্তা বা পালক । ১৪

সর্বভূতের অন্তরে এবং বাহিরেও তিনি; চল এবং অচলও তিনি; সূক্ষ্মতাবশতঃ তিনি অবিজ্ঞেয়; এবং তিনি দূরে থাকিয়াও নিকটে স্থিত । ১৫

তিনি (তত্ত্বতঃ বা স্বরূপতঃ) অপরিচ্ছিন্ন হইলেও সর্বভূতে ভিন্ন-ভিন্ন বলিয়া প্রতীত হন । তাঁহাকে ভূতসকলের পালনকর্তা, সংহর্তা ও সৃষ্টিকর্তা বলিয়া জানিবে । ১৬

তিনি জ্যোতিসকলেরও (সূর্যাদিরও) জ্যোতিঃ; তিনি তমের অর্থাৎ অবিদ্যারূপ অন্ধকারের অতীত, তিনি বুদ্ধিবৃত্তিতে প্রকাশমান জ্ঞান, তিনি জ্ঞেয় তত্ত্ব, তিনি জ্ঞানের দ্বারা লভ্য, তিনি সর্বভূতের হৃদয়ে অবস্থিত আছেন । ১৭

এই প্রকারে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় কাহাকে বলে সংক্ষেপে কথিত হইল । আমার ভক্ত ইহা জানিয়া আমার ভাব বা স্বরূপ বুঝিতে পারেন, বা আমার দিব্য প্রকৃতি প্রাপ্ত হন । ১৮

প্রকৃতি ও পুরুষ, উভয়কেই অনাদি বলিয়া জানিও । দেহেন্দ্রিয়াদি বিকারসমূহ এবং সুখ, দুঃখ, মোহাদি গুণসমূহ প্রকৃতি হইতেই উৎপন্ন হইয়াছে জানিবে । ১৯


শরীর ও ইন্দ্রিয়গণের কর্তৃত্ব বিষয়ে প্রকৃতিই কারণ, এবং সুখ, দুঃখ ভোগ বিষয়ে পুরুষই (ক্ষেত্রজ্ঞ) কারণ বলিয়া উক্ত হন । ২০

পুরুষ প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হইয়া প্রকৃতির গুণসমূহ ভোগ করেন এবং গুণসমূহের সংসর্গই পুরুষের সৎ ও অসৎ যোনিতে জন্মগ্রহণের কারণ হয় । ২১

এই দেহে যে পরম পুরুষ আছেন, তিনি উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর ও পরমাত্মা বলিয়া উক্ত হন । ২২
 

যিনি এই প্রকার পুরুষতত্ত্ব এবং বিকারাদি গুণ সহিত প্রকৃতিতত্ত্ব অবগত হন, তিনি যে অবস্থায় থাকুন না কেন, পুনরায় জন্মলাভ করেন না অর্থাৎ মুক্ত হন । ২৩

কেহ কেহ (স্বয়ং) আপনি আপনাতেই ধ্যানের দ্বারা আত্ম দর্শন করেন । কেহ-কেহ সাংখ্যযোগ দ্বারা এবং অন্য কেহ-কেহ কর্মযোগের দ্বারা আত্মাকে দর্শন করেন । ২৪

আবার অন্য কেহ-কেহ এইরূপ আপনা আপনি আত্মাকে না জানিয়া অন্যের নিকট শুনিয়া উপাসনা করেন । শ্রদ্ধাপূর্বক উপদেশ শ্রবণ করিয়া উপাসনা করতঃ তাঁহারাও মৃত্যুকে অতিক্রম করেন । ২৫


হে ভরতর্ষভ, স্থাবর, জঙ্গম যত কিছু পদার্থ উৎপন্ন হয়, তাহা সমস্তই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ হইতে হইয়া থাকে জানিবে । ২৬
 

যিনি সর্বভূতে সমভাবে অবস্থিত এবং সমস্ত বিনষ্ট হইলেও যিনি বিনষ্ট হন না, সেই পরমেশ্বরকে যিনি সম্যক দর্শন করিয়াছেন, তিনিই যথার্থদর্শী । ২৭

যিনি সর্বভূতে সমান ও সমভাবে অবস্থিত ঈশরকে দর্শন করেন, তিনি আত্মাদ্বারা আত্মাকে হনন করেন না এবং সেই হেতু তিনি পরম গতি প্রাপ্ত হন । ২৮

প্রকৃতিই সমস্ত প্রকারে সমস্ত কর্ম করেন এবং আত্মা অকর্তা, ইহা যিনি দর্শন করেন তিনিই যথার্থদর্শী । ২৯

যখন তত্ত্বদর্শী সাধক ভূতসমূহের পৃথক্‌ পৃথক্‌ ভাব বা নানাত্ব একস্থ অর্থাৎ এক ব্রহ্মবস্তুতেই অবস্থিত এবং সেই ব্রহ্ম হইতেই এই  নানাত্বের বিস্তার দর্শন করেন, তখন তিনি ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন । ৩০
 

হে কৌন্তেয়, অনাদি ও নির্গুণ বলিয়া এই পরমাত্মা অবিকারী; অতএব দেহে থাকিয়াও তিনি কিছুই করেন না এবং কর্মফলে লিপ্ত হন না । ৩১

যেমন আকাশ সর্ববস্তুতে অবস্থিত থাকিলেও অতি সূক্ষ্মতা হেতু কোন বস্তুতে লিপ্ত হয় না, সেরূপ আত্মা সর্বদেহে অবস্থিত থাকিলেও কিছুতেই লিপ্ত হন না । ৩২

হে ভারত, যেমন এক সূর্য সমস্ত জগৎকে প্রকাশিত করেন, সেরূপ এক ক্ষেত্রজ্ঞ (আত্মা) সমস্ত ক্ষেত্র বা দেহকে প্রকাশিত করেন । ৩৩

যাহারা জ্ঞানচক্ষুদ্বারা ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের প্রভেদ এবং ভূতপ্রকৃতি অর্থাৎ অবিদ্যা হইতে মোক্ষ কি প্রকার তাহা দর্শন করেন (জানিতে পারেন) তাহারা পরমপদ প্রাপ্ত হন । ৩৪
___________________________


২) আমি কেবল ক্ষেত্রজ্ঞ নহি, ক্ষেত্রও আমি । কারণ প্রকৃতির পরিণামই দেহ এবং সেই প্রকৃতি আমার বিভাব ও শক্তি [গী|৪|১০] ।

৪) ব্রহ্মসূত্র :
ব্রহ্মসূত্র বলিতে বেদান্ত দর্শন বুঝায় । বিভিন্ন ঋষিগণ বিভিন্ন উপনিষদে পৃথক্‌ পৃথক্‌ অধ্যাত্মতত্ত্বের আলোচনা করিয়াছেন । যুক্তিযুক্ত বিচার বিতর্ক দ্বারা ঐ সকল বিভিন্ন মতের সমন্বয় ও সামঞ্জস্য বিধান করিয়া বেদান্ত দর্শন রচিত হইয়াছে । এই শ্লোকে তাহাই বলা হইল । ঋষিগণ বিভিন্ন উপনিষদে পৃথক্‌ ভাবে যাহা আলোচনা করিয়াছেন, ব্রহ্মসূত্র তাহাই কার্যকারণহেতু দেখাইয়া নিঃসন্দিগ্ধরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছে । এই হেতু উহার অপর নাম উত্তর মীমাংসা এবং উহাতে ক্ষেত্রজ্ঞের বিচার আছে বলিয়া উহাকে শারীরক সূত্রও বলে (শরীর=ক্ষেত্র) । ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তদর্শন গীতার পরে রচিত হইয়াছে মনে করিয়া কেহ কেহ ‘ব্রহ্মসূত্র’ পদে ব্রহ্মপ্রতিপাদক সূত্র অর্থাৎ উপনিষদাদি এইরূপ অর্থ করেন । কিন্তু লোকমান্য তিলক প্রভৃতি আধুনিক পণ্ডিতগণের মত এই যে বর্তমান মহাভারত, গীতা এবং বেদান্তদর্শন বা ব্রহ্মসূত্র এই তিনই বাদরায়ণ ব্যাসদেবেরই প্রণীত । এই হেতু ব্রহ্মসুত্রকে ব্যাসসূত্রও বলে ।

৬) ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ : আমি সুখী, আমি দুঃখী, 'আমার দেহ', 'আমার গৃহ' - এই আমি কে ?
এই 'আমি' দেহ নহে, হস্তপদাদি-ইন্দ্রিয় নহে, মনও নহে, বুদ্ধিও নহে; 'আমি' এ-সকলের অতীত কোনো বস্তু, যাহার নাম জীব ও জীবাত্মা । কৃষক যেমন ক্ষেত্র হইতে ফল উৎপন্ন করিয়া ভোগ করে, জীবও তদ্রূপ এই দেহ অবলম্বন করিয়া প্রাক্তন-কর্মজনিত সুখ-দুঃখাদি ভোগ করেন, এই জন্য এই দেহের নাম ক্ষেত্র । আবার ক্ষেত্রস্বামী যেমন জানেন যে, ইহা আমার ক্ষেত্র, সুতরাং আমি মালিক, আমিই ভোক্তা, এইরূপ অভিমান করেন, সেইরূপ জীবও এই দেহ আমারই ভোগভূমি বলিয়া জানেন এবং আমার দেহ, আমার মন ইত্যাদি রূপ অভিমান করেন । এই হেতু জীবকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলা হয় । সুতরাং বেদান্তমতে দেহ ও আত্মার যে তত্ত্ব বা বিচার তাহারই নাম ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিচার । ইহাই সাংখ্যমতে প্রকৃতি-পুরুষ বিচার । [বিশদ]

সাংখ্যের ২৪ তত্ত্ব ব্যতীত ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, সংঘাত, চেতনা, ধৃতি - এই কয়েকটি অতিরিক্ত তত্ত্বের এ-স্থলে উল্লেখ করা হইয়াছে । ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ - মনেরই গুণ, সুতরাং মনেই উহাদের সমাবেশ হয় ।
চেতনা : জীবদেহে প্রাণের ক্রিয়া বা চেষ্টা-চাঞ্চল্য । চেতনা ও চৈতন্য এক কথা নহে । সুষুপ্তি-অবস্থায় চেতনা অর্থাৎ প্রাণের ক্রিয়া থাকে কিন্তু চৈতন্য বা আমি-জ্ঞান থাকে না । এই চেতনা নামক ক্রিয়া জড় দেহেরই গুণ, আত্মার নহে, এই জন্য ইহাকে ক্ষেত্রের মধ্যেই সমাবেশ করা হয় ।
ধৃতি : মন, প্রান ইত্যাদির ক্রিয়া শরীরের মধ্যে যে শক্তির দ্বারা স্থির থাকে । ইহাও জড়দেহেরই গুণ ।
সংঘাত = সমুচ্চয় বা সংহতি; জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়, উভয়েন্দ্রিয়, মন, প্রাণ ইত্যাদি শারীরিক ও মানসিক সমস্ত তত্ত্বের যে  সংহতি বা সমুচ্চয়, দার্শনিক ভাষায় তাহারই নাম সংঘাত বা শরীর । ক্ষেত্রের মধ্যেই উহার সমাবেশ করা হইয়াছে ।

১১) জ্ঞানীর ২০টি লক্ষণ : 'যাহা পিণ্ডে তাহা ব্রহ্মাণ্ডে' অর্থাৎ এই নশ্বর দেহেন্দ্রিয়াদির অতিরিক্ত যে অবিনশ্বর আত্মতত্ত্ব এবং নামরূপাত্মক নশ্বর ব্যক্ত জগতে অভিব্যাপ্ত যে অবিনশ্বর ব্রহ্মতত্ত্ব - এই উভয়ই এক; জীব, প্রকৃতি বা মায়ামুক্ত হইলেই এই একত্ব-জ্ঞান লাভ করে, উহাই প্রকৃত জ্ঞান । ইহাই আত্মজ্ঞান, ব্রহ্মাত্মৈক্যজ্ঞান, দেহাত্মবিবেক, পুরুষ-প্রকৃতি-বিবেক, ব্রাহ্মী-স্থিতি, কৈবল্য মুক্তি ইত্যাদি নানা কথায় ব্যক্ত করা হয় । বেদান্তী ও ব্রহ্মজ্ঞানী এক কথা নহে । যিনি এই জ্ঞান লাভ করেন, তাঁহার সর্বত্র সাম্যবুদ্ধি জন্মে, তাঁহার সর্বসময়ে শুদ্ধ বুদ্ধি, শুদ্ধ বাসনা ও শুদ্ধ আচরণ পরিদৃষ্ট হয় এবং তাঁহার অমানিত্ব, অদম্ভিত্ব প্রভৃতি গুণের উদ্রেক হয় ।

১৫) এই শ্লোকটি সম্পূর্ণ শেতাশ্বেতর উপনিষৎ [৩|১৬] হইতে আসিয়াছে ।

১৯) সাংখ্যমতে পুরুষ ও প্রকৃতি উভয়ই অনাদি এবং স্বতন্ত্র মূলতত্ত্ব; কিন্তু বেদান্তী বলেন, প্রকৃতি স্বতন্ত্র নহে, উহা পরমেশ্বর হইতেই উৎপন্ন, পরমেশ্বরেরই শক্তি এবং এই হেতুই অনাদি । গীতায় ইহাদিগকেই অপরা ও পরা প্রকৃতি বলা হইয়াছে ।

২১) পুরুষের সংসারিত্বের কারণ :
পুরুষ-প্রকৃতির সংসর্গবশত প্রকৃতির গুণ অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ, তমোগুণের ধর্ম সুখ-দুঃখ-মোহাদিতে আবদ্ধ হইয়া পড়েন এবং আমি সুখী, আমি দুঃখী, আমি কর্তা, আমার কর্ম ইত্যাদি অভিমান করিয়া কর্মপাশে আবদ্ধ হন । এই সকল কর্মের ফলভোগের জন্য তাঁহাকে পুনঃপুনঃ সদসদ্‌-যোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয় । সত্ত্বগুণের প্রাবল্যে দেব-যোনিতে, রজোগুণের উৎকর্ষে মনুষ্য-যোনিতে এবং তমোগুণের আধিক্যে পশ্বাদি-যোনিতে তাঁহার জন্ম হয় ।

যিনি পুরুষকে প্রকৃতি হইতে পৃথক বলিয়া জানেন, যিনি জানেন যে পুরুষ অকর্তা, উদাসীন, উপদ্রষ্টা মাত্র - তিনিই জ্ঞানী, তিনিই এই জন্মকর্মের বন্ধন হইতে মুক্ত ।

২২) উপদ্রষ্টা = সমীপে থাকিয়া যিনি দেখেন অথচ নিজে ব্যাপৃত হন না;
ভর্তা : ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতি জড় হইলেও চৈতন্যময় পুরুষের চৈতন্যাভাসে উদ্ভাসিত হইয়া থাকে । ইহাকেই পুরুষের ভরণ বলা হইয়াছে এবং এই হেতুই পুরুষকে ভর্তা বলা হয় ।
ভোক্তা : যিনি স্বরূপত নির্বিকার ও নির্লিপ্ত হইলেও সুখ-দুঃখাদি যেন উপলব্ধি করেন অর্থাৎ নিত্য চৈতন্যময় বলিয়া সুখ-দুঃখাদি বৃত্তিকেও চৈতন্যগ্রস্ত করিয়া প্রকাশ করেন, তাই তিনি ভোক্তা ।

সাংখ্য দর্শন যাহাকে স্বতন্ত্র মূলতত্ত্ব পুরুষ বলেন, তাহাকেই এস্থলে পরমপুরুষ পরমাত্মা বলা হইতেছে । সুতরাং এস্থলে সাংখ্য ও বেদান্তের সমন্বয় হইয়া গেল ।

২৩) প্রকৃতি-পুরুষ বিবেক :
এই জ্ঞেয় বস্তুই ক্ষেত্রজ্ঞ, পরমাত্মা বা পরব্রহ্ম এবং প্রকৃতি-সম্ভূত দেহেন্দ্রিয়াদিই ক্ষেত্র । বেদান্তে যাহা ক্ষেত্র বা ক্ষেত্রজ্ঞ, সাংখ্য-শাস্ত্রের পরিভাষায় তাহাই প্রকৃতি ও পুরুষ এবং ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ-জ্ঞানই সাংখ্যের পুরুষ-প্রকৃতি-বিবেক । এই প্রকৃতি-পুরুষের বিবেকজ্ঞান অর্থাৎ পার্থক্য-জ্ঞানেই কৈবল্য মুক্তি - যাঁহার এই জ্ঞান হইয়াছে, তাঁহার পক্ষে ধর্ম-কর্ম, বিধি-নিষেধ কিছু নাই; অনাসক্তভাবে কর্ম করিলেও তাঁহার কর্মবন্ধন নাই, কেননা তিনি ত্রিগুণাতীত মুক্তপুরুষ । প্রকৃতিই মায়া, উহাই সংসারের কারণ; সুতরাং তিনি মায়ামুক্ত, তাঁহার সংসারের ক্ষয় হইয়াছে ।

২৪) আত্মকারা : মন যখন নির্বিষয় হয়, তখন আর উহা মন থাকে না, আত্মকারাকারিত হয় । এই অবস্থায় আত্মদর্শন হয়; 'আপনি আপনাতে আত্মদর্শন করেন' [লোকমান্য তিলক] ।

২৫) ধ্যান, জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি - গীতা এই চারটি বিভিন্ন মার্গের উল্লেখ করিয়াছেন এবং ইহার যে কোন মার্গে সাধন আরম্ভ হউক না কেন, শেষে পরমেশ্বর প্রাপ্তি বা মোক্ষ লাভ হয়ই, ইহাই গীতার উদার মত । গীতোক্ত যোগ বলিতে ইহার ঠিক কোন একটা বুঝায় না । গীতা এই চারিটি মার্গের সমন্বয় করিয়া অপূর্ব যোগধর্ম শিক্ষা দিয়াছেন । সেই যোগ কি তাহা পূর্বে নানা স্থানে প্রদর্শিত হইয়াছে । 

২৬) বেদান্ত মতে এ সংযোগকে অধ্যাস, ঈক্ষণ ইত্যাদি বলা হয় । এই অধ্যাসের ফলে ক্ষেত্রজ্ঞের ধর্ম ক্ষেত্রে আরোপিত হয় এবং ক্ষেত্রের ধর্ম ক্ষেত্রজ্ঞে আরোপিত হয় ।

২৭) ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ বা প্রকৃতি ও পুরুষের সংযোগে সৃষ্টি, একথা পূর্বে বলা হইয়াছে । এই সংযোগের মধ্যে যিনি বিয়োগ দর্শন করেন অর্থাৎ প্রকৃতি হইতে পুরুষের, বা দেহ হইতে আত্মার পার্থক্য দর্শন করেন, এবং সেই এক বস্তুই সর্বত্র সমভাবে বিদ্যমান ইহা অনুভব করেন, তিনিই মুক্ত । এই শ্লোক এবং পরবর্তী কয়েকটি শ্লোকে এই তত্ত্বই বিবৃত হইয়াছে ।

২৮) আত্মঘাতী : এই দুর্লভ মানব-জন্ম লাভ করিয়াও যে আত্মার উদ্ধারের চেষ্টা করে না সে আত্মঘাতী । অথবা যিনি জানেন যে, পরহিংসা ও আত্মহিংসা একই কথা, তিনি 'আত্মার দ্বারা আত্মাকে হনন করেন না' । স্বামী বিবেকানন্দ দ্বিতীয় অর্থই গ্রহণ করিয়াছেন ।

৩০) জগতের নানাত্বের মধ্যে যিনি একমাত্র ব্রহ্মসত্ত্বাই অনুভব করেন, এবং সেই এক ব্রহ্ম হইতেই এই নানাত্বের অভিব্যক্তি ইহা যখন সাধক বুঝিতে পারেন, তখনই তাঁহার ব্রহ্মভাব লাভ হয় । 

৩২) যেমন আকাশ সর্বব্যাপী হইয়াও সুগন্ধ, দুর্গন্ধ, সলিল, পঙ্কাদির দোষ-গুণে লিপ্ত হয় না, সেইরূপ আত্মা সর্বদেহে অবস্থিত থাকিলেও দৈহিক দোষগুণে লিপ্ত হন না । 

৩৩) সূর্যের সহিত উপমার তাৎপর্য এই যে, যেমন এক সূর্য সকলের প্রকাশক অথচ নির্লিপ্ত, আত্মাও সেইরূপ । 
___________________________
Online Source: 
http://geetabangla.blogspot.com/2013/07/blog-post_27.html

*Hard Copy Source:
"Sri Gita" or "Srimadbhagabadgeeta" by Gitashastri Jagadish Chandra Ghosh & Anil Chandra Ghosh. 26th Edition - June 1997 (1st Edition, 1925 from Dhaka now in Bangladesh). Published by Subhadra Dey (Ghosh), Presidency Library, 15 Bankim Chatterjee Street, Kolkata-700073. Printed by Web Impressions Pvt.Ltd., 34/2 Beadon Street, Kolkata-700006.



Disclaimer: This site is not officially related to Presidency LibraryKolkataThis is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

Thursday, August 14, 2014

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : ত্রয়োদশ অধ্যায় – ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ (Gita : Chapter 13)

|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
 (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)*
 
অর্জুন কহিলেন -
হে কেশব, প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান ও জ্ঞেয় - এই সকল আমি জানিতে ইচ্ছা করি । ১

[ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞরূপ প্রকৃতিদ্বয় দ্বারা ঈশ্বর জগতের উৎপত্তি, স্থিতি ও প্রলয় করেন - ইহা সপ্তম অধ্যায়ে সূচিত হইয়াছে । এই প্রকৃতিদ্বয়-নিরূপণ দ্বারা তদ্বিশিষ্ট ঈশ্বরের স্বরূপ নির্ধারণের জন্য এই অধ্যায় আরম্ভ হইতেছে । যে তত্ত্বজ্ঞানযুক্ত হইয়া ধর্মাচরণ দ্বারা শ্রীভগবানের প্রিয় হওয়া সম্ভব, সেই তত্ত্বজ্ঞান নির্ণয়ের জন্য বর্তমান অধ্যায়ের প্রারম্ভ ।]

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
হে অর্জুন, এই ভোগায়তন শরীররূপী (প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের দ্বারা উপলভ্যমান) দৃশ্যটিকে ক্ষেত্র বলা হয় । যিনি এই শরীরকে জানেন অর্থাৎ স্বাভাবিক বা ঔপদেশিক জ্ঞানের বিষয় করেন, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞবিদ্‌গণ তাঁহাকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলেন । ২

হে অর্জুন, সকল ক্ষেত্রের দ্রষ্টা ক্ষেত্রজ্ঞ এক । ক্ষেত্রজ্ঞ ক্ষেত্র হইতে পৃথক । আমাকে সেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিবে । ব্রহ্মাদি-স্থাবরান্ত সর্বদেহই প্রকৃতির পরিণাম । এক ক্ষেত্রজ্ঞ দেহাদি উপাধি দ্বারা প্রবিভক্তের ন্যায় প্রতীয়মান হন । তাঁহাকে সর্বোপাধিবিবর্জিত, সদসদাদি সমস্ত শব্দ ও প্রত্যয়ের অগোচর 'আমি' বলিয়া জানিবে । কারণ ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের এই প্রকার জ্ঞানই আমার মতে প্রকৃত জ্ঞান । ৩

সেই ক্ষেত্র যাহা ও যে প্রকার, যাদৃশ ধর্মযুক্ত, যেরূপ বিকারযুক্ত, যাহা হইতে যেভাবে উৎপন্ন হয় এবং সেই ক্ষেত্রজ্ঞ স্বরূপতঃ যাহা ও যেরূপ উপাধিকৃত শক্তিশালী তাহা সংক্ষেপে আমার নিকট শ্রবণ কর । ৪

এই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের যাথাত্ম্য বশিষ্ঠাদি ঋষিগণ বহু প্রকারে বর্ণনা করিয়াছেন । ঋগাদি বেদচতুষ্টয়ের নানা শাখাতেও এই তত্ত্ব বিবিধ ছন্দের দ্বারা বিভিন্নভাবে গীত হইয়াছে এবং যুক্তিযুক্ত ও ব্রহ্মস্বরূপ-প্রতিপাদক বেদবাক্যসমূহ দ্বারা এই তত্ত্ব অসন্দিগ্ধভাবে নির্ণীত হইয়াছে । ৫

পঞ্চ সূক্ষ্ম মহাভূত, মহাভূতের কারণ অহঙ্কার, অহঙ্কারের কারণ বুদ্ধি, বুদ্ধির কারণ মূলা প্রকৃতি (অব্যাকৃত ব্রহ্মশক্তি), দশ ইন্দ্রিয় ও মন, ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ বিষয় স্থূল পঞ্চভূত এবং ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, দেহ-সংঘাত ও দেহ-সংঘাতে অভিব্যক্ত চেতনা ও ধৃতি (তপ্ত লৌহপিণ্ডে প্রকাশিত অগ্নির ন্যায় দেহেন্দ্রিয়াদিসংঘাতে অভিব্যক্ত আত্মচৈতন্যের আভাস দ্বারা ব্যাপ্ত অন্তঃকরণ-বৃত্তি) - এই সকল বিকারযুক্ত ক্ষেত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হইল । ৬-৭

[শ্রীভগবান্‌ এখন জ্ঞেয় শুদ্ধ ক্ষেত্রজ্ঞের লক্ষণ বলিবেন ।]

উৎকর্ষ সত্ত্বেও আত্মশ্লাঘারাহিত্য, দম্ভশূন্যতা, প্রাণিপীড়নে অনিচ্ছা, ক্ষমা, সরলতা, গুরুসেবা, বহিরন্তঃশৌচ, মোক্ষমার্গে স্থিরতা, স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া সন্মার্গে পরিচালনা, ইন্দ্রিয়ভোগ্য বস্তুতে বিরক্তি, অভিমানশূন্যতা; জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধিরূপ দুঃখে পুনঃপুনঃ দোষদর্শন, বিষয়ে অনাসক্তি, স্ত্রী, পুত্র ও গৃহাদিতে মমত্বাভাব, শুভাশুভপ্রাপ্তিতে সদা চিত্তের সাম্যভাব, ভগবান্‌ই একমাত্র গতি - এই নিশ্চিত বুদ্ধির দ্বারা আমাতে অচলা ভক্তি, নির্জন বাস, প্রাকৃত জনের সংসর্গত্যাগ, আত্মানাত্মবিবেক, জ্ঞানে নিষ্ঠা ও তত্ত্বজ্ঞানার্থদর্শন - এইগুলি আত্মজ্ঞানের সাধন বলিয়া কথিত হয় । ইহার বিপরীত মানিত্ব ও দাম্ভিকতাদি অজ্ঞান বলিয়া জ্ঞেয় এবং সংসারপ্রবৃত্তির কারণ বলিয়া পরিহার্য । ৮-১২

হে অর্জুন, যাহা জ্ঞাতব্য, যাহা জানিয়া অমৃতত্ব (মোক্ষ) লাভ হয়, তাহা তোমাকে বলিব । তিনি আদিহীন পরব্রহ্ম । তিনি সৎশব্দ ও সৎপ্রত্যয়ের অগোচর এবং অসৎশব্দ ও অসৎ প্রত্যয়েরও অগোচর । কারণ ইন্দ্রিয়গোচর বস্তুই সৎ বা অসৎ শব্দ প্রত্যয়ের গোচর হয়; কিন্তু ব্রহ্ম ইন্দ্রিয়াতীত । ১৩

তিনি (পরব্রহ্ম) সমগ্র বিশ্বকে ব্যাপ্ত করিয়া বিরাজিত আছেন । সকল শরীরের হস্ত ও পদ, চক্ষু ও কর্ণ, মস্তক ও মুখ তাঁহার হস্ত ও পদ, চক্ষু ও কর্ণ এবং মস্তক ও মুখ । ১৪

সমস্ত অন্তরিন্দ্রিয়ের ও বহিরিন্দ্রিয়ের কার্যসমূহের দ্বারা তিনি অবভাসিত (প্রকাশিত) হন । তিনি ইন্দ্রিয়কার্যে লিপ্ত আছেন এইরূপ প্রতীত হইলেও বস্তুতঃ তিনি কোন ইন্দ্রিয়ব্যাপারে ব্যাপৃত নহেন । কারণ তিনি সকল ইন্দ্রিয়বিহীন । তিনি সমস্ত সংশ্লেষরহিত । তথাপি মরুভূমি যেমন, মৃগতৃষ্ণিকার আস্পদ, সেইরূপ তিনি সর্বভূতের আশ্রয় । তিনি ত্রিগুণরহিত, অথচ তিনি মায়া দ্বারা ত্রিগুণের পরিণাম সুখ, দুঃখ ও মোহের উপলব্ধা । ১৫ 

তিনি চরাচর সর্বভূতের অন্তরে ও বাহিরে এবং স্থাবর ও জঙ্গম দেহসমূহে বিরাজিত । [তিনি এই সমস্তের অধিষ্ঠান, এই সমস্ত তাঁহাতে কল্পিত ।] অতি সূক্ষ বলিয়া তিনি অবিজ্ঞেয় । তিনি অ-জ্ঞানীর অজ্ঞাত বলিয়া অতিদূরে এবং আত্ম-স্বরূপে জ্ঞাত বলিয়া জ্ঞানীর অতি নিকটে । ১৬

ব্রহ্ম অপরিচ্ছিন্ন হইয়াও সর্বভূতে বিভক্তরূপে প্রতীত হন । রজ্জু যেরূপ কল্পিত সর্পাদির সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কারণ, সেইরূপ তিনি সর্বভূতের পালক, সংহারক ও স্রষ্টা । ১৭

[ব্রহ্ম সদা সর্বত্র বিদ্যমান থাকিলেও অনুপলব্ধিবশতঃ কেহ কেহ তাঁহার তমঃস্বভাবতা আশঙ্কা করেন । সেই আশঙ্কা দূরীকরণার্থ শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন - ]

ব্রহ্ম আদিত্যাদি জ্যোতিসমূহেরও জ্যোতিঃ এবং অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের দ্বারা অসংস্পৃষ্ট । জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞানগম্যরূপে তিনি সকলের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছেন । ১৮

এইরূপে ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় সংক্ষেপে বলা হইল । আমার ভক্ত ক্ষেত্র, জ্ঞান এবং জ্ঞেয়ের যথার্থ তত্ত্ব অবগত হইয়া ব্রহ্মভাবলাভে সমর্থ হন । ১৯

প্রকৃতি ও পুরুষ উভয়কেই অনাদি বলিয়া জানিবে । বুদ্ধাদি দেহেন্দ্রিয় পর্যন্ত বিকারসমূহ এবং সুখ-দুঃখ ও মোহাত্মক গুণসমূহ ত্রিগুণাত্মক প্রকৃতি হইতেই উৎপন্ন বলিয়া জানিবে । ২০

প্রকৃতি কার্য এবং করণের উৎপত্তির কারণ এবং পুরুষ (জীব) সুখ ও দুঃখসমূহের উপলব্ধির কারণ বলিয়া কথিত হন । ২১

পুরুষ (ভোক্তা, ক্ষেত্রজ্ঞ) প্রকৃতিতে অবস্থিত হইয়া সুখ-দুঃখ-কার্য-করণরূপে পরিণত ও মোহাকারে অভিব্যক্ত প্রকৃতির গুণসমূহ ভোগ করেন । এই সকল গুণেতে আত্মভাবই পুরুষের দেবাদি সৎ জন্ম ও পশ্বাদি অসৎ জন্ম ও সদসদ্‌যোনিরূপ মনুষ্য-জন্ম-গ্রহণের প্রধান কারণ । ২২

[বর্তমান অধ্যায়োক্ত ক্ষেত্রজ্ঞ ও ঈশ্বরের একত্বজ্ঞান মোক্ষের হেতু । তাহা সাক্ষাৎ নির্দেশের জন্য পরবর্তী শ্লোক ।]

যিনি দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি প্রভৃতির সাক্ষী বলিয়া এবং অনুমোদনকর্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর, পরমাত্মরূপেতে শ্রুতিতে উক্ত হন, সেই পুরুষোত্তমই এই দেহে বর্তমান আছেন, অর্থাৎ উপলব্ধ হন । ২৩

যিনি পুরুষকে (ব্রহ্মকে) সাক্ষাৎ আত্মভাবে জানেন ও সকল বিকারের সহিত অবিদ্যারূপ প্রকৃতিকে মিথ্যা বলিয়া জানেন, যে কোন অবস্থায় বিদ্যমান হইয়াও তিনি পুনর্বার জন্মগ্রহণ করেন না । ২৪

কেহ কেহ ধ্যানের দ্বারা শুদ্ধ অন্তঃকরণ সহায়ে বুদ্ধিতে সাক্ষীভূত প্রত্যক্‌চৈতন্যকে দর্শন করেন । অন্য কেহ কেহ জ্ঞানযোগ দ্বারা এবং অপর কেহ কেহ কর্মযোগ দ্বারা আত্মদর্শন করেন । ২৫

অপর কেহ কেহ এইরূপে আত্মাকে জানিতে না পারিয়া আচার্যের নিকট উপদেশ গ্রহণপূর্বক উপাসনা করেন । তাঁহারাও গুরুদত্ত উপদেশ নিষ্ঠার সহিত সাধন করিয়া এই মৃত্যুময় সংসার অতিক্রম করেন । ২৬

হে অর্জুন, যাহা কিছু স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ উৎপন্ন হয়, সেই সকলই ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগে উৎপন্ন হয়, জানিবে । ২৭

যিনি বিনাশশীল, সর্বভূতে নির্বিশেষভাবে অবস্থিত অবিনাশী পরমাত্মাকে দর্শন করেন, তিনিই সম্যগ্‌দর্শী । ২৮

সেই সমদর্শী সর্বত্র নির্বিশেষরূপে অবস্থিত পরমাত্মাকে দর্শন করেন বলিয়া নিজে নিজেকে হিংসা করেন না । সেই হেতু তিনি পরম গতি প্রাপ্ত হন । ২৯

কায়মনোবাক্য দ্বারা কৃত সকল কর্ম প্রকৃতি দ্বারাই সর্বপ্রকারে সম্পাদিত এবং আত্মাকে সর্বোপাধিবিবর্জিত বলিয়া যিনি দর্শন করেন, তিনিই সম্যগ্‌দর্শী । ৩০

যখন তিনি পৃথক্‌ পৃথক্‌ ভূতসমূহকে আত্মাতেই একত্র অবস্থিত দর্শন করেন এবং সেই আত্মা হইতেই ভূতসকলের বিকাশ উপলব্ধি করেন, তখন তিনি ব্রহ্মস্বরূপ হন । ৩১

হে কৌন্তেয়, এই পরমাত্মা অনাদি ও নির্গুণ বলিয়া অব্যয় । সেই হেতু তিনি শরীরসমূহে অবস্থিত হইলেও কোন কর্ম করেন না । সুতরাং কখনও কোন কর্মফলে লিপ্ত হন না । ৩২

যেমন সর্বব্যাপী আকাশ পঙ্কাদি সকল পদার্থে অবস্থিত হইয়াও অতি সূক্ষ্ম বলিয়া কোন বস্তুতে লিপ্ত হয় না, তদ্রূপ সকলপ্রকার দেহে থাকিয়াও আত্মা দৈহিক গুণ বা দোষে কখনো লিপ্ত হন না । ৩৩

হে ভারত, যেরূপ একমাত্র সূর্য সমগ্র জগৎকে আলোকিত করেন, সেইরূপ এক পরমাত্মা সমস্ত ক্ষেত্রকে প্রকাশিত করেন । কিন্তু তিনি কখনও প্রকাশ্য ক্ষেত্রের ধর্ম দ্বারা লিপ্ত হন না । ৩৪

যাঁহারা উক্ত প্রকারে ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের পরস্পর প্রভেদ জানেন এবং ভূতসমূহের অবিদ্যারূপ প্রকৃতির মিথ্যাত্ব জ্ঞানচক্ষুর দ্বারা জ্ঞাত হন, তাঁহারা পরব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন (ও পুনর্বার দেহধারণ করেন না) । ৩৫

ভগবান্ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ নামক ত্রয়োদশ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________

১) কোন কোন সংস্করণে এই শ্লোকটি নাই । শঙ্করাচার্যাদি অনেকে এইটি গ্রহণ করেন নাই; কিন্তু কেহ কেহ গ্রহণ করেছেন । গীতার শ্লোকসংখ্যা সাতশত পূর্ণ করিবার জন্য ইহা গ্রহণ করা হইল ।

২) দৃশ্য : প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের দ্বারা উপলভ্যমান দৃশ্য অর্থাৎ প্রকৃতি ও তাহার সকল পরিণাম ।

শরীর = পুরুষের ভোগ ও অপবর্গের জন্য ঈশ্বরের ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতির দেহেন্দ্রিয়-আকারে পরিণত সংঘাত এই শরীর স্থূল ও সুক্ষ্মরূপে দুই প্রকার । দর্শনেন্দ্রিয়, মনোবুদ্ধি ও পঞ্চপ্রাণের সমষ্টি সুক্ষ্মশরীর ।

স্বাভাবিক জ্ঞান : 'আমি মনুষ্য', 'আমার এই শরীর' ।
ঔপদেশিক জ্ঞান : ঘটাদির ন্যায় দৃশ্য বলিয়া স্থূল ও সুক্ষ্ম শরীর আত্মা নহে ।

ক্ষেত্র : দৃশ্য, অনাত্মা । যাহা অবিদ্যা দ্বারা আত্মাকে নাশ করে এবং বিদ্যা দ্বারা আত্মাকে রক্ষা করে ।
ক্ষেত্রজ্ঞ : দ্রষ্টা, আত্মা ।
অবিদ্যা = স্থূল ও সুক্ষ্ম শরীরে আত্মাভিমান
বিদ্যা = আত্মা হইতে শরীর পৃথক এই বিবেক -[ ভাষ্যোৎকর্ষদীপিকা]

৩) সম্যক্‌ জ্ঞান : দৃশ্য ক্ষেত্র আত্মাতে কল্পিত হন এবং যিনি ক্ষেত্রজ্ঞ তিনি পরমেশ্বর হইতে অভিন্ন প্রত্যগাত্মা - এই জ্ঞানই মুক্তির একমাত্র সাধন ।

৫) ব্রহ্মস্বরূপ-প্রতিপাদক বেদবাক্যসমূহ : ব্রহ্মবিষয়ে এই সকল বাক্যই প্রমাণ । - [ব্রহ্মসূত্র, ১|১|৩] । ব্রহ্মসূচক বাক্যসমূহ ব্রহ্মসূত্র দ্বারাই ব্রহ্ম পদ্যতে = জ্ঞাত হন । অতএব ব্রহ্মসূত্ররূপ পদ = ব্রহ্মসূত্রপদ ।

৬) পঞ্চ সূক্ষ মহাভূত : উৎপত্তিকালে সর্বপ্রথমে শব্দগুণবিশিষ্ট আকাশ উৎপন্ন হয়; আকাশ হইতে শব্দ ও স্পর্শগুণবিশিষ্ট বায়ু; বায়ু হইতে শব্দ, স্পর্শ ও রূপগুণবিশিষ্ট তেজ; তেজ হইতে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রসগুণবিশিষ্ট জল এবং জল হইতে শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধগুণবিশিষ্ট পৃথিবী উৎপন্ন হয় । ইহাদিগকে সূক্ষ পঞ্চভূত অথবা পঞ্চ তন্মাত্র বলে । ইহারা সূক্ষ বলিয়া ব্যবহারের অযোগ্য ।

পঞ্চ স্থূল ভূত : পরে অর্ধাংশ আকাশ ও অন্য চারি ভূতের প্রত্যেকের এক অষ্টমাংশ একত্রীভূত হইয়া স্থূল বা পঞ্চীকৃত আকাশ নামে অভিহিত হয় । এইরূপ বায়ুর অর্ধাংশ এবং অন্য চারি ভূতের এক অষ্টমাংশ মিলিত হইয়া স্থূল বা পঞ্চীভূত বায়ু হয় । এইরূপে অন্যান্য ভূতও পঞ্চীকৃত হয় । এই প্রকারে সূক্ষ পঞ্চভূত পঞ্চীকৃত বা স্থূল হইয়া ব্যবহারের যোগ্য হয় ।

৭) ইচ্ছাদ্বেষ ইত্যাদিকে বৈশেষিকগণ আত্মধর্ম বলেন । কিন্তু বেদান্তমতে ইহারা ক্ষেত্রধর্ম । ইচ্ছাদ্বেষাদি দ্বারা অন্তঃকরণের সমস্ত ধর্ম গৃহীত হইয়াছে ।

চেতনা : তপ্ত লৌহপিণ্ডে প্রকাশিত অগ্নির ন্যায় দেহেন্দ্রিয়াদিসংঘাতে অভিব্যক্ত আত্মচৈতন্যের আভাস দ্বারা ব্যাপ্ত অন্তঃকরণ-বৃত্তি ।

৮) বহিঃশৌচ = মৃত্তিকা ও জলাদি দ্বারা শরীরের মল অপনয়ন
অন্তঃশৌচ = ভাবশুদ্ধি দ্বারা মনের রাগাদি মল অপনয়ন

১২) তত্ত্বজ্ঞানার্থ দর্শন : ব্রহ্মের যাথাত্ম্য-জ্ঞান = অমানিত্বাদি পূর্ণানুষ্ঠান-পরিপাক-নিমিত্তক তত্ত্বজ্ঞান । তাহার অর্থ = প্রয়োজন = মোক্ষ; তাহার দর্শন = আলোচনা ।
 
১৫) ক্ষেত্র-উপাধিকৃত ধর্ম ক্ষেত্রজ্ঞে মিথ্যা আরোপিত হয় ।

১৬) তিনি এই সমস্তের অধিষ্ঠান; এই সমস্ত তাঁহাতে কল্পিত ।

১৮) জ্যোতিসমূহেরও জ্যোতিঃ : যাঁহার তেজ দ্বারা জ্যোতিষ্মান্‌ হইয়া সূর্য তাপ দেন ।
 
জ্ঞানগম্য = জ্ঞেয় ব্রহ্ম জ্ঞাত হইলে তাঁহাকে জ্ঞানগম্য বলা হয় ।
 
ব্রহ্মজ্ঞানলাভ অসম্ভব মনে করিয়া যাহারা অবসাদপ্রাপ্ত হইয়াছেন তাঁহাদিগকে বলা হইতেছে যে, জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং জ্ঞানগম্য সকলের হৃদয়ে রহিয়াছে । জ্ঞানের অসম্ভাবনা অকর্তব্য । শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, "একটি দেশলাইকাঠি জ্বালিলে ঘরের হাজার হাজার বছরের অন্ধকার মুহূর্তমধ্যে অন্তর্হিত হয় ।"
 
১৯) ভক্ত = যাহা দৃষ্ট, শ্রুত ও স্পৃষ্ট বা অন্য প্রকারে অনুভূত হয়, সবই সেই ব্রহ্ম - এই প্রকার বুদ্ধি যাঁহার, তিনিই ভক্ত, তিনিই জ্ঞানী ।

২০) অনাদি : ঈশ্বর অনাদি বলিয়া প্রকৃতিদ্বয়ও অনাদি । কারণ তিনি সর্বদাই এই প্রকৃতিদ্বয়ের সহিত সংযুক্ত আছেন ।
 
২১) কার্য = দেহ; করণ = দেহস্থ ত্রয়োদশ - যথা, দশ ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি ও প্রাণ ।

সংসার = কার্য ও করণ এবং সুখ ও দুঃখরূপে পরিণত ভোগ্যা প্রকৃতির সহিত ভোক্তা চেতন পুরুষের অবিদ্যাবশতঃ সংযোগই সংসার ।

২২) কার্য ও করণরূপে পরিণত প্রকৃতিতে আত্মবুদ্ধি করাই প্রকৃতিতে অবস্থিতি

২৩) সাক্ষী : শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির ব্যাপারে অব্যাপৃত এবং শরীরেন্দ্রিয়াদি হইতে স্বতন্ত্র ও সামীপ্যবশতঃ তাহাদের ব্যাপারে দ্রষ্ঠা ।

মহেশ্বর : সর্বাত্মক ও স্বতন্ত্র ।

পরমাত্মা : অবিদ্যা দ্বারা প্রত্যগাত্মরূপে কল্পিত দেহাদি হইতে বুদ্ধি পর্যন্ত সকল পদার্থের অন্তরাত্মা ।

২৪) যে কোন অবস্থায় : বিহিত ও নিষিদ্ধ কর্ম করিয়াও । - [আনন্দগিরি]

২৫) ধ্যান = তৈলধারার ন্যায় অবিচ্ছিন্ন ধ্যেয় বস্তুর প্রত্যয়-প্রবাহ

জ্ঞান : সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণ আমার দৃশ্য, আমি ইহাদের দ্রষ্টা (সাক্ষিস্বরূপ) এবং নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত-আত্মা - এই দৃঢ়নিশ্চয় ।
 
২৭) ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞের সংযোগ : রজ্জু, মরুভূমি ও শুক্তি প্রভৃতির বিবেকজ্ঞানের অভাববশতঃ যথাক্রমে সেই সকলে অধ্যারোপিত সর্প, মরীচিকা ও রজতাদির অধ্যাসের ন্যায় ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞের বিবেকজ্ঞানের অভাববশতঃ তাহাদের পরস্পর অধ্যাস ।
 
২৯) নিজে নিজেকে হিংসা : অজ্ঞ ব্যক্তির নিকট আত্মা অজ্ঞানাবৃত, তজ্জন্য অনাত্মা দেহকে আত্মরূপে গ্রহণপূর্বক দেহের মৃত্যুতে নিজের মৃত্যু কল্পনা করিয়া অজ্ঞ ব্যক্তি যেন পুনঃপুনঃ হত হন । অধিকন্তু পরমার্থ আত্মস্বরূপ অবিদ্যাচ্ছন্ন থাকায় আত্মা যেন সর্বদা হত হইয়াই আছেন । কারণ তিনি আত্মার বিদ্যমানতার ফল প্রাপ্ত হন না । - [ঈশ উপঃ, ৩]
 
৩১) আত্মা হইতেই ভূতসকলের বিকাশ : আত্মা হইতে প্রাণ, আত্মা হইতে আশা ইত্যাদি ।

ব্রহ্মবিৎ = ব্রহ্ম - [মুণ্ডক উপঃ, ৩|২|৯]

৩২) কোন কর্ম করেন না : ব্রহ্মবিদের ব্রহ্মাত্মভাব এত প্রবল হয় যে, তাঁহার দেহজ্ঞান প্রায়ই থাকে না । শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্তরঙ্গ শিষ্য স্বামী শিবানন্দ বলিতেন, "মনে হয় যেন আমার দেহধারণ হয় নাই, যেন সংসারে আসি নাই ।"

৩৫) যাঁহারা কথিত প্রকারে ক্ষেত্রের জড়রূপ এবং ক্ষেত্রজ্ঞের চৈতন্যরূপ পরস্পর বিলক্ষণতা, শাস্ত্র ও আচার্যের উপদেশজনিত জ্ঞানচক্ষু দ্বারা অবগত হন এবং পরমার্থ আত্মবিদ্যা দ্বারা মায়ানামক অবিদ্যারূপ (সর্বভূতের) প্রকৃতির মোক্ষ (অভাবগমন, মিথাত্ম) জানিতে পারেন তাঁহারা পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন ও পুনর্বার দেহ ধারণ করেন না । 
'পরস্পরবিলক্ষণ দুই পদার্থ ১)দৃক্‌ ও ২)দৃশ্য আছে ।  দৃক্‌ (দ্রষ্ঠা) ব্রহ্ম; দৃশ্য (জগৎপ্রপঞ্চ) মায়া - উহা সর্ববেদান্তের সারতত্ত্ব ।' - [বিদ্যারণ্য কৃত দৃগ্‌দৃশ্যবিবেক]
দৃক্‌ = চৈতন্যস্বরূপ বিজ্ঞাতা, প্রকাশক ব্রহ্ম; আত্মা
দৃশ্য = জড়, বিষয়, অনাত্মা  
_________________________________________

*Hard Copy Source:
"Srimadbhagabadgeeta" translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint - January, 1997 (1st Edition - 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation

Disclaimer
This site is not officially related to Ramakrishna Mission & MathThis is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk