Showing posts with label Gita-18. Show all posts
Showing posts with label Gita-18. Show all posts

Thursday, March 12, 2015

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা : অষ্টাদশ অধ্যায় - মোক্ষযোগ (18-Jagadishchandra)


১|২|৩|৪|৫|৬|৭|৮|৯|১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
(গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ)*

অর্জুন কহিলেন -
হে মহাবাহো, হে হৃষিকেষ, হে কেশিনিসূদন, সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব কি, তাহা পৃথক্‌ ভাবে জানিতে ইচ্ছা করি । ১

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
কাম্য কর্মের ত্যাগকেই পণ্ডিতগণ সন্ন্যাস বলিয়া জানেন; এবং সমস্ত কর্মের ফল-ত্যাগকেই সূক্ষ্মদর্শিগণ ত্যাগ বলিয়া থাকেন । ২

কোন কোন (সাংখ্য) পণ্ডিতগণ বলেন যে, কর্মমাত্রই দোষযুক্ত, অতএব ত্যাজ্য; অন্য কেহ কেহ (মীমাংসকগণ) বলেন যে, যজ্ঞ, দান ও তপঃকর্ম ত্যাজ্য নহে । ৩

হে ভরতশ্রেষ্ঠ, ত্যাগ বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত শ্রবণ কর; হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, ত্যাগ ত্রিবিধ বলিয়া কথিত হইয়াছে । ৪

যজ্ঞ, দান ও তপস্যারূপ কর্ম ত্যাজ্য নহে, উহা করাই কর্তব্য । যজ্ঞ, দান ও তপস্যা বিদ্বান্‌গণেরও চিত্তশুদ্ধিকর । ৫

হে পার্থ, এই সকল কর্মও কর্তৃত্বাভিমান ও ফল কামনা ত্যাগ করিয়া করা কর্তব্য । ইহাই আমার নিশ্চিত মত এবং ইহাই উত্তম মত । ৬

স্বধর্ম বলিয়া যাহার যে কর্ম নির্দিষ্ট আছে, সেই কর্ম ত্যাগ করা কর্তব্য নহে । মোহবশতঃ সেই কর্ম ত্যাগ করাকে তামসত্যাগ বলে । ৭

কর্মানুষ্ঠান দুঃখকর মনে করিয়া কায়িক ক্লেশের ভয়ে যে কর্মত্যাগ করা হয়, তাহা রাজসত্যাগ । যিনি এই ভাবে কর্মত্যাগ করেন, তিনি প্রকৃত ত্যাগের ফল লাভ করেন না । ৮

হে অর্জুন, কর্তৃত্বাভিমান ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া, কেবল কর্তব্য বলিয়া যে বিহিত কর্ম করা হয়, তাহাই সাত্ত্বিক ত্যাগ বলিয়া কথিত হয় । ৯ (অর্থাৎ কর্তৃত্বাভিমান ও ফলকামনা ত্যাগই সাত্ত্বিক ত্যাগ, কর্মত্যাগ নহে) ।

সত্ত্বগুণবিশিষ্ট, স্থিরবুদ্ধি, সংশয়শূন্য পূর্বোক্ত সাত্ত্বিক ত্যাগী পুরুষ দুঃখকর কর্মেও দ্বেষ করেন না এবং সুখকর কর্মেও আসক্ত হন না । ১০ (অর্থাৎ রাগদ্বেষ হইতে বিমুক্ত থাকিয়া কেবল কর্তব্যবোধে কর্ম করিয়া থাকেন) ।

যে দেহ ধারণ করে তাহার পক্ষে কর্ম সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা সম্ভবপর নয়; অতএব যিনি (কর্ম করিয়াও) কর্মফল ত্যাগ করেন, তিনিই প্রকৃত ত্যাগী বলিয়া কথিত হন । ১১

যাঁহারা ফল-কামনা ত্যাগ করেন না সেই অত্যাগী পুরুষগণের মৃত্যুর পরে অনিষ্ট, ইষ্ট ও ইষ্টানিষ্ট-মিশ্র, তাঁহাদের কর্মানুসারে এই তিন প্রকার ফল লাভ হয় । কিন্তু সন্ন্যাসীদের অর্থাৎ যাঁহারা কর্মফল ত্যাগ করিয়া কর্ম করেন, তাঁহাদের কখনও ফল লাভ হয় না । ১২ (অর্থাৎ তাঁহারা কর্ম করিলেও কর্মে আবদ্ধ হন না) ।

হে মহাবাহো, যে কোন কর্ম সম্পাদনের পক্ষে পাঁচটি কারণ সাংখ্য-সিদ্ধান্তে বর্ণিত আছে, তাহা আমার নিকট শ্রবণ কর । ১৩

অধিষ্ঠান (স্থান), কর্তা, বিবিধ করণ বা সাধন (যন্ত্র), কর্তার অনেক প্রকার চেষ্টা বা ব্যাপার এবং পঞ্চম কারণ দৈব । ১৪

মনুষ্য শরীর, মন ও বাক্যদ্বারা ন্যায্য বা অন্যায্য যে কোন কর্ম করে, পূর্বোক্ত পাঁচটি তাহার কারণ । ১৫

বাস্তবিক অবস্থা এইরূপ হইলেও (অর্থাৎ  পূর্বোক্ত পাঁচটি কর্মের কারণ হইলেও) নিঃসঙ্গ আত্মাকে যে কর্তা বলিয়া মনে করে, তাহার বুদ্ধি শাস্ত্রাদি জ্ঞানের দ্বারা পরিমার্জিত না হওয়ায় সে প্রকৃত তত্ত্ব দেখিতে পায় না । ১৬

যাঁহার 'আমি কর্তা' এই ভাব নাই, যাঁহার বুদ্ধি কর্মের ফলাফলে আসক্ত হয় না, তিনি সমস্ত লোক হনন করিলেও কিছুই হনন করেন না এবং তাহার ফলে আবদ্ধও হন না । ১৭

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা, এই তিনটি কর্মচোদনা অর্থাৎ কর্মপ্রবর্তক বা কর্মপ্রবৃত্তির হেতু । করণ, কর্ম, কর্তা, এই তিনটি কর্মসংগ্রহ বা ক্রিয়ার আশ্রয় । ১৮

কাপিল সাংখ্যশাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা সত্ত্বাদি গুণভেদে তিন প্রকার কথিত হইয়াছে, সে সকল যথাবৎ কহিতেছি, শ্রবণ কর । ১৯

যে জ্ঞানদ্বারা পরস্পর বিভক্তভাবে প্রতীয়মান সর্বভূতে এক অদ্বয় অব্যয় বস্তু (পরমাত্মতত্ত্ব) পরিদৃষ্ট হয়, সেই জ্ঞান সাত্ত্বিক জানিবে । ২০

যে জ্ঞানের দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন ভূতসমূহে পৃথক্‌ পৃথক্‌ ভাবের অনুভূতি হয় তাহা রাজস জ্ঞান । ২১

যাহা প্রকৃত তত্ত্ব তাহা না বুঝিয়া, ইহাই যাহা কিছু সমস্ত, এইরূপ বুদ্ধিতে কোন একমাত্র বিষয়ে আসক্ত থাকে সেই যুক্তিবিরুদ্ধ, অযথার্থ, তুচ্ছ জ্ঞানকে তামস জ্ঞান কহে । ২২

কর্মকর্তা ফলকামনা পরিত্যাগপূর্বক রাগদ্বেষ-বর্জিত হইয়া অনাসক্তভাবে অবশ্যকর্তব্যরূপে বিহিত যে কর্ম করেন, তাহাকে সাত্ত্বিক কর্ম বলা হয় । ২৩

আর, ফলাকাঙ্ক্ষা করিয়া অথবা অহঙ্কার সহকারে বহু আয়াস স্বীকার করিয়া যে কর্ম অনুষ্ঠিত হয়, তাহা রাজস কর্ম বলিয়া কথিত হয় । ২৪

ভাবিফল কি হইবে, নিজের সামর্থ্য কতটুকু, প্রাণিহিংসাদি হইবে কিনা, পরিণামে কিরূপ হানি হওয়ার সম্ভাবনা - এইসকল বিচার না করিয়া মোহবশতঃ যে কর্ম আরম্ভ করা হয়, তাহা তামস কর্ম বলিয়া কথিত হয় । ২৫

যিনি আসক্তিবর্জিত, যিনি 'আমি', 'আমার' বলেন না অর্থাৎ কর্তৃত্বাভিমান ও মমত্ববর্জিত, যিনি সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে হর্ষবিষাদশূন্য হইয়া নির্বিকার চিত্তে ধৈর্য ও উৎসাহ সহকারে কর্ম করেন, তাঁহাকে সাত্ত্বিক কর্তা বলে । ২৬

বিষয়াসক্ত, কর্মফলাকাঙ্ক্ষী, লোভী, হিংসাপরায়ণ, শৌচাচারহীন, সিদ্ধিলাভে হর্ষান্বিত ও অসিদ্ধিতে শোকান্বিত - এরূপ কর্তাকে রাজস কর্তা বলে । ২৭

যে অস্থিরমতি, অভদ্র, অনম্র, শঠ, পরবৃত্তিনাশক, অলস, সদা অবসন্নচিত্ত ও দীর্ঘসূত্রী, তাহাকে তামস কর্তা বলে । ২৮

হে ধনঞ্জয়, বুদ্ধির ও ধৃতিরও যে গুণানুসারে তিনপ্রকার ভেদ হয় তাহা পৃথক্‌ পৃথক্‌ সুস্পষ্টরূপে বলিতেছি, শ্রবণ কর । ২৯

হে পার্থ, কর্ম করা অথবা কর্ম হইতে নিবৃত্ত থাকা (অর্থাৎ কর্মমার্গ বা সন্ন্যাস), কর্তব্য কি, অকর্তব্য কি, কিসে ভয়, কিসে অভয়, কিসে বন্ধ, কিসে মোক্ষ, এই সকল যে বুদ্ধিদ্বারা যথাযথরূপে বুঝা যায়, তাহাই সাত্ত্বিকী বুদ্ধি । ৩০

হে পার্থ, যে বুদ্ধিদ্বারা ধর্ম ও অধর্ম, কার্য ও অকার্য যথার্থরূপে বুঝা যায় না, তাহা রাজসী বুদ্ধি । ৩১

হে পার্থ, যে বুদ্ধি মোহাচ্ছন্ন থাকাতে অধর্মকে ধর্ম মনে করে এবং সকল বিষয়ই বিপরীত বুঝে, তাহা তামসী বুদ্ধি । ৩২

যে অবিচলিত ধৃতিদ্বারা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া সমাধি বা সমদর্শনরূপ যোগবলে নিয়মিত হয়, তাহা সাত্ত্বিকী ধৃতি । ৩৩

হে পার্থ, হে অর্জুন, যে ধৃতিদ্বারা মনুষ্য ধর্ম, অর্থ ও কামোপভোগেই লাগিয়া থাকে এবং সেই সেই প্রসঙ্গে ফলাকাঙ্ক্ষী হয়, তাহা রাজসী ধৃতি । ৩৪

হে পার্থ, যে ধৃতিদ্বারা দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি নিদ্রা, ভয়, শোক, বিষাদ এবং মদ ছাড়িতে পারে না অর্থাৎ যাহাতে মনুষ্যকে এই সকল বিষয়ে আবদ্ধ করিয়া রাখে, তাহা তামসী ধৃতি । ৩৫

হে ভরতর্ষভ, এক্ষণে আমার নিকট ত্রিবিধ সুখের বিষয় শ্রবণ কর । ৩৬

যে সুখে ক্রমে ক্রমে অভ্যাসবশতঃ আনন্দ লাভ হয় (হঠাৎ নহে), যাহা লাভ হইলে দুঃখের অন্ত হয়, যাহা অগ্রে বিষের ন্যায়, পরিণামে অমৃততুল্য, যাহা আত্মনিষ্ঠ বুদ্ধির প্রসন্নতা হইতে জন্মে, তাহাই সাত্ত্বিক সুখ । ৩৭

রূপরসাদি বিষয়ে ইন্দ্রিয়ের সংযোগবশতঃ যে সুখ উৎপন্ন হয় এবং যাহা অগ্রে অমৃতের ন্যায় কিন্তু পরিণামে বিষতুল্য হয়, সেই সুখকে রাজস সুখ কহে । ৩৮ (ইহারই নাম বৈষয়িক বা আধিভৌতিক সুখ) ।

যে সুখ প্রথমে এবং পরিণামেও আত্মার বা বুদ্ধির মোহজনক এবং যাহা নিদ্রা, আলস্য ও কর্তব্যবিস্মৃতি হইতে উৎপন্ন হয়, তাহাকে তামস সুখ বলে । ৩৯

পৃথিবীতে, স্বর্গে অথবা দেবগণের মধ্যেও এমন প্রাণী বা বস্তু নাই যাহা প্রকৃতিজাত সত্ত্বাদি গুণ হইতে মুক্ত । ৪০

হে পরন্তপ, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদিগের কর্মসকল ভাবজাত গুণানুসারে পৃথক্‌ পৃথক্‌ বিভক্ত হইয়াছে । ৪১

শম, দম, তপঃ, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সাত্ত্বিকী শ্রদ্ধা - এই সমস্ত ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম (লক্ষণ) । ৪২

পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য, কার্যকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা, শাসন-ক্ষমতা, এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম (লক্ষণ) । ৪৩

কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য বৈশ্যদিগের এবং সেবাত্মক কর্ম শূদ্রদিগের স্বভাবজাত । ৪৪

নিজ নিজ কর্মে নিষ্ঠাবান্‌ ব্যক্তি সিদ্ধি লাভ করে; স্বকর্মে তৎপর থাকিলে কিরূপে মনুষ্য সিদ্ধিলাভ করে তাহা শুন । ৪৫

যাঁহা হইতে ভূতসমূহের উৎপত্তি বা জীবের কর্মচেষ্টা, যিনি এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছেন, মানব নিজ কর্মদ্বারা তাঁহার অর্চনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়া থাকে । ৪৬

স্বধর্ম দোষ-বিশিষ্ট হইলেও সম্যক্‌ অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ । স্বভাব-নির্দিষ্ট কর্ম করিয়া লোকে পাপভাগী হয় না । ৪৭

হে কৌন্তেয়, স্বভাবজ কর্ম দোষযুক্ত হইলেও তাহা ত্যাগ করিতে নাই । অগ্নি যেমন ধূমদ্বারা আবৃত থাকে, তদ্রূপ কর্মমাত্রই দোষযুক্ত । ৪৮

যিনি সর্ববিষয়ে অনাসক্ত, জিতেন্দ্রিয় ও নিস্পৃহ, তিনি কর্মফল ত্যাগের দ্বারা নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি লাভ করেন অর্থাৎ কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হন । ৪৯

হে কৌন্তেয়, এইরূপে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি-প্রাপ্ত ব্যক্তি যে প্রকারে ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন তাহা আমার নিকট শ্রবণ কর; উহাই জ্ঞানের চরম অবস্থা । ৫০

বিশুদ্ধ সাত্ত্বিক বুদ্ধিযুক্ত হইয়া, ধৈর্যসহ আত্মসংযমন করিয়া, শব্দাদি বিষয়সমূহ ত্যাগ করিয়া, রাগদ্বেষ বর্জন করিয়া, নির্জন স্থানে অবস্থিত ও মিতভোজী হইয়া, বাক্য, শরীর ও মনকে সংযত করিয়া, বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়া, সর্বদা ধ্যানে নিরত থাকিয়া, অহঙ্কার, বল (পাশবিক শক্তির ব্যবহার), দর্প, কাম, ক্রোধ এবং বাহ্য ভোগ-সাধনার্থ প্রাপ্ত দ্রব্যাদি বর্জন করতঃ মমত্ববুদ্ধিহীন প্রশান্তচিত্ত সাধক ব্রহ্মভাব লাভে সমর্থ হন । ৫১,৫২,৫৩

ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইলে পর তিনি প্রসন্নচিত্ত হইয়া (নষ্ট বস্তুর জন্য) শোক করেন না, বা (অপ্রাপ্ত বস্তুর জন্য) আকাঙ্ক্ষাও করেন না । তিনি সর্বভূতে সমদর্শী হন এবং আমাতে পরা ভক্তি লাভ করেন । ৫৪

(যিনি) এইরূপ পরাভক্তিদ্বারা আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারেন, (তিনিই) বুঝিতে পারেন - আমি কে, আমার কত বিভাব, আমার সমগ্র স্বরূপ কি; এবং এইরূপে আমাকে স্বরূপতঃ জানিয়া তদনন্তর (তিনি) আমাতে প্রবেশ করেন । ৫৫

আমাকে আশ্রয় করিয়া সর্বদা সর্বকর্ম করিতে থাকিলেও আমার প্রসাদে শাশ্বত অব্যয় পদ প্রাপ্ত হন । ৫৬

মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া, মৎপরায়ণ হইয়া, সাম্য-বুদ্ধিরূপ যোগ অবলম্বন করিয়া, সর্বদা আমাতে চিত্ত রাখ (এবং যথাধিকার স্বকর্ম করিতে থাক) । ৫৭

আমাতে চিত্ত রাখিলে তুমি আমার অনুগ্রহে সমস্ত সঙ্কট অর্থাৎ কর্মের শুভাশুভ ফল অতিক্রম করিবে । আর যদি আমার কথা না শুন, তবে বিনাশ-প্রাপ্ত হইবে । ৫৮

তুমি অহঙ্কারবশতঃ এই মনে করিতেছ আমি যুদ্ধ করিব না, তোমার এই সঙ্কল্প মিথ্যা; প্রকৃতিই (তোমার ক্ষত্রিয় স্বভাব) তোমাকে (যুদ্ধকর্মে) প্রবর্তিত করিবে । ৫৯ (৩|২৭ শ্লোক দ্রষ্টব্য)

হে কৌন্তেয়, মোহবশতঃ তুমি যাহা করিতে ইচ্ছা করিতেছ না, স্বভাবজ স্বীয় কর্মে আবদ্ধ থাকায় তোমাকে অবশ হইয়া তাহা করিতে হইবে । ৬০

হে অর্জুন, ঈশ্বর সর্ব জীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া মায়াদ্বারা যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার ন্যায় তাহাদিগকে ভ্রমণ করাইতেছেন । ৬১

হে ভারত, সর্বতোভাবে তাঁহারই শরণ লও; তাঁহার প্রসাদে পরম শান্তি ও চিরন্তন স্থান প্রাপ্ত হইবে । ৬২

আমি তোমার নিকট এই গুহ্য হইতেও গুহ্য তত্ত্বকথা ব্যাখ্যা করিলাম, তুমি ইহা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করিয়া যাহা ইচ্ছা হয় তাহা কর । ৬৩

এখন সর্বাপেক্ষা গুহ্যতম পরমশ্রেয়ঃসাধন আমার কথা শ্রবণ কর; তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয়, এই হেতু তোমাকে এই কল্যাণকর কথা বলিতেছি । ৬৪

তুমি একমাত্র আমাতেই চিত্ত রাখ, আমাকে ভক্তি কর, আমাকে পূজা কর, আমাকে নমস্কার কর । আমি সত্য প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি, তুমি আমাকেই পাইবে, কেননা তুমি আমার প্রিয় । ৬৫

সকল ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া তুমি একমাত্র আমারই শরণ লও; আমি তোমাকে সকল পাপ হইতে মুক্ত করিব, শোক করিও না । ৬৬


যে তপস্যা করে না বা স্বধর্মানুষ্ঠান করে না, যে অভক্ত, যে শুনিবার ইচ্ছা রাখে না এবং যে আমাকে নিন্দা করে, এরূপ ব্যক্তিকে তুমি গীতাশাস্ত্র বলিবে না । ৬৭

যিনি এই পরম গুহ্যশাস্ত্র আমার ভক্তগণের নিকট ব্যাখ্যা করিবেন, তিনি আমাকে পরাভক্তি করায় (অর্থাৎ এই কার্যে আমি ভগবানেরই উপাসনা করিতেছি এইরূপ মনে করায়) আমাকেই প্রাপ্ত হইবেন, ইহাতে সন্দেহ নাই । ৬৮

মনুষ্যমধ্যে গীতা-ব্যাখ্যাতা অপেক্ষা আমার অধিক প্রিয়কারী আর কেহ নাই এবং পৃথিবীতে তাহা অপেক্ষা আমার অধিক প্রিয় আর কেহ হইবেও না । ৬৯

আর যিনি আমাদের এই ধর্মসংবাদ (গীতাশাস্ত্র) অধ্যয়ন করিবেন, তিনি জ্ঞানযজ্ঞদ্বারা আমার অর্চনা করিলেন, ইহাই আমি মনে করিব । ৭০

যিনি শ্রদ্ধাবান্‌ ও অসূয়াশূন্য হইয়া শ্রবণ করেন, তিনিও পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া পুণ্যবান্‌গণের প্রাপ্য শুভ লোকসকল প্রাপ্ত হন । ৭১

হে পার্থ, তুমি একাগ্রমনে ইহা শুনিয়াছ ত ? হে ধনঞ্জয়, তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ দূর হইয়াছে ত ? ৭২

অর্জুন বলিলেন -
হে অচ্যুত, তোমার প্রসাদে আমার মোহ নষ্ট হইয়াছে, আমার কর্তব্যাকর্তব্য-জ্ঞান লাভ হইল, আমি স্থির হইয়াছি, আমার আর সংশয় নাই, আমি তোমার উপদেশ মত কার্য (যুদ্ধ) করিব । ৭৩

সঞ্জয় বলিলেন -
এইরূপে মহাত্মা বাসুদেব এবং অর্জুনের এই অদ্ভুত লোমহর্ষকর সংবাদ আমি শ্রবণ করিয়াছি । ৭৪

ব্যাসদেবের প্রসাদে সাক্ষাৎ যোগেশ্বর স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখ হইতেই আমি এই যোগশাস্ত্র শ্রবণ করিয়াছি । ৭৫

হে রাজন্‌, কেশব ও অর্জুনের এই পবিত্র অদ্ভুত সংবাদ বারংবার স্মরণ করিয়া মুহুর্মুহুঃ হর্ষ হইতেছে । ৭৬

হে রাজন্‌, হরির সেই অতি অদ্ভুত বিশ্বরূপ স্মরণ করিয়া আমার অতিশয় বিস্ময় জন্মিতেছে এবং বার বার হর্ষ হইতেছে । ৭৭

যে পক্ষে যোগেশ্বর কৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ, সেখানেই লক্ষী, বিজয়, উত্তরোত্তর ঐশ্বর্যবৃদ্ধি ও অখণ্ডিত রাজনীতি আছে, ইহাই আমার মত । ৭৮ [অতএব আপনি পুত্রগণের জয়লাভের আশা ত্যাগ করুন, পাণ্ডবগণের সঙ্গে সন্ধি করুন ।]

___________________________
১) কেশিনিসূদন = শ্রীকৃষ্ণ ব্রজলীলায় কেশী নামক অসুরকে বধ করিয়াছিলেন

সন্ন্যাস ও ত্যাগের ব্যাখ্যা - সন্ন্যাস ও ত্যাগ এই দুইটির ধাত্বর্থ একই = পরিত্যাগ করা, ছাড়া । কিন্তু 'সন্ন্যাস' শব্দের একটি বিশেষ অর্থ এই যে, সর্বকর্ম ত্যাগ করিয়া চতুর্থ আশ্রম অবলম্বন করা । এই চতুর্থাশ্রম শাস্ত্রবিহিত এবং সন্ন্যাস অবলম্বন ব্যতীত মোক্ষলাভ হয় না, এই মতও সুপ্রচলিত । অর্জুনও মনে করিয়াছিলেন, শ্রীভগবান্‌ অবশ্য এই কথা শেষে বলিবেন । কিন্তু তিনি এ পর্যন্ত কোথাও কর্মত্যাগের উপদেশ দিলেন না । তিনি আরও এই কথা বলিলেন যে, যিনি আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করেন তিনিই নিত্য সন্ন্যাসী । সেই জন্যই অর্জুন প্রশ্ন করিলেন যে, তিনি ত্যাগ ও সন্ন্যাস এই শব্দ দুইটি কি অর্থে ব্যবহার করিতেছেন । ইহাদের মধ্যে অর্থগত কোন পার্থক্য আছে কিনা এবং থাকিলে, তাহা কি ? এই কথার উত্তরেই শ্রীভগবান্‌কর্মযোগ-মার্গের সারার্থ পুনরায় স্পষ্টীকৃত করিয়া গীতাশাস্ত্রের উপসংহার করিয়াছেন ।

২) কাম্য কর্মের ত্যাগই সন্ন্যাস । কিন্তু সূক্ষদর্শী পণ্ডিতগণ বলেন যে, সকল কর্মের ফল-ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ; সুতরাং যিনি ফল ত্যাগ করেন, তিনি কর্ম করিলেও প্রকৃতপক্ষে সন্ন্যাসী ।

৬) পূর্বে বলা হইয়াছে যে, কর্তৃত্বাভিমান ও ফলকামনা বর্জন করিয়া ঈশ্বরার্পণ বুদ্ধিতে সমস্ত কর্ম করা উচিত । শ্রৌত স্মার্ত যজ্ঞদানাদি কর্মও ঠিক সেই ভাবেই করা কর্তব্য । ইহাই নিষ্কাম কর্মযোগ ।

৭) (স্বভাব)নিয়ত কর্ম - স্বধর্মানুসারে যথাধিকার প্রাপ্ত কর্ম । জীবের স্বভাব বা প্রকৃতির গুণভেদবশতঃই বর্ণভেদ ও কর্মভেদ শাস্ত্রে বিহিত হইয়াছে । সুতরাং যথাধিকার শাস্ত্রবিহিত কর্মই নিয়ত কর্ম । ইহাকেই স্বধর্ম, স্বকর্ম, সহজ কর্ম, স্বভাবজ কর্ম ইত্যাদি বলা হইয়াছে ।

৮) ত্যাগের ফল কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হওয়া অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করা । কিন্তু কায়ক্লেশভয়ে কর্তব্য কর্ম ত্যাগ করিলে তাহাতে মোক্ষ লাভ হয় না । এইরূপ ত্যাগকে রাজসত্যাগ বলে ।

১৩) সাংখ্যে কৃতান্তে - এস্থলে 'সাংখ্যে' পদটি 'কৃতান্ত' পদের বিশেষণ । সাংখ্য = কাপিল সাংখ্য অথবা বেদান্তশাস্ত্র । কৃতান্ত = সিদ্ধান্ত শাস্ত্র । সুতরা 'সাংখ্যে কৃতান্তে' = কাপিল সাংখ্যশাস্ত্র অথবা
বেদান্তশাস্ত্র ।

১৪) কোন কর্ম হইতে গেলেই কর্তা, করণ বা সাধন (যন্ত্র), অধিকরণ বা স্থান এবং কর্তার নানাবিধ চেষ্টা প্রয়োজন । বেদান্তাদি শাস্ত্রের পরিভাষায় অহঙ্কারই কর্তা, চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয় করণ, দেহই অধিষ্ঠান এবং প্রাণ অপানাদির ব্যাপারই চেষ্টা বলিয়া গৃহীত হয় । এই সকলের সহায়তাই কর্ম সম্পন্ন হয় । এতদ্ব্যতীতও আমাদের প্রযত্নের প্রয়োজক ও অনুকূল এমন কোন ব্যাপার আছে যাহা আমরা জানি না এবং দেখি না - ইহাকেই দৈব বলা হয় ।

১৪,১৫) দৈব কি ? - শাস্ত্রে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের প্রত্যেকের আনুকূল্যকারী এক একটি অধিষ্টাত্রী দেবতার উল্লেখ আছে । যেমন, শরীরের দেবতা পৃথিবী, চক্ষুর - অর্ক, হস্তের - ইন্দ্র, অহঙ্কারের - রুদ্র, মনের - চন্দ্র, ইত্যাদি । এই দেবগণের সাহায্যে ও শক্তিতেই ইন্দ্রিয়াদির কার্য সম্পন্ন হয় । অনেক টীকাকার ইহাকেই 'দৈব' বলিয়াছেন । কেহ কেহ বলেন 'সর্বপ্রেরক অন্তর্যামী' অথবা 'ধর্মাধর্ম-সংস্কার' । মূল তত্ত্বটি একই । সেইটিই বুঝা প্রয়োজন ।
প্রশ্ন এই - জীব কর্ম করে কেন ? কর্ম-প্রবৃত্তি কোথা হইতে আসিল ? জন্ম, কর্ম, সংসার, সৃষ্টি - ইহার আদি কোথায়, ইহার মূল কারণ কি ? ইহার মূলে ব্রহ্মসঙ্কল্প - 'আমি এক আছি, বহু হইব' - পরব্রহ্মের এই সঙ্কল্প হইতেই ব্রহ্মাদি স্তম্ব পর্যন্ত সর্বভূতের উৎপত্তি ও সকলের স্ব স্ব কার্যে প্রবৃত্তি । বলীবর্দাদি চতুষ্পদ জন্তু যেমন নাসিকায় বদ্ধ হইয়া মনুষ্যের ইচ্ছায় তাহার নিমিত্ত কর্ম করে, আমরা সকলেই সেইরূপ ত্রিগুণে বদ্ধ হইয়া ঈশ্বরের ইচ্ছায় তাঁহার কর্ম করি (শ্রীভাগবতে ব্রহ্মার বাক্য ৫।১।২৪) ।
সুতরাং সৃষ্টিকালে অথবা সৃষ্টির প্রাক্কালে (শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা) যাহার ললাটে যাহা লিখিত হইয়াছে অর্থাৎ যাহার পক্ষে যাহা নির্দিষ্ট হইয়াছে, সকলেই তদনুসারে কর্ম করিতেছে, ইহার অন্যথা করিবার কাহারও সাধ্য নাই ।
এই ঈশ্বর-সঙ্কল্পকেই মহানিয়তি বা দৈব বলে । হরিহরব্রহ্মাও ইহা লঙ্ঘন করিতে পারেন না, কেননা তাঁহারাও এই সঙ্কল্পের অধীন । সৃষ্টি হইতে প্রলয় পর্যন্ত জগতে যাহা কিছু কর্ম হয় তাহা এই নিয়তিবলেই সম্পন্ন হয় । এই নিয়তিবলেইচন্দ্র-সূর্য, বায়ু-বরুণাদি স্ব স্ব কার্যে ব্যাপৃত আছেন, এই নিয়তিবলেই আদিত্যাদি দেবগণ চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের শক্তি দান করিতেছেন, এই হেতু এই শক্তিকেই 'দৈব' বলা হইয়াছে । এই ঈশ্বর-সঙ্কল্পকেই কেহ কেহ 'সর্বপ্রেরক অন্তর্যামী' বলিয়াছেন । এই নিয়তিই প্রাক্তন বা পূর্বজন্মের 'ধর্মাধর্ম সংস্কার'রূপে প্রকাশিত হয় এবং জন্মে জন্মে জীবের জন্মকর্মের ফলবৈষম্য উৎপন্ন করে, ইহাকেই লোকে অদৃষ্ট বলে ।
অনেকে মনে করেন, দৈবের যখন খণ্ডন নাই, তখন পুরুষকার অবলম্বন করা বৃথা । তাঁহারা বুঝিতে পারেন না যে, দৈব পুরুষকাররূপেই কর্মের নিয়ন্তা হয়, পুরুষকার আশ্রয় করিয়াই দৈব ফল প্রদান করে । শস্য উৎপাদনার্থ বীজ ও ক্ষেত্র উভয়েরই প্রয়োজন; দৈব কর্মের বীজস্বরূপ এবং সুপ্রযুক্ত পুরুষকার কর্ষিত ক্ষেত্রস্বরূপ; এই উভয়ের সংযোগে কর্মফল লাভ হয় ।

১৭) স্থিতপ্রজ্ঞ কর্মযোগী পাপপুণ্যের অতীত । প্রকৃতিই কর্ম করে, আত্মা অকর্তা, নিঃসঙ্গ । দেহ ইন্দ্রিয় অহঙ্কার এবং দৈব বা ঈশ্বর-সঙ্কল্প এই সকলই কর্মঘটনার কারণ, আত্মা বা 'আমি' ইহার কোনটির মধ্যেই নয় । সুতরাং যে মনে করে, আত্মা বা 'আমিই' কর্তা, সে অজ্ঞান, সে প্রকৃত তত্ত্ব জানে না । এই অজ্ঞানতাপ্রসূত কর্তৃত্বাভিমানবশতঃই তাহার কর্মবন্ধন হয় । যাঁহার অহং অভিমান নাই, বুদ্ধি যাঁহার নির্লিপ্ত, তাঁহার কর্মবন্ধন হয় না, সে কর্ম লোকরক্ষাই হউক, লোকহত্যাই হউক, তাহাতে কিছু আসে যায় না । এইরূপ কর্তৃত্বাভিমান ও কামনাবর্জিত আত্মজ্ঞানী পুরুষই স্থিতপ্রজ্ঞ, ব্রহ্মভূত, ত্রিগুণাতীত, জীবন্মুক্ত ইত্যাদি নামে অভিহিত হন । ঈদৃশ শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত-স্বভাব ব্যক্তিগণের ব্যবহার সম্বন্ধে পাপ-পুণ্য, ধর্ম-অধর্ম, নীতি-অনীতি ইত্যাদির বিচার চলে না, কেননা তাঁহারা পাপ-পুণ্যাদি দ্বন্দ্বের অতীত (শঙ্করাচার্য) । কৌষীতকী উপনিষদে ইন্দ্র প্রতর্দনকে বলিতেছেন যে, বৃত্র অর্থাৎ ব্রাহ্মণকে বধ করিলেও আমার পাপ হয় না, একথার মর্মও ইহাই ।

১৮) কর্মচোদনা ও কর্মসংগ্রহ - কোন কর্ম আরম্ভ করিবার পূর্বে একটি প্রেরণা চাই, এই প্রেরণার জন্য জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা, এই তিনটির প্রয়োজন । স্থুল কথা কর্মচোদনা = কর্মবিষয়ক মানসিক প্রেরণা, কর্মসংগ্রহ = সেই প্রেরণার বাহ্য প্রকাশ ।

২০) সাত্ত্বিক-জ্ঞান - জগতের নানাত্বের মধ্যে যে একত্ব দর্শন তাহাই প্রকৃত জ্ঞান । একমাত্র অদ্বয় অব্যয় সদ্বস্তুই আছেন, যাহা কিছু ছিল, আছে বা থাকিতে পারে, সমস্তই তাঁহাতেই আছে, তিনি 'সব', সমস্তই বাসুদেব; ইহাই অদ্বৈত জ্ঞান । এই জ্ঞান লাভ জীবের পরম নিঃশ্রেয়স্‌, উহাই মুক্তি । আত্মজ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞান, ব্রহ্মাত্ম্যৈক্যজ্ঞান, সর্বত্র সমদর্শন ইত্যাদি নানা কথায় এই জ্ঞানের বর্ণনা পূর্বে করা হইয়াছে । এই সাত্ত্বিক জ্ঞানলাভ করিয়া সাত্ত্বিক কর্তা বা কর্মযোগী সাত্ত্বিক (নিষ্কাম) কর্ম করেন ।

২১) রাজস জ্ঞান - সর্বভূতে ভেদবুদ্ধি, একত্বের মধ্যে নানাত্ব দর্শন, ইহাই বদ্ধ জীবের জ্ঞান বা অজ্ঞান । ইহাতেই বদ্ধ হইয়া জীব জন্মমৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হয় । এই রাজস জ্ঞান বা ভেদজ্ঞান হইতেই সংসার, ইহা হইতেই রাগদ্বেষ দম্ভদর্পাদি সর্ববিধ রাজস প্রবৃত্তি অ কাম্য কর্মের উৎপত্তি ।

২২) তামস জ্ঞান - তুচ্ছ একই বিষয়ে অভিনিবিষ্ট থাকে, উহার বাহিরে যায় না । যেমন মৃত্তিকা, পাথর, বৃক্ষাদিকেই একমাত্র উপাস্য বস্তু মনে করা, উহা ব্যতীত ঈশ্বরের অন্যবিধ স্বরূপ বা সত্তার ধারণা না থাকা । নিজের দেহ বা পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই যে আসক্ত - তাহারও তামসিক জ্ঞান ।

২৪) কামনা ও অহঙ্কার থাকিলেই দুরাকাঙ্ক্ষা ও দুশ্চিন্তা অনিবার্য । অনেক-স্থলে নিজের অত্যধিক স্বার্থচিন্তায় অপরের স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি থাকে না, তাহাতে সংঘর্ষ উপস্থিত হয় । আবার দুরাকাঙ্ক্ষাবশতঃ অনেকে কঠোর শারীরিক কষ্ট সহ্য করিয়াও স্বার্থ সাধনে যত্নপর হয়, এই সব কারণেই বলা হইয়াছে যে, সকাম কর্ম বহু আয়াসসাধ্য ।

২৫) ত্রিবিধ কর্ম - নিষ্কাম কর্ম = সাত্ত্বিক কর্ম, সকাম কর্ম = রাজসিক ও তামসিক কর্ম, নিষিদ্ধ কর্ম = সকাম কর্মের কতকগুলিকে শাস্ত্রে নিষিদ্ধ কর্ম বলা হইয়া থাকে । বিশেষ দ্রষ্টব্য - কর্মের এই শ্রেণী-বিভাগ কর্মেরই বাহ্য প্রকৃতি বা পরিণাম বিচার করিয়া করা হয় নাই, কর্তার বুদ্ধি অনুসারেই করা হইয়াছে । গীতার মতে কর্মের কর্তব্যাকর্তব্য-বিচারে কর্মের ফলাফল না দেখিয়া কর্তার বাসনাত্মিকা বুদ্ধিরই বিচার করা হয় । এইরূপ বিচারে হিংসাত্মক যুদ্ধাদি কর্মও সাত্ত্বিক হইতে পারে, আবার অবস্থা-বিশেষে লোকহিতকর দানাদি কর্মও রাজসিক বা তামসিক হইতে পারে । আবার একই কর্ম এক জনের পক্ষে সাত্ত্বিক হইতে পারে, অপরের পক্ষে রাজসিক বা তামসিক হইতে পারে । যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকর্ম - ইহা অর্জুনের পক্ষে সাত্ত্বিক, কেননা তিনি স্বধর্ম বলিয়া নিষ্কামভাবে উহা অনুষ্ঠান করিয়াছেন । কর্ণাদি যোদ্ধৃগণের পক্ষে ইহা রাজসিক, কেননা তাঁহারা ধনমানাদির আশায় উহাতে যোগদান করিয়াছিলেন; দুর্যোধনের পক্ষে উহা তামসিক, কেননা তিনি নিজের সামর্থ্য, শক্তিক্ষয়, ভাবিফল ইত্যাদি বিবেচনা না করিয়া মোহবশতঃ উহাতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন ।

২৮) দীর্ঘসূত্রী = আজ না, কাল করিব এইরূপ ভাবে যে কাল-বিলম্ব করে ।

৩০) সাত্ত্বিকী বুদ্ধি ও সদসদ্বিবেক (Conscience) :
পাশ্চাত্য নীতিশাস্ত্র অনুযায়ী সদসদ্বিবেক (Conscience) হল মানুষের এক স্বাভাবিক স্বতন্ত্র শক্তি যাহাদ্বারা সে বিনা বিচারে (intuitionally) ভাল-মন্দ নির্ণয় করিতে পারে । কিন্তু চোর বা সাধুর conscience পৃথক হয় কেন, তাহার কোন সন্তোষজনক উত্তর পাশ্চাত্য শাস্ত্রের কাছে নাই । ভারতীয় দর্শনে এরূপ কোনো স্বতন্ত্র শক্তির অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় নাই । হিন্দু-দর্শনমতে ভাল-মন্দ বা যাহা-কিছু বিচারের শক্তি একমাত্র বুদ্ধির । বুদ্ধি যখন আত্মনিষ্ঠ হইয়া শুদ্ধ হয় তখনই তাহার বিচার যথার্থরূপ হয়, কেননা তখন উহা আত্মার প্রেরণা বা স্বাধর্ম্য লাভ করে, ইহাই সাত্ত্বিকী বুদ্ধি । সাত্ত্বিকী বুদ্ধিই সন্দেহস্থলে প্রমাণস্বরূপ, কিন্তু রাজসী ও তামসী বুদ্ধি লোককে বিপথে চালিত করে । এই হেতুই পাশ্চাত্যগণ যাহাকে conscience বলেন, তাহা সকলের সমান হয় না । কেননা প্রকৃতির গুণভেদে বুদ্ধি বিভিন্ন হয় ।

২৯,৩৩,৩৫) ত্রিবিধ ধৃতি - সেই মানসিক শক্তি যাহাতে মনুষ্য কোন কর্মে দৃঢ়ভাবে লাগিয়া থাকিতে পারে ।
সাত্ত্বিকী ধৃতি = যাহা দ্বারা সাত্ত্বিক বা নিষ্কাম কর্মে লাগিয়া  থাকা যায়;
রাজসী ধৃতি= যাহাতে অর্থকামাদি রাজসিক বিষয়ে লাগিয়া থাকে;
তামসী ধৃতি = যাহা দ্বারা শোক, ভয় ইত্যাদি তামসিক ভাবে লাগিয়া থাকে ।

৩৯) প্রমাদ = কর্তব্যের ভ্রম বা বিস্মৃতি । অনবধানতা ।

কর্মতত্ত্ব বিশ্লেষণ :
যে কোনো কর্ম সম্পাদনের পক্ষে অধিষ্ঠান, কর্তা, করণ, নানাবিধ চেষ্টা এবং দৈব - এই সকল কারণ বিদ্যমান থাকে । সুতরাং যে মনে করে, কেবল 'আমিই' কর্ম করি, সে দুর্মতি প্রকৃত তত্ত্ব বোঝে না । যাহার 'আমি কর্তা' এই ভাব নাই, তিনি কর্মের শুভাশুভ ফলে আবদ্ধ হন না । কর্মপ্রবৃত্তির হেতু = (i)জ্ঞান, (ii)জ্ঞেয়, (iii)জ্ঞাতা । ক্রিয়ার আশ্রয় =  (i)কর্তা, (ii)কর্ম, (iii)করণ । তন্মধ্যে জ্ঞান, কর্তা ও কর্ম গুণভেদে ত্রিবিধ হয় । আবার কর্তার বুদ্ধি, ধৃতি এবং যে-সুখলাভার্থ কর্ম করা হয় সেই সুখও গুণভেদে ত্রিবিধ । এইরূপ গুণভেদবশতই বিভিন্ন কর্তার, বিভিন্ন কর্মের বিভিন্ন ফল হয় । যেমন সাত্ত্বিক জ্ঞান (সর্বত্র সমদর্শন) হইতে সাত্ত্বিক কর্তা (কর্মযোগী) সাত্ত্বিক কর্ম (নিষ্কাম কর্ম) করেন, তাঁহার সাত্ত্বিকী বুদ্ধি (বন্ধমোক্ষ-নির্ণয়-সমর্থা) এই কর্ম নিশ্চয় করিয়া দেয় । সাত্ত্বিকী ধৃতি তাঁহাকে এই কর্মে স্থির রাখে এবং তিনি এই সাত্ত্বিক কর্মের যে-ফল সাত্ত্বিক সুখ, নির্মল আত্মপ্রসাদ (আত্মানন্দ), তাহা লাভ করেন । রাজসিক ও তামসিক কর্তার কর্ম এবং তাহার ফলও এইরূপ গুণভেদে বিভিন্ন হয় ।


৪৬) স্বধর্ম বা কর্তব্য পালনেই ঈশ্বরের অর্চনা - তাহাতেই সিদ্ধি । কর্ম ভগবানেরই সৃষ্টি এবং তাহা হইতেই জীবের কর্ম-প্রবৃত্তি । ইহাই তাঁহার লীলা । জীব কর্মে বিরত হইলে তৎক্ষণাৎ ভবলীলা শেষ হয় । সুতরাং তাঁহার সৃষ্টি-রক্ষার্থ গীতার ভাষায় লোকসংগ্রহার্থ বা ভক্তিশাস্ত্রের ভাষায় তাঁহার লীলাপুষ্টির জন্য জীবের যথাপ্রাপ্ত কর্ম করিতে হয় । হিন্দুর কর্ম-জীবনে ও ধর্ম-জীবনে পার্থক্য নাই । তাহার সমস্ত কর্মই ধর্মশাস্ত্রনির্দিষ্ট । এই সমস্ত কর্ম, ফলকামনা ত্যাগ করিয়া একমাত্র শ্রীবিষ্ণুপ্রীতিকাম হইয়া, করিতে পারিলেই তাঁহার অর্চনা হয় এবং তাহাতেই সদ্গতি লাভ হয়, ইহা সমস্ত ভক্তিশাস্ত্রের সিদ্ধান্ত ।

৪৮) ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধকর্মে বা কৃষকের কৃষিকর্মেও প্রাণিহিংসা অনিবার্য; কিন্তু এইরূপ হিংসাদিযুক্ত হইলেও তাহা ত্যাগ করিয়া অন্য বর্ণের কর্ম গ্রহণ করা কর্তব্য নয় । কেননা কর্মমাত্রই দোষযুক্ত, যেহেতু উহা বন্ধনের কারণ, কর্ম করিলেই তাহার শুভাশুভ ফলভোগার্থ পুন; পুনঃ জন্মগ্রহণ ও সংসার-যাতনা ভোগ অনিবার্য । তবে কর্মত্যাগই ত শ্রেয়ঃকল্প ? না, কর্ম করিয়াও যাহাতে কর্মবন্ধন না হয় তাহার উপায় আছে । (পরের শ্লোক) ।

৪৯) জিতাত্মা = জিতেন্দ্রিয় (শঙ্কর), নিরহঙ্কার (শ্রীধর) ।

৪৯) নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি = কর্মবন্ধন হইতে মুক্তি । সমস্ত অধ্যাত্ম-শাস্ত্রের মূল কথাই হইতেছে, কিরূপে জীব জন্ম-কর্মচক্র হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিতে পারে তাহার উপায় নির্দেশ ।

৫৩) পরিগ্রহম্‌ = শরীরধারণার্থ বা ধর্মানুষ্ঠানার্থ লোকের নিকট হইতে অর্থ বা দ্রব্যাদি গ্রহণ । প্রকৃত যোগযুক্ত সাধু পুরুষ এ সকলও ত্যাগ করেন ।

৫৪-৫৬) নিষ্কাম কর্ম -> নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি -> সাত্ত্বিকী বুদ্ধি -> ব্রহ্মভূত (ব্রহ্মভাব প্রাপ্তি) -> পরাভক্তি -> মোক্ষ (ভগবৎ-প্রাপ্তি)

এস্থলে জ্ঞানবাদী ও ভক্তিবাদীর মধ্যে এক সূক্ষ তর্ক উপস্থিত হয় । জ্ঞানবাদী বলেন, জ্ঞান ব্যতীত মুক্তি নাই এবং এই হেতুই - আমাকে স্বরূপতঃ জানিয়া আমাতে প্রবেশ করেন - এস্থলে এই কথা আছে । ভক্তিবাদী বলেন, ব্রহ্মভাবলাভেই জীবের মুক্তি, ইহাই জ্ঞানমার্গের চরম অবস্থা । কিন্তু এস্থলে শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন, ব্রহ্মভাবলাভ হইলেই আমাতে পরাভক্তি জন্মে এবং ভক্তিদ্বারাই আমার স্বরূপের অবগতি হইলে ভক্ত আমাকে প্রাপ্ত হন । সুতরাং এস্থলে ভক্তিরই প্রাধান্য দেওয়া হইয়াছে; বস্তুত পরম জ্ঞান ও পরাভক্তিতে কোন পার্থক্য নাই, সাধক যে পথেই সাধনা আরম্ভ করুক না কেন, একটি থাকিলে অপরটি আসিবেই, সুতরাং জ্ঞান-ভক্তির প্রাধান্য লইয়া বিবাদ নিরর্থক ।

৫৭) বুদ্ধিযোগ : গীতায় শ্রীভগবান যে যোগ বলিতেছেন, তাহাকে কখনো বুদ্ধিযোগ, কখনো বা কেবল যোগ শব্দদ্বারাই প্রকাশ করিয়াছেন । এ-স্থলে বুদ্ধি অর্থ শুদ্ধ সাম্য-বুদ্ধি, উহাই কর্মযোগের মূল, কর্ম করিবার সময় বুদ্ধিকে স্থির, পবিত্র সম ও শুদ্ধ রাখাই সেই যোগ, 'যুক্তি' বা কৌশল যাহাতে কর্মের বন্ধন হয় না, সে কর্ম যাহাই হউক-না-কেন । এই হেতুই 'কর্ম হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ' [২|৪৮-৫১] ।

৫৯-৬৩) প্রকৃতি-পারতন্ত্র ও আত্মস্বাতন্ত্র্য - এস্থলে শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন - তুমি ইচ্ছা না করিলেও প্রকৃতি তোমাকে স্বাভাবিক কর্মে প্রবর্তিত করিবে, তোমাকে অবশভাবেই সে কর্ম করিতে হইবে । প্রকৃতির প্রেরণায় কর্ম, কর্মফলে সদসৎ যোনিতে জন্ম, জন্মিয়া আবার কর্ম, কর্মফলে আবার জন্ম । সুতরাং দেখা যায়, জীবকে অবিরত জন্ম-কর্মের ভবচক্রেই ঘুরিতে হয় । এই প্রকৃতি-পারতন্ত্র বা কর্মবিপাক হইতে মুক্তিলাভের উপায় কি ? জ্ঞানলাভার্থ, মোক্ষার্থ জীবের কি কোন স্বাতন্ত্র্য নাই ? অধ্যাত্মশাস্ত্র বলেন, আছে । পরমাত্মা শুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব এবং তিনিই বা তাঁহারই সনাতন অংশ জীবাত্মারূপে দেহে আছেন; তিনি কখনও প্রকৃতির পরতন্ত্র হইতে পারেন না । দেহেন্দ্রিয়াদির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায় তাঁহাকে বদ্ধ অ পরাধীনের ন্যায় বোধ হয়; তিনি মায়াধীন হন । কিন্তু তাহা হইলেও স্বতঃই তাঁহার মুক্ত হইবার প্রেরণা আসে । গুরুপদেশ, সাধুসং প্রভৃতি অনুকূল অবস্থায় সেই প্রেরণা মন এবং বুদ্ধির উপর কার্য করে, তাহাতেই মনুষ্যের মনে আত্মোন্নতি বা মোক্ষানুকূল কর্ম করিবার প্রবৃত্তি জন্মে ।

আমাদের মধ্যে দুইটি 'আমি' আছে - (i)কাঁচা আমি, বদ্ধ আমি, অহঙ্কারী আমি, প্রকৃতির দাস আমি (Lower-self, ego-sense); (ii) পাকা আমি, শুদ্ধ, বুদ্ধ, স্বতন্ত্র্য আমি (Higher self, soul) । এই পাকা আমি দ্বারা কাঁচা আমি উদ্ধার করিতে হইবে । এই গেল জ্ঞানমার্গের কথা ।

কৃপাবাদ - কিন্তু ভক্তিমার্গে বলা হয় যে, শ্রীভগবান্‌ই অন্তর্যামীরূপে হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া জীবকে যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার ন্যায় মায়াদ্বারা চালাইতেছেন, সুতরাং সর্বতোভাবে তাঁহার শরণ লইলেই তাঁহার প্রসাদে মুক্তিলাভ হয় । মনে রাখা প্রয়োজন, কৃপাবাদ অর্থ নিশ্চেষ্টতা নয়, আত্মচেষ্টা ব্যতীত ভগবৎকৃপা হয় না ।

ইচ্ছা-স্বাতন্ত্র্য (Freedom of the Will) - পাশ্চাত্য দার্শনিকগণ ইহা সম্বন্ধে অনেক গবেষণা করিয়াছেন, কিন্তু কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিয়াছেন বলিয়া বোধ হয় না । আর্য ঋষিগণ সাংখ্য-বেদান্তাদি শাস্ত্রে মনস্তত্ত্ব ও আত্মতত্ত্বের যে সূক্ষানুসূক্ষ বিশ্লেষণ করিয়াছেন তাহা পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, 'ইচ্ছা-স্বাতন্ত্র্য' শব্দটিই একরূপ অর্থহীন । কারণ, ইচ্ছা মনের ধর্ম; মন বুদ্ধির দ্বারা চালিত হয়, মনবুদ্ধি প্রকৃতিরই পরিণাম এবং প্রকৃতির গুণানুসারেই বিভিন্ন হয়, সুতরাং ইচ্ছাও সর্বদাই প্রকৃতির অধীন - উহার স্বাতন্ত্র্য নাই । উহার স্বাতন্ত্র্য তখনই হয়, যখন জীব ত্রিগুণাতীত বা নিত্যসত্ত্বস্থ হয়, অর্থাৎ জীবের স্বাতন্ত্র্য-ইচ্ছা থাকে না, যখন জীবের ইচ্ছা এবং ঈশ্বরেচ্ছা এক হইয়া যায় - প্রকৃতপক্ষে উহা আত্ম-স্বাতন্ত্র্য, 'ইচ্ছা-স্বাতন্ত্র্য' নহে । এই হেতুই গীতায় মিশ্র-সাত্ত্বিক বুদ্ধিকেও বন্ধনের কারণ বলা হইয়াছে ।

৬৪,৬৬) সর্বধর্মত্যাগ করিয়া আমার শরণ লও (শরণাগতি)

অর্জুনের মোহ অপসারণার্থে শ্রীভগবান্‌ এ পর্যন্ত কর্মজ্ঞান-ভক্তিমিশ্র অপূর্ব যোগধর্মের উপদেশ প্রদান করিলেন । পরিশেষে সর্বগুহ্যতম এই সারকথাটি বলিয়া দিলেন - শ্রুতি, স্মৃতি বা লোকাচারমূলক নানা ধর্মের নানারূপ বিধিনিষেধের দাসত্ব ত্যাগ করিয়া (abandoning all rules of conduct - Aurobindo) তুমি সর্বতোভাবে আমার শরণ লও, আমার কর্মবোধে যথাপ্রাপ্ত কর্তব্য কর্ম করিয়া যাও, তোমাত কোন ভয় নাই, আমিই তোমাকে সর্বপাপ হইতে মুক্ত করিব । ইহাই গীতায় শ্রীভগবানের অভয়বাণী, ইহাই ভক্তমার্গের সারকথা । ইহারই নাম ভগবৎ-শরণাগতি বা আত্মসমর্পণ-যোগ । ভক্তিশাস্ত্রে শরণাগতির ষড়্‌বিধ লক্ষণ বর্ণিত আছে - (i) শ্রীভগবানের প্রীতিজনক কার্যে প্রবৃত্তি, (ii) প্রতিকূল কার্য হইতে নিবৃত্তি, (iii) তিনি রক্ষা করিবেন বলিয়া দৃঢ় বিশ্বাস, (iv) রক্ষাকর্তা বলিয়া তাঁহাকেই বরণ, (v) তাঁহাতে সম্পূর্ণ আত্ম-সমর্পণ, (vi) 'রক্ষা কর' বলিয়া দৈন্য ও আর্তি প্রকাশ ।

৬৭) শুশ্রূষা শব্দের দুই অর্থ - (i) শ্রবণের ইচ্ছা, (ii) পরিচর্যা, সেবা । এস্থলে যে কোন অর্থ গ্রহণ করা যায় ।

৭৮) এস্থলে "যোগেশ্বর ও ধনুর্ধর" এই বিশেষণের সার্থকতা লক্ষ করিবার বিষয় । যুক্তি ও শক্তি মিলিত হইলেই কার্য-সফলতা সম্ভবপর, নচেৎ কেবল বলে বা কেবল বুদ্ধিদ্বারা কৃতকার্য হওয়া যায় না, উদাহরণ জরাসন্ধ-বধ ।

___________________________
*Hard Copy Source:

"Sri Gita" or "Srimadbhagabadgeeta" by Gitashastri Jagadish Chandra Ghosh & Anil Chandra Ghosh. 26th Edition - June 1997 (1st Edition, 1925 from Dhaka now in Bangladesh). Published by Subhadra Dey (Ghosh), Presidency Library, 15 Bankim Chatterjee Street, Kolkata-700073. Printed by Web Impressions Pvt.Ltd., 34/2 Beadon Street, Kolkata-700006.



Disclaimer: This site is not officially related to Presidency Library, Kolkata. This is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

Monday, August 18, 2014

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : অষ্টাদশ অধ্যায় – মোক্ষযোগ (Gita : Chapter 18)

১|২|৩|৪|৫|৬|৭|৮|৯|১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
 (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)*
 
[এই অধ্যায়ে সমস্ত গীতাশাস্ত্রার্থের উপসংহারপূর্বক সমগ্র বেদার্থ বলা হইতেছে ।]

অর্জুন বলিলেন -
হে মহাবাহো, হে হৃষিকেশ, হে কেশিনিষূদন, আমি সন্ন্যাস-শব্দের ও ত্যাগ-শব্দের তত্ত্ব (অর্থ) পৃথকভাবে জানিতে ইচ্ছা করি । ১

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
স্বর্গাদি ফলপ্রদ অশ্বমেধাদি কাম্য কর্মের পরিত্যাগকেই (অনুষ্ঠানকেই) পণ্ডিতগণের কেহ কেহ সন্ন্যাস বলিয়া জানেন । যে সকল নিত্য বা নৈমিত্তিক কর্ম অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে, তাহাদের যে ফল অনুষ্ঠাতার হইবার সম্ভাবনা আছে, সেই ফলের আকাঙ্ক্ষা-পরিত্যাগকে জ্ঞানিগণ ত্যাগ বলিয়া থাকেন । ২

[ত্যাগ ও সন্ন্যাস শব্দের 'পরিত্যাগ'রূপ যে অর্থ, তাহা একই; ঘট ও পট শব্দের অর্থের ন্যায় বিভিন্ন নহে । এই অভিপ্রায়ে বলিতেছেন -]

সাংখ্যবাদিগণ বলেন - কর্মমাত্রই বন্ধনের কারণ । অতএব সকলেরই সর্ব কর্ম ত্যাগ করা উচিত । কিন্তু মীমাংসকগণ বলেন - যজ্ঞ, দান ও তপস্যারূপ বিহিত কর্ম কাহারও পক্ষে ত্যাগ করা উচিত নয় । কারণ, বিহিত কর্মত্যাগে প্রত্যবায় হয় । ৩

হে ভরতশ্রেষ্ঠ, সেই ত্যাগ ও সন্ন্যাসরূপ বিকল্প বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত শ্রবণ কর । হে পুরুষব্যাঘ্র, ত্যাগ-ও সন্ন্যাস-শব্দবাচ্য যে অর্থ, তাহা তামসাদিভেদে শাস্ত্রে ত্রিবিধ কথিত হইয়াছে । ৪

যজ্ঞ-দান-ও তপস্যারূপ কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় । এই সকল কর্ম করাই উচিত । কারণ, ইহারা ফলাকাঙ্ক্ষাত্যাগী মনীষিগণের চিত্তশুদ্ধিকারক । ৫

হে পার্থ, ফলকামনাপূর্বক অনুষ্ঠিত যজ্ঞাদি কর্মবন্ধনের কারণ হইলেও আসক্তি ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া এই সকল কর্ম অবশ্য কর্তব্য । ইহাই আমার নিশ্চিত ও উত্তম মত । ৬

অবশ্যকর্তব্য নিত্যকর্ম ত্যাগ করা উচিত নয় । কারণ, নিত্যকর্ম চিত্তশুদ্ধিকর । অজ্ঞানবশতঃ নিত্যকর্ম ত্যাগ করাকে তামস ত্যাগ বলে । ৭

কর্ম দুঃখকর মনে করিয়া যিনি দৈহিক ক্লেশের ভয়ে কর্ম ত্যাগ করেন - তিনি এই রাজসিক ত্যাগ করিয়া জ্ঞানসংযুক্ত সর্বকর্মত্যাগের মোক্ষফল লাভ করিতে পারেন না । ৮

হে অর্জুন, কর্তৃত্বাভিনিবেশরূপ আসক্তি ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া কেবল কর্তব্যবোধে যে বিহিত কর্ম অনুষ্ঠিত হয়, কর্মাসক্তি ও কর্মফলের সেই ত্যাগকে সাত্ত্বিক ত্যাগ বলে । ৯

কর্মে আসক্তি ও কর্মফল ত্যাগপূর্বক নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠাতা যখন আত্মা ও অনাত্মার বিবেকের কারণ যে সত্ত্বগুণ, তদ্‌যুক্ত হইয়া আত্মজ্ঞান লাভ করেন এবং অবিদ্যাকৃত সর্বসংশয় হইতে মুক্ত হন, অর্থাৎ আত্মস্বরূপে অবস্থানই মুক্তির একমাত্র উপায় - এইরূপ নিশ্চয়বুদ্ধি লাভ করেন, তখন তিনি কাম্য কর্মে দ্বেষ করেন না ও নিত্যকর্মে আসক্ত হন না । ১০

যেহেতু দেহাভিমানী ব্যক্তিগণ নিঃশেষরূপে সকল কর্ম ত্যাগ করিতে পারেন না, সেই জন্য যিনি কর্মফলে বাসনা ত্যাগ করেন, তিনি ত্যাগী বলিয়া কথিত হন । ১১

ধর্মাধর্মরূপ কর্মের দেবাদিজন্মরূপ ইষ্ট, পশ্বাদিজন্মরূপ অনিষ্ট ও মানবজন্মরূপ মিশ্র - এই তিন প্রকার ফল দেহাভিমানী আত্মজ্ঞানহীনদিগেরই হইয়া থাকে । কিন্তু দেহাত্মবুদ্ধিরহিত জ্ঞানীদিগের কোন কর্মফল ভোগ করিতে হয় না । ১২

হে মহাবাহো, কর্মকাণ্ডের অন্তরূপ বেদান্তে সর্বকর্ম সম্পাদনের এই পাঁচটি কারণ নিরূপিত হইয়াছে । এইগুলি আমার নিকট অবগত হও । ১৩

শরীর, অহঙ্কার এবং বুদ্ধি ও মন সহ সকল ইন্দ্রিয় (পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় ও পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়), প্রাণাদির বিবিধ কার্য এবং চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়ের আদিত্যাদি অধিষ্ঠাত্রী দেবতা - এই পাঁচটি সর্বকর্মের কারণ । ১৪

শরীর, মন ও বাক্য দ্বারা মানুষ যে সৎ বা অসৎ কর্ম করে, সেই সমস্ত কর্মেরই কারণ এই পাঁচটি । ১৫

যেহেতু দেহাদি পাঁচটি কারণের দ্বারাই কায়িক, বাচিক ও মানসিক সমস্ত কর্ম সম্পাদিত হয়, সেইজন্য যিনি শুদ্ধ অকর্তা আত্মাকে অসংস্কৃত বুদ্ধিহেতু অধিষ্ঠানাদি পঞ্চ কারণ দ্বারা ক্রিয়মাণ কর্মের কর্তা বলিয়া মনে করেন, সেই ভ্রান্তবুদ্ধি ব্যক্তি সম্যগ্‌-দর্শী নহেন, অর্থাৎ আত্মতত্ত্ব বা কর্মতত্ত্ব অবগত নহেন । ১৬

আমি কর্ত্তা এই অভিমান যাঁহার নাই এবং যাঁহার বুদ্ধি কর্মফলে লিপ্ত হয় না, তিনি জগতের সমস্ত প্রাণী হত্যা করিলেও হত্যাকারী হন না, বা হত্যাক্রিয়ার ফলে আবদ্ধ হন না । ১৭

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা সকল ক্রিয়ার ত্রিবিধ প্রবর্তক । কারণ, এই তিনটি একত্র হইলেই সকল ক্রিয়া আরম্ভ হয় । এবং করণ (ইন্দ্রিয়), কর্ম (ক্রিয়া) ও কর্তা (করণের প্রযোক্তা) - এই তিনটিতে সর্বক্রিয়া সংগৃহীত, সমবেত । অতএব আত্মা কোন কর্মের প্রবর্তক বা আশ্রয় নহেন । ১৮

[ক্রিয়া, কারক ও ফল সব ত্রিগুণাত্মকই । অতএব গুণানুসারে তাহাদের ভেদ ত্রিবিধই । ইহা নির্দিষ্ট হইতেছে ।]

কপিলের সাংখ্য-শাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম (ক্রিয়া) ও কর্তা - সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই ত্রিগুণভেদে তিন প্রকারই কথিত হইয়াছে । সেই সকল ও ত্রিগুণকৃত তাহাদের ভেদসমূহ যথাযথরূপে শ্রবণ কর । ১৯

যে জ্ঞান দ্বারা অব্যক্ত হইতে স্থাবর পর্যন্ত বহুধা বিভক্ত সর্বভূতে এক অবিভক্ত অক্ষর আত্মবস্তু দৃষ্ট হন, সেই অদ্বৈত আত্মদর্শনরূপ সম্যক্‌ জ্ঞানকে সাত্ত্বিক জ্ঞান বলে । ২০

কিন্তু যে জ্ঞান দ্বারা প্রতিদেহে পৃথগ্‌ভাবে অবস্থিত সকল প্রাণি-শরীরে পরস্পর বিলক্ষণ (সুখদুঃখাদিবৈলক্ষণ্যবশতঃ) ভিন্ন ভিন্ন আত্মার দর্শন হয়, তাহা রাজসিক জ্ঞান বলিয়া জানিবে । ২১

যে জ্ঞান দ্বারা কোন একটি দেহে বা প্রতিমাতে সম্পূর্ণ আত্মা বা ঈশ্বর আছেন - এইরূপ অভিনিবেশ হয়, সেই অযৌক্তিক, অযথার্থ এবং তুচ্ছ জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলে । ২২

ফলাভিলাষরহিত ব্যক্তি রাগ বা দ্বেষ বর্জনপূর্বক আসক্তিশূন্য হইয়া যাগ, দান ও হোমাদিরূপ যে নিত্যকর্ম করেন, তাহাকে সাত্ত্বিক কর্ম বলে । ২৩

এবং ফলকামনা বা অহঙ্কারযুক্ত হইয়া বহু কষ্টসাধ্য যে যাগাদি কর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, সেই সকল কর্ম রাজসিক বলিয়া কথিত হয় । ২৪

ভাবী শুভাশুভ ফল, ধনক্ষয় বা শক্তিক্ষয়, পরপীড়া ও স্বসামর্থ্য বিচার না করিয়া অবিবেকবশতঃ যে যাগাদি কর্ম করা হয়, তাহা তামসিক বলিয়া উক্ত হয় । ২৫

ফলে অনাসক্ত, কর্তৃত্বাভিমানরহিত, ধৃতিশীল ও উদ্যমযুক্ত, ক্রিয়মাণ কর্মের সিদ্ধিতে হর্ষহীন বা অসিদ্ধিতে বিষাদশূন্য কর্তা সাত্ত্বিক বলিয়া কথিত হন । ২৬

বাসনাকুল-চিত্ত, কর্মফলাকাঙ্ক্ষী, পরদ্রব্যে লোভী এবং তীর্থাদিতে স্বীয়দ্রব্যদানে অনিচ্ছুক, পরপীড়ক, বাহ্যান্তর-শৌচহীন, ইষ্টপ্রাপ্তিতে হর্ষযুক্ত এবং অনিষ্টপ্রাপ্তিতে ও ইষ্টবিয়োগে শোকযুক্ত কর্তা রাজসিক বলিয়া কথিত হন । ২৭

বিষয়-বিক্ষিপ্ত-চিত্তহেতু অসমাহিত, বালকবৎ অত্যন্ত অসংস্কৃতবুদ্ধি, অনম্র, বঞ্চক, স্বার্থবশতঃ পরবৃত্তিচ্ছেদনকারী, কর্তব্যে প্রবৃত্তিহীন, সদা অবসন্নস্বভাব ও দীর্ঘসূত্রী কর্তা তামস বলিয়া কথিত হন । ২৮

হে ধনঞ্জয়, সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণানুসারে বুদ্ধি ও ধৃতির তিন প্রকার ভেদ পৃথক্‌ পৃথগ্‌ভাবে নিঃশেষে বলিতেছি শ্রবণ কর । ২৯

হে পার্থ, প্রবৃত্তিমার্গ ও নিবৃত্তিমার্গ, কর্তব্য (বিহিত কর্ম) ও অকর্তব্য (নিষিদ্ধ কর্ম), ভয়ের কারণ - সংসারপ্রসূ অজ্ঞান এবং অভয়ের কারণ - সংসারনাশক জ্ঞান, সহেতুক বন্ধন এবং সহেতুক মোক্ষ - এই সকল বিষয় যে বুদ্ধির দ্বারা জানা যায়, তাহা সাত্ত্বিক বুদ্ধি । ৩০

হে পার্থ, যে বুদ্ধি দ্বারা শাস্ত্রবিহিত ও শাস্ত্রনিষিদ্ধ কর্ম এবং কর্তব্য ও অকর্তব্য যথাযথরূপে (সম্পূর্ণ নির্ণয়পূর্বক, নিঃসন্দেহরূপে) জানিতে পারা যায় না, তাহা রাজসিক বুদ্ধি । ৩১

হে পার্থ, যে বুদ্ধি তমোগুণে আচ্ছন্ন হইয়া অধর্মকে ধর্ম মনে করে এবং সকল বিষয় বিপরীতভাবে বোঝে তাহা তামসিক বুদ্ধি । ৩২

হে পার্থ, ব্রহ্মে নিত্যসমাধি-অনুগতা ধৃতি দ্বারা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াসমূহ শাস্ত্রমার্গে বিধৃত হয়, ইহাই যোগের দ্বারা ধৃতি । এই প্রকার ধৃতিই সাত্ত্বিকী । ৩৩

হে পার্থ, মনুষ্য যে ধৃতি দ্বারা ধর্ম, অর্থ ও কামকে নিত্য কর্তব্যরূপে অবধারণ করে এবং উক্ত ধর্মাদিসম্পাদনকালে কর্তৃত্বাদি-অভিনিবেশপূর্বক ফলাকাঙ্ক্ষী হয়, তাহা রাজসিক ধৃতি । ৩৪

হে পার্থ, দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি যে ধৃতি দ্বারা নিদ্রা, ভয়, প্রিয়বিয়োগনিমিত্ত শোক, অবসাদ ও মদ পরিত্যাগ করে না, তাহাদিগকে ধারণ করিয়া থাকে, তাহা তামসিক ধৃতি । ৩৫

[গুণভেদে ক্রিয়া ও কারক ত্রিবিধ বলিয়া এখন তাহাদের ফলের (সুখের) তিন প্রকার ভেদ বলিতেছেন -]

হে অর্জুন, এখন আমার নিকট ত্রিবিধ সুখের বিষয় শ্রবণ কর । যে সুখের দীর্ঘ অভ্যাস (অনুশীলন) দ্বারা মানুষ প্রীত ও পরিতৃপ্ত হয় এবং যে সুখ প্রাপ্ত হইলে সব দুঃখ হইতে সম্যগ্‌রূপে মুক্ত হয় । ৩৬

এবং যে সুখ প্রথমে বিষতুল্য দুঃখাত্মক (জ্ঞান, বৈরাগ্য, ধ্যান ও সমাধি দ্বারা লভ্য বলিয়া প্রথমে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য ও দুঃখকর) কিন্তু শেষে (জ্ঞান ও বৈরাগ্যাদির পরিপাকে) অমৃততুল্য প্রীতিকর, আত্মনিষ্ঠ বুদ্ধির নির্মলতা হইতে উৎপন্ন, সেই সুখ সাত্ত্বিক সুখ বলিয়া কথিত হয় । ৩৭

শব্দাদি বিষয় ও শ্রোত্রাদি ইন্দ্রিয়ের সংযোগ হইতে যে সুখ উৎপন্ন হয়, তাহা প্রথমে অমৃতবৎ, কিন্তু পরিশেষে (বল, বীর্য, রূপ, প্রজ্ঞা, মেধা, ধন ও উৎসাহ নষ্ট করে বলিয়া) বিষতুল্য । সেই সুখ রাজসিক সুখ বলিয়া কথিত হয় । ৩৮

যে সুখ প্রথমে ও পরিণামে সৎ ও অসতের কারণ বুদ্ধির বিবেকশক্তি বিনাশ করে এবং যাহা নিদ্রা, আলস্য ও অনবধানতা হইতে উৎপন্ন হয়, তাহা তামসিক সুখ বলিয়া কথিত । ৩৯

পৃথিবীতে বা স্বর্গে এমন কোন প্রাণী (মনুষ্য বা দেবতা) বা বস্তু নাই, যাহা এই প্রকৃতিজাত ও বন্ধনের কারণ ত্রিগুণ হইতে মুক্ত । ৪০

[ক্রিয়া, কারক ও ফলরূপ সমস্ত সংসার ত্রিগুণাত্মক, অবিদ্যা-পরিকল্পিত ও অনর্থের কারণ । সংসার ত্রিগুণাত্মক, অতএব অনাদি বলিয়া সংসারের অনিবৃত্তির আশঙ্কা হইতে পারে । এইজন্য তাহার নিবৃত্তির উপায় বলিতেছেন এবং সর্ববেদার্থসার গীতাশাস্ত্রের উপসংহার করিতেছেন । পুরুষার্থকামীদের অনুষ্ঠেয় সমস্ত বেদ ও স্মৃতি-শাস্ত্রের অর্থ এখন প্রদর্শিত হইতেছে ।]

হে পরন্তপ, প্রকৃতিজাত (স্বভাবজাত) ত্রিগুণানুসারেই ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রেরও কর্মসমূহ পৃথক্‌ পৃথগ্‌রূপে বিভক্ত হইয়াছে । ৪১

বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরিন্দ্রিয়ের সংযম, কায়িক, বাচিক ও মানসিক তপস্যা; অন্তর্বহিঃ শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, শাস্ত্রজ্ঞান ও তত্ত্বানুভূতি এবং শাস্ত্রে ও ভগবানে বিশ্বাস - এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম । ৪২

পরাক্রম, তেজ, ধৃতি, কর্মকুশলতা, যুদ্ধে অপরাঙ্মুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও শাসনক্ষমতা - এইগুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত (স্বভাবজ সত্ত্বমিশ্র রজোগুণ দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম । ৪৩

কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য বৈশ্যের স্বভাবজাত (স্বভাবজ তমোমিশ্র রজোগুণ দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম । পরিচর্যা শূদ্রদিগের স্বভাবজাত (রজোমিশ্র তমোগুণের দ্বারা প্রবিভক্ত) কর্ম । ৪৪

[ব্রাহ্মণাদি জাতিবিহিত এই সকল কর্ম সম্যগ্‌রূপে অনুষ্ঠিত হইলে স্বভাবতঃ স্বর্গরূপ ফলপ্রাপ্তি হয় । কিন্তু স্ব স্ব কর্ম নিষ্কামভাবে অনুষ্ঠিত হইলে কি প্রকারে সিদ্ধিপ্রাপ্তি হয়, তাহাই বলিতেছেন -]

মানুষ নিজ নিজ বর্ণ ও আশ্রমের কর্মে নিরত হইয়া জ্ঞাননিষ্ঠাযোগ্যতারূপ সিদ্ধিলাভ করে । স্বীয় কর্মে তৎপর মানুষ কিরূপে সিদ্ধিলাভ করে তাহা শ্রবণ কর । ৪৫

যে সর্বান্তর্যামী পরমেশ্বর হইতে প্রাণিগণের উৎপত্তি বা কর্মচেষ্টা, যিনি এই সমগ্র বিশ্বে ব্যাপ্ত আছেন, তাঁহাকে মানুষ স্বীয় বর্ণাশ্রমের কর্ম দ্বারা অর্চনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করে । ৪৬

অতএব, স্বীয় বর্ণ ও আশ্রমবিহিত ধর্ম অঙ্গহীনভাবে অনুষ্ঠিত হইলেও সম্যগ্‌রূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ । কারণ, স্বভাবনিয়ত (স্বভাবজ) কর্ম করিলে মানুষ পাপভাগী হয় না । ৪৭

হে কুন্তীপুত্র, দোষযুক্ত হইলেও জন্মনির্দিষ্ট কর্ম (স্বধর্ম) ত্যাগ করা উচিত নয় । কারণ, অগ্নি যেমন ধুমে আচ্ছন্ন হয়, সেইরূপ স্বধর্ম বা পরধর্ম সকল কর্মই ত্রিগুণাত্মক বলিয়া দোষযুক্ত হয় । ৪৮

সকল বিষয়ে অনাসক্ত, সংযতচিত্ত এবং দেহ ও জীবনে ভোগস্পৃহাশূন্য আত্মজ্ঞ ব্যক্তি সম্যগ্‌দর্শন (ব্রহ্মজ্ঞানলাভ) দ্বারা বা তৎপূর্বক সর্বকর্মসন্ন্যাসের দ্বারা নিষ্ক্রিয় আত্মস্বরূপে অবস্থানরূপ (পূর্বোক্ত কর্মজাত সিদ্ধি অপেক্ষা বিলক্ষণ) প্রকৃষ্ট সিদ্ধি (সদ্যোমুক্তি) লাভ করেন । ৪৯

[এখন গীতার নানাস্থানে বর্ণিত জ্ঞাননিষ্ঠার উপসংহারপূর্বক স্বকর্ম দ্বারা ঈশ্বরার্চনজনিত সিদ্ধিপ্রাপ্ত উৎপন্নাত্মবিবেকজ্ঞান ব্যক্তির কেবল আত্মজ্ঞাননিষ্ঠারূপ নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি ক্রমে হয়, ইহা বলা হইতেছে ।]

হে কৌন্তেয়, এইরূপ সিদ্ধিপ্রাপ্ত ব্যক্তির (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শুদ্রের) জ্ঞাননিষ্ঠাক্রমে ব্রহ্মজ্ঞানের পরমনিষ্ঠা বা পরিসমাপ্তিরূপ ব্রহ্মপ্রাপ্তি হয় । জ্ঞাননিষ্ঠার উক্ত প্রাপ্তিক্রম সংক্ষেপে আমার নিকট শ্রবণ কর । ৫০

আত্মাকে ব্রহ্মরূপে নিশ্চয়পূর্বক সংশয়-ও বিপর্যয়শূন্য বুদ্ধিযুক্ত হইয়া, ধৈর্যের সহিত শরীর ও ইন্দ্রিয় বশীভূত করিয়া, শরীর স্থিতির জন্য মাত্র যাহা প্রয়োজন তদ্‌ব্যতিরিক্ত শব্দাদি বিষয় পরিত্যাগপূর্বক, শরীরস্থিতির উপযোগী বিষয়েও আসক্তি ও দ্বেষ বর্জন করিয়া - ৫১

নির্জন স্থানে অবস্থান ও পরিমিত আহার করিয়া বাক্য, শরীর ও মন সংযত করিয়া, নিত্য (নিরবিচ্ছিন্ন তৈলধারাবৎ) ধ্যাননিষ্ঠা (আত্মস্বরূপচিন্তা) ও যোগপরায়ণ (আত্মবিষয়ে মনের একাগ্রীকরণ) হইয়া দৈহিক ও পারত্রিক সকল বিষয়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়া - ৫২

দেহেন্দ্রিয়াদিতে আত্মবুদ্ধি, কামরাগাদিযুক্ত বল, দর্প, কাম, ক্রোধ ও পরিগ্রহ (শরীরধারণপ্রসঙ্গে অথবা ধর্মানুষ্ঠানের জন্য অন্য দ্বারা আনীত সকল বস্তু) ত্যাগ করিয়া দেহে ও জীবনে মমতাবর্জিত এবং চিত্তবিক্ষেপশূন্য যতি এই জীবনেই ব্রহ্মজ্ঞানলাভে সমর্থ হন । ৫৩

এইক্রমে ব্রহ্মভূত ও অন্তরাত্মাতে আবির্ভূত আনন্দ প্রাপ্ত হইয়া যতি কোন বিষয়ে শোক করেন না এবং কিছুই আকাঙ্ক্ষাও করেন না । তিনি সর্বভূতের সুখ ও দুঃখ নিজের সুখ ও দুঃখের ন্যায় দর্শন করেন । এইরূপ জ্ঞাননিষ্ঠ ব্যক্তি মদ্বিষয়ক জ্ঞানরূপ উত্তম ভক্তিলাভ করেন । ৫৪

উক্ত জ্ঞানলক্ষণা ভক্তি দ্বারা তিনি আমাকে জানেন যে, আমি উপাধিকৃত ভেদবিশিষ্ট এবং স্বরূপতঃ নিরুপাধি, অদ্বিতীয় চৈতন্যমাত্র উত্তম পুরুষ । আমার এই তত্ত্ব অবগত হইবামাত্রই তিনি আমাতে প্রবেশ করেন । ৫৫

[পূর্বে বলা হইয়াছে যে, স্বকর্ম দ্বারা ভগবানের অর্চনা করিলে সিদ্ধিলাভ হয় । এখানে সেই ভগবদ্ভক্তিযোগের উপসংহার করা হইতেছে ।]

সকল প্রকার "আমি, আমার" ভাব আমাতে অর্পণ করিলে সর্বদা সমস্ত কর্ম করিয়াও ভক্ত আমার অনুগ্রহে সনাতন অক্ষয়স্থান প্রাপ্ত হন । ৫৬

বিবেকবুদ্ধি দ্বারা ঐহিক ও পারত্রিক সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণপূর্বক মৎপরায়ণ হও এবং সিদ্ধিতে ও অসিদ্ধিতে হর্ষবিষাদশূন্যরূপ বুদ্ধিযোগ অবলম্বনপূর্বক আমাতে সর্বদা চিত্ত সমাহিত কর । ৫৭

আমাতে চিত্ত অর্পণ করিলে আমার অনুগ্রহে তুমি দুস্তর সংসার ও তাহার কারণসমূহ অতিক্রম করিবে । আর যদি তুমি পাণ্ডিত্যাভিমানবশতঃ; আমার কথা না শোন, তাহা হইলে তুমি পুরুষার্থের অযোগ্য হইবে । ৫৮

অহংকারকে আশ্রয় করিয়া 'যুদ্ধ করিব না' এইরূপ যাহা মনে করিতেছ, তোমার এই নিশ্চয় ভ্রমমূলক । কারণ, তোমার ক্ষাত্র স্বভাবই তোমাকে যুদ্ধে নিযুক্ত করিবে । ৫৯

হে কৌন্তেয়, অজ্ঞানবশতঃ যাহা করিতে ইচ্ছা করিতেছ না, স্বভাবজাত স্বীয় ক্ষত্রিয়োচিত কর্মে আবদ্ধ হইয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাহা করিবে । ৬০

হে অর্জুন, অন্তর্যামী নারায়ণ সর্বজীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হইয়া সর্বভূতকে যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার ন্যায় মায়া দ্বারা চালিত করিতেছেন । ৬১

হে ভারত, সংসারার্তিনাশের জন্য তুমি চিন্তা, বাক্য ও কর্মের দ্বারা সর্বতোভাবে তাঁহারই শরণাগত হও । তাঁহার প্রসাদে তুমি পরম শান্তি ও শাশ্বত পদ লাভ করিবে । ৬২

আমি সর্বজ্ঞ ঈশ্বর । আমি তোমার নিকট গুহ্য হইতে গুহ্যতর গীতাশাস্ত্ররূপ পরম জ্ঞান বলিলাম । তুমি ইহা নিঃশেষরূপে বিচার করিয়া যাহা ইচ্ছা হয় তাহাই অনুষ্ঠান কর । ৬৩

তুমি সর্বদা আমার অত্যন্ত প্রিয় । এইজন্য তোমার হিতকর, সর্বাপেক্ষা গুহ্য এবং সর্বহিতের শ্রেষ্ঠ আমার উৎকৃষ্ট বাক্য পূর্বে অনেকবার বলা হইলেও পুনরায় বলিতেছি । ইহার দ্বারা তোমার পরমপুরুষার্থ লাভ হইবে । সুতরাং ইহা শ্রবণ কর । ৬৪

তুমি আমাতে চিত্ত স্থির কর । আমার ভজনশীল ও পূজনশীল হও এবং আমাকে নমস্কার কর । তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় । এইজন্য আমি সত্য প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে এইরূপেই তুমি আমাকে প্রাপ্ত হইবে । ৬৫

[কর্মযোগনিষ্ঠার পরম রহস্যের (ভগবৎশরণতার) উপদেশ উপসংহার করিয়া সন্ন্যাসের ফল সর্ববেদান্তবিহিত সম্যগ্‌দর্শন বলিতেছেন -]

সকল ধর্মাধর্মের অনুষ্ঠান পরিত্যাগপূর্বক গর্ভ, জন্ম, জরা ও মৃত্যুবর্জিত পরমেশ্বররূপ একমাত্র আমার শরণাগত হও । আমা হইতে অতিরিক্ত কোন বস্তুই নাই, এইরূপ দৃঢ়নিশ্চয় হইয়া আমাকে সদা স্মরণ কর । তুমি এইরূপ নিশ্চিতবুদ্ধিযুক্ত ও স্মরণশীল হইলে তোমার নিকট আমি স্বাত্মভাব প্রকটিত করিয়া সকল ধর্মাধর্ম বন্ধনরূপ পাপ হইতে তোমাকে মুক্ত করিব । অতএব, শোক করিও না । ৬৬

[শ্রীভগবান্‌ শাস্ত্র-সম্প্রদায়ের বিধি বলিতেছেন -]

সংসার-নিবৃত্তির জন্য তোমাকে উপদিষ্ট এই গীতাশাস্ত্র তপস্যাহীন ব্যক্তিকে বলিবে না । তপস্বী হইলেও গুরু ও ঈশ্বরে ভক্তিরহিত ব্যক্তিকে কখনও ইহা বলিবে না । ভক্ত ও তপস্বী হইলেও শ্রবণেচ্ছু না হইলে ইহা কাহাকেও বলিবে না । আমি ভগবান্‌ বাসুদেব । আমাকে প্রাকৃত মানুষ মনে করিয়া আত্মপ্রশংসাদি দোষ আমাতে অধ্যারোপপূর্বক অজ্ঞানবশতঃ যিনি আমার ঈশ্বরত্বে (অবতারত্বে) অবিশ্বাসী, তাঁহাকেও উহা বলিবে না । কেবলমাত্র ভগবানে অসূয়াশূন্য, তপস্বী, ভক্ত ও শুশ্রূষু ব্যক্তিকেই এই গীতাশাস্ত্র বলিবে । ৬৭

এই গীতা পাঠ ও ব্যাখ্যা দ্বারা আমি ভগবানের শুশ্রূষা করিতেছি - এই জ্ঞানে যিনি এই পরম গুহ্য গীতাশাস্ত্র আমার ভক্তের নিকট পাঠ ও ব্যাখ্যা করিবেন, তিনি পরা ভক্তি লাভ করিয়া আমাকে প্রাপ্ত হইবেনই, ইহাতে সন্দেহ নাই । ৬৮

মনুষ্যগণের মধ্যে গীতাব্যাখ্যাতা অপেক্ষা আমার অধিক প্রিয় এ জগতে কেহ নাই এবং আর কেহ হইবেও না । ৬৯

এবং যে ব্যক্তি আমাদের উভয়ের এই ধর্মজনক সংবাদরূপ গ্রন্থ অধ্যয়ন করিবেন, তাঁহার সেই জ্ঞানযজ্ঞের দ্বারা আমি পূজিত হইব, ইহা নিশ্চয় জানিবে । ৭০

যিনি শ্রদ্ধালু অসূয়াশূন্য হইয়া অর্থবোধ না হইলেও এই গীতা শ্রবণ করেন, তিনিও পাপমুক্ত হইয়া অগ্নিহোত্রাদি পুণ্যকারিগণের প্রাপ্য পুণ্যলোক লাভ করেন । ৭১

[শিষ্যের শাস্ত্রার্থগ্রহণ হইয়াছে কি না জানিতে ইচ্ছা করিয়া শ্রীভগবান্‌ জিজ্ঞাসা করিতেছেন । অভিপ্রায় এই যে, না বুঝিয়া থাকিলে পুনর্বার বুঝাইবেন । পুনঃপুনঃ যত্ন করিয়াও শিষ্যকে কৃতার্থ করা উচিত, এই আচার্যধর্ম এখানে প্রদর্শিত হইতেছে ।]

হে পার্থ, তুমি কি একাগ্রচিত্তে এই গীতাশাস্ত্র শুনিয়াছ ? হে ধনঞ্জয়, এই শ্রবণের ফলে তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ কি বিনষ্ট হইয়াছে ? ৭২

[ভগবদনুগ্রহজনিত স্বকীয় কৃতার্থতা জ্ঞাপনার্থ] অর্জুন বলিলেন - হে অচ্যুত, আপনার প্রসাদে আমার মোহ ও অজ্ঞান নষ্ট হইয়াছে এবং পরমাত্মবিষয়ক ধ্রুবা স্মৃতি লাভ হইয়াছে । আমি নিঃসংশয় হইয়া অবস্থিত, এখন আপনার উপদেশ পালন করিব; আমার অন্য কোন কর্তব্য নাই । ৭৩

সঞ্জয় বলিলেন -
আমি এইরূপে ভগবান্‌ বাসুদেব ও অর্জুনের এই রোমাঞ্চকর অদ্ভুত কথোপকথন শ্রবণ করিলাম । ৭৪

আমি ব্যাস-প্রসাদে লব্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা এই পরম গুহ্য যোগ যোগেশ্বর স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখ হইতে সাক্ষাৎ (পরম্পরারূপে নহে) শ্রবণ করিয়াছি । ৭৫

হে রাজা ধৃতরাষ্ট্র, শ্রীকৃষ্ণার্জুনের এই পুণ্য অদ্ভুত কথোপকথন পুনঃপুনঃ স্মরণ করিয়া আমি মুহুর্মূহুঃ রোমাঞ্চিত ও আনন্দিত হইতেছি । ৭৬

হে মহারাজ, ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণের সেই অত্যদ্ভুত বিশ্বরূপ বারবার স্মরণ করিয়া আমার মহাবিস্ময় হইতেছে এবং আমি পুনঃপুনঃ হৃষ্ট হইতেছি । ৭৭

যে পক্ষে ভগবান্‌ শ্রীকৃষ্ণ এবং গাণ্ডীবধারী অর্জুন, সেই পাণ্ডব পক্ষে রাজ্যশ্রী, বিজয়, অভ্যুদয় ও অব্যভিচারিণী নীতি বিরাজ করে, ইহা আমার নিশ্চিত অভিমত । ৭৮

ভগবান্ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে মোক্ষযোগ নামক অষ্টাদশ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________


৬) আসক্তি ও ফলাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগপূর্বক মুমুক্ষু ব্যক্তি নিত্যকর্ম করিলে এই সমস্ত কর্ম চিত্তশুদ্ধিকর হয়, বন্ধনের কারণ হয় না ।

৭) নিত্যকর্ম অবশ্য কর্তব্য - ইহা না জানাই অজ্ঞান ।

১০) মেধা = আত্মজ্ঞানলক্ষণা প্রজ্ঞা
দ্বেষ : দেহোৎপত্ত দ্বারা কাম্য কর্ম সংসারের কারণ হয় । অতএব, ইহা দ্বারা আমার কি লাভ হইবে - এইরূপে দ্বেষ করেন না ।
আসক্ত : চিত্তশুদ্ধি ও জ্ঞানোৎপত্তি দ্বারা নিত্যকর্ম মোক্ষের কারণ বলিয়া তাহাতেও আসক্ত (প্রীতিযুক্ত) হন না । 

১১) কর্মফলের অনুষ্ঠাতা কর্মফলে বাসনা ত্যাগ করিয়া ক্রমে জ্ঞাননিষ্ঠা প্রাপ্ত হন । এই শ্লোকটি অজ্ঞানীর কর্মফলত্যাগের স্তুতির জন্য; জ্ঞানীর সর্বকর্ম-সন্ন্যাসের নিষেধক নহে ।

১৬) ভ্রান্তবুদ্ধি ব্যক্তি আত্মাকে ক্রিয়মান কর্মের কর্তা বলিয়া মনে করেন : যেমন তৈমিরিক রোগী এক চন্দ্রকে অনেক বলিয়া দেখেন, যেমন গতিশীল মেঘের মধ্যে চন্দ্রকে লোকে গতিমান মনে করে, বা যেমন ভ্রান্ত ব্যক্তি স্বয়ং বাহনে বসিয়া অন্য বাহনের গতিকালে নিজেকে গতিমান বিবেচনা করেন, সেইরূপ ।

১৭) অভিমান : অবিদ্যা দ্বারা আত্মাতে কল্পিত অধিষ্ঠানাদিই সরবকর্মের কারক । লৌকিক দৃষ্টিতে তিনি হন্তা, কিন্তু পারমার্থিক দৃষ্টিতে তিনি হন্তা নহেন ।

পারমার্থিক দৃষ্টি = 'আমি কর্তা নহি', 'আমি তাহাদের ব্যাপারের সাক্ষিস্বরূপ শুদ্ধ নিষ্ক্রিয় আত্মা' - এই প্রকার দর্শন ।
লৌকিক দৃষ্টি = দেহাদিতে আত্মবুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তির দৃষ্টি ।

১৯) সাংখ্যদর্শন গুণবিষয়ে প্রমাণ । এই জন্য এখানে সাংখ্যের মত উদাহৃত হইল ।

২০) সাত্ত্বিক জ্ঞান সংসার-উচ্ছেদের কারণ । রাজসিক ও তামসিক জ্ঞান সংসারনিবৃত্তির কারণ নহে । অতএব সাত্ত্বিক গ্রহণ এবং রাজসিক ও তামসিক বর্জন, ইহাই ভগবানের অভিপ্রায় ।

২২) তামসিক জ্ঞান : এই দেহে সম্পূর্ণ আত্মা আছেন, আত্মা দেহ-পরিমাণমাত্র এবং এই প্রতিমাতে সম্পূর্ণ ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বর বিগ্রহপরিমাণ, ইহার বাহিরে নাই - এইরূপ জ্ঞান ।

তুচ্ছ : এই তামসিক জ্ঞানের ফল অল্প বা বিষয় অল্প ।

২৪) অহঙ্কার : আমার সমান শ্রোত্রিয় অন্য কেহ নাই ।

২৫) স্বসামর্থ্য : এই কর্ম করিতে আমি সমর্থ কি না, ইহা বিচার না করিয়া ।

২৮) দীর্ঘসূত্রী = অদ্যকর্তব্য এক মাসেও যিনি করেন না
 
৩৫) মদ : বিষয়-সেবাকে উত্তম মনে করা ।

৩৭) নির্মলতা = জলবৎ স্বচ্ছতা
 
৪০) প্রকৃতিজাত : সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের সাম্যাবস্থাই প্রকৃতি । এই গুণত্রয় সৃষ্টিকালে বৈষম্যাবস্থা প্রাপ্ত হয়, তখন তাহাদিগকে প্রকৃতি হইতে জাত বলা হয় ।
 
৪৫) স্বর্গরূপ ফলপ্রাপ্তি : স্বকর্মনিষ্ঠ বর্ণিগণ ও আশ্রমিগণ মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে পুণ্য ফল ভোগ করিয়া অবশিষ্ট সঞ্চিত কর্মের সহিত বিশিষ্ট দেশ, জাতি, কুল, ধর্ম, আয়ু, বিদ্যা, শীল, সম্পদ, সুখ ও মেধা লইয়া জন্মগ্রহণ করেন ।

৪৬) কেবল যে বর্ণাশ্রমের কর্ম দ্বারাই সিদ্ধিলাভ হয়, বর্ণাশ্রমবিহীনদিগের সিদ্ধিলাভ হয় না, এমন নহে । আর্য, অনার্য, স্ত্রীপুরুষ সকলেরই আত্মজ্ঞানে বা ব্রহ্মবিদ্যায় অধিকার আছে । রৈক্ক, বাচক্লবী, সংবর্ত প্রভৃতি বর্ণাশ্রমরহিত হইয়াও সিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন । জন্মান্তর-সঞ্চিত সংস্কার-বিশেষের দ্বারাও সিদ্ধিলাভ হয় । - [গীঃ, ৬|৪৫ ও বেদান্তসূত্র, ৩|৪|৩৬-৩৯]

ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ । ধীবিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষনম্‌ ।।
অর্থাৎ ধৃতি, ক্ষমা, দম, অস্তেয়, শৌচ, ইন্দ্রিয়সংযম, ধী (সম্যগ্‌ জ্ঞান, প্রতিপক্ষ ও সংশয়াদি নিরাকরণ), বিদ্যা (আত্মজ্ঞান), সত্য ও অক্রোধ - এই দশটি সাধারণ ধর্মাচরণের দ্বারা সকলেরই শ্রেয়ঃ লাভ হয় । - [মনুসংহিতা, ৬|৯২, মেধাতিথিকৃত ভাষ্য]

৪৯) প্রকৃষ্ট সিদ্ধি : ইহাই শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাসী পরমহংসের অবস্থা বা পরমহংসচর্যা । - [শ্রীধরস্বামী]
   
৫৫)  আমার এই তত্ত্ব অবগত হইবামাত্রই তিনি আমাতে প্রবেশ করেন : এইস্থানে জ্ঞানক্রিয়া ও প্রবেশক্রিয়া একার্থ । দুইয়ের মধ্যে কোন ব্যবধান নাই । -[ভাষ্যোৎকর্ষদীপিকা]

৬১) অন্তর্যামী : 'যিনি পৃথিবীর অন্তরে বর্তমান, পৃথিবীদেবতা যাঁহাকে জানেন না, পৃথিবীদেবতার শরীর যাঁহার শরীর, যিনি পৃথিবীদেবতাদের অন্তরে থাকিয়া পৃথিবীদেবতাকে নিয়মিত করেন, ইনিই অমৃতস্বরূপ অন্তর্যামী তোমার ও সর্বপ্রাণীর আত্মা । - [বৃহ উপঃ, ৩|৭|৩]

৬৬) সর্বধর্ম = বর্ণধর্ম, আশ্রমধর্ম ও সামান্য-ধর্ম প্রভৃতি সকল প্রকার ধর্ম । - [শ্রীমধুসূদন]
অধর্ম (পাপকর্ম) হইতে নিবৃত্ত, উপরত ও সমাহিত এবং প্রশান্তচিত্ত না হইলে কেবল প্রজ্ঞান দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ হয় না । - [কঠ উপঃ,১|২|২৪]
ধর্মাধর্মে অভিমানী ব্যক্তির এই জ্ঞান লাভ হয় না । - [মহাভারত, অশ্বমেধপর্ব, ১৯|৭]
 
৭৩) ধ্রুবা স্মৃতি : অজ্ঞানমোহনাশ ও আত্মস্মৃতিলাভ - ইহাই সর্বশাস্ত্রার্থজ্ঞানের ফল । আহার শুদ্ধ হইলে সত্ত্বশুদ্ধি হয়, সত্ত্বশুদ্ধি হইলে ধ্রুবা স্মৃতি উদিত হয় এবং ধ্রুবা স্মৃতি লাভ হইলে হৃদয়ের সর্বগ্রন্থি ছিন্ন হয় । - [ছান্দোগ্য উপঃ, ৭|২৬|২]
_________________________________________
সপ্তশতশ্লোকময়ী শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অনুবাদ (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ কর্তৃক অনুদিত এবং স্বামী জগদানন্দ কর্তৃক সম্পাদিত) সমাপ্ত ।
ওঁ তৎ সৎ
_________________________________________

*Hard Copy Source:
"Srimadbhagabadgeeta" translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint - January, 1997 (1st Edition - 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation

Disclaimer:
This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. This is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>