Showing posts with label Gita-15. Show all posts
Showing posts with label Gita-15. Show all posts

Friday, March 13, 2015

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা : পঞ্চদশ অধ্যায় - পুরুষোত্তমযোগ (15-Jagadishchandra)


|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
(গীতাশাস্ত্রী জগদীশচন্দ্র ঘোষ)*

শ্রীভগবান্‌ বললেন -
(বেদবিদ্‌গণ) বলিয়া থাকেন যে, (সংসাররূপ) অশ্বত্থের মূল ঊর্দ্ধদিকে এবং শাখাসমূহ অধোগামী; উহা অবিনাশী; বেদসমূহ উহার পত্রস্বরূপ; যিনি এই অশ্বত্থকে জানেন তিনিই বেদবিৎ । ১

সত্ত্বাদিগুণের দ্বারা বিশেষরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, বিষয়রূপ তরুণপল্লব-বিশিষ্ট উহার শাখাসকল অধোভাগে ও ঊর্ধ্বভাগে বিস্তৃত; উহার (বাসনারূপ) মূলসহ মনুষ্যলোকে অধোভাগে বিস্তৃত রহিয়াছে । ঐ মূলসমূহ ধর্মাধর্মরূপ কর্মের কারণ বা প্রসূতি । ২

এ সংসারে স্থিত জীবগণ সংসার-বৃক্ষের পূর্বোক্ত ঊর্দ্ধমূলাদি রূপ উপলব্ধি করিতে পারে না । সেইরূপ আদি, অন্ত এবং স্থিতিও উপলব্ধি করিতে পারে না । এই সুদৃঢ়মূল অশ্বত্থবৃক্ষকে তীব্র বৈরাগ্যরূপ শস্ত্রদ্বারা ছেদন করিয়া তৎপর যাঁহাকে প্রাপ্ত হইলে আর পুনর্জন্ম হয় না, যাঁহা হইতে এই সংসার-প্রবৃত্তির বিস্তার হইয়াছে, 'আমি সেই আদি পুরুষের শরণ লইতেছি' এই বলিয়া তাঁহার অন্বেষণ করিতে হইবে । ৩,৪

যাঁহাদের অভিমান ও মোহ নাই, যাঁহারা সংসার-আসক্তি জয় করিয়াছেন, যাঁহারা আত্মতত্ত্বে নিষ্ঠাবান্‌, যাঁহাদের কামনা নিবৃত্ত হইয়াছে, যাঁহারা সুখদুঃখ-সংজ্ঞক দ্বন্দ্ব হইতে মুক্ত, তাদৃশ বিবেকী পুরুষগণ সেই অব্যয় পদ প্রাপ্ত হন । ৫

যে পদ প্রাপ্ত হইলে সাধক আর সংসারে প্রত্যাবর্তন করেন না, যে পদ সূর্য, চন্দ্র বা অগ্নি প্রকাশ করিতে পারে না, তাহাই আমার পরম স্বরূপ । ৬

আমারই সনাতন অংশ জীব হইয়া প্রকৃতিতে অবস্থিত মন ও পাঁচ ইন্দ্রিয়কে সংসারে অর্থাৎ কর্মভূমিতে আকর্ষণ করিয়া থাকেন । ৭

যেমন বায়ু, পুষ্পাদি হইতে গন্ধবিশিষ্ট সূক্ষ কণাসমূহ লইয়া যায় তদ্রূপ যখন জীব এক দেহ পরিত্যাগ করিয়া অন্য দেহে প্রবেশ করেন, তখন এই সকলকে (এই পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও মনকে) সঙ্গে করিয়া লইয়া যান । ৮

জীবাত্মা কর্ণ, চক্ষু, ত্বক্‌, রসনা, নাসিকা এবং মনকে আশ্রয় করিয়া শব্দাদি বিষয়সকল ভোগ করিয়া থাকেন । ৯

জীব কিরূপে সত্ত্বাদি গুণসংযুক্ত হইয়া দেহে অবস্থিত থাকিয়া বিষয়সমূহ ভোগ করেন, অথবা কিরূপে দেহ হইতে উৎক্রান্ত হন, তাহা অজ্ঞ ব্যক্তিগণ দেখিতে পান না, কিন্তু জ্ঞানিগণ জ্ঞাননেত্রে দর্শন করিয়া থাকেন । ১০

সাধনে যত্নশীল যোগিগণ আপনাতে অবস্থিত এই আত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন, কিন্তু যাহারা অজিতেন্দ্রিয় ও অবিবেকী তাহারা যত্ন করিলেও ইঁহাকে দেখিতে পায় না । ১১

যে তেজ সূর্যে থাকিয়া সমস্ত জগৎ উদ্ভাসিত করে এবং যে তেজ চন্দ্রমা ও অগ্নিতে আছে, তাহা আমারই তেজ জানিবে । ১২

আমি পৃথিবীতে অনুপ্রবিষ্ট হইয়া স্বকীয় বলের দ্বারা ভূতগণকে ধারণ করিয়া আছি । আমি অমৃতরসযুক্ত চন্দ্ররূপ ধারণ করিয়া ব্রীহি যবাদি ওষধিগণকে পরিপুষ্ট করিয়া থাকি । ১৩

আমি বৈশ্বানর (জঠরাগ্নি) রূপে প্রাণিগণের দেহে অবস্থান করি এবং প্রাণ ও অপান বায়ুর সহিত মিলিয়া চর্ব্য চূষ্যাদি চতুর্বিধ খাদ্য পরিপাক করি । ১৪

আমি অন্তর্যামিরূপে সকল প্রাণীর হৃদয়ে অধিষ্ঠিত আছি, আমা হইতেই প্রাণিগণের স্মৃতি ও জ্ঞান উৎপন্ন হইয়া থাকে এবং আমা হইতেই স্মৃতি ও জ্ঞানের বিলোপও সাধিত হয়; আমিই বেদসমূহের একমাত্র জ্ঞাতব্য, আমিই আচার্যরূপে বেদান্তের অর্থ-প্রকাশক এবং আমিই বুদ্ধিতে অধিষ্ঠিত থাকিয়া বেদার্থ পরিজ্ঞাত হই । ১৫

ক্ষর ও অক্ষর দুই পুরুষ ইহলোকে প্রসিদ্ধ আছে । তন্মধ্যে সর্বভূত ক্ষর পুরুষ এবং কূটস্থ অক্ষর পুরুষ বলিয়া কথিত হন । ১৬

অন্য এক উত্তম পুরুষ পরমাত্মা বলিয়া কথিত হন । তিনি লোকত্রয়ে প্রবিষ্ট হইয়া সকলকে পালন করিতেছেন, তিনি অব্যয়, তিনি ঈশ্বর । ১৭

যেহেতু আমি ক্ষরের অতীত এবং অক্ষর হইতেও উত্তম, সেই হেতু আমি লোক-ব্যবহারে এবং বেদে পুরুষোত্তম বলিয়া খ্যাত । ১৮

হে ভারত, যিনি মোহমুক্ত হইয়া এই ভাবে আমাকে পুরুষোত্তম বলিয়া জানিতে পারেন, তিনি সর্বজ্ঞ হন এবং সর্বতোভাবে আমাকে ভজনা করেন । ১৯

হে নিষ্পাপ, আমি এই অতি গুহ্যকথা তোমাকে কহিলাম । যে কেহ ইহা জানিলে জ্ঞানী ও কৃতকৃত্য হয় । (অতএব তুমিও যে কৃতার্থ হইবে তাহাতে সন্দেহ কি ?) ২০
___________________________

(১) সংসারবৃক্ষ (বৈদিক বর্ণনা) - এস্থলে সংসারকে অশ্বত্থ বৃক্ষের সহিত তুলনা করা হইয়াছে । এই সংসারবৃক্ষ ঊর্ধ্বমূল, কেননা পুরুষোত্তম বা পরমাত্মা হইতেই এই বৃক্ষ উৎপন্ন হইয়াছে । এই হেতু ইহাকে ব্রহ্মবৃক্ষও বলা হয় । [কঠ ৬|১, মভাঃ অশ্ব ৩৫|৪৭] । এই বৃক্ষের শাখাস্থানীয় মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার প্রভৃতি পরিণামগুলি ক্রমশঃ অধোগামী, এই হেতু ইহা অধঃশাখ । পুরুষোত্তম বা পরব্রহ্ম হইতে কিরূপে প্রকৃতির বিস্তার হইয়াছে তাহা জ্ঞান-বিজ্ঞান-যোগে বংশবৃক্ষে দ্রষ্টব্য । এই সংসারবৃক্ষ অব্যয়, কারণ ইহা অনাদি কাল হইতে প্রবৃত্ত । বেদত্রয় এই সংসারবৃক্ষের পত্র, কারণ পত্রসমূহ যেমন বৃক্ষের আচ্ছাদনহেতু রক্ষার কারণ, সেইরূপ বেদত্রয়ও ধর্মাধর্ম প্রতিপাদন দ্বারা ছায়ার ন্যায় সর্বজীবের রক্ষক ও আশ্রয়স্বরূপ । এই সংসারবৃক্ষকে যিনি জানেন তিনি বেদজ্ঞ, কারণ সমূল সংসারবৃক্ষকে জানিলে জীব, জগৎ, ব্রহ্ম এই তিনেরই জ্ঞান হয়, আর জানিবার কিছু অবশিষ্ট থাকে না ।
 
(২) সংসারবৃক্ষ (সাংখ্য-দৃষ্টিতে বর্ণনা) - এই সংসার প্রকৃতিরই বিস্তার । সুতরাং ঐ বৃক্ষের শাখাসকল গুণপ্রবৃদ্ধ, অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, এই তিন গুণের দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত । শব্দ-স্পরশাদি বিষয়সমূহ উহার প্রবাল বা তরুণপল্লব-স্থানীয় । এই হেতু উহা বিষয়-প্রবাল । উহার শাখাসমূহ ঊর্ধ্ব ও অধোদিকে বিস্তৃত অর্থাৎ কর্মানুসারে জীবসকল অধোদিকে পশ্বাদি যোনিতে এবং ঊর্ধ্ব দিকে দেবাদি যোনিতে প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে । উহার বাসনারূপ মূলসকল কর্মানুবন্ধী অর্থাৎ ধর্মাধর্মরূপ কর্মের প্রসূতি । এই মূলসকল অধোদিকে মনুষ্য-লোকে বিস্তৃত রহিয়াছে, কারণ মনুষ্যগণেরই কর্মাধিকার ও কর্মফল বিশেষরূপে প্রসিদ্ধ । 

(৬) তিনি স্বপ্রকাশ । তাঁহার প্রকাশেই জগৎ প্রকাশিত । জড় পদার্থ চন্দ্র-সূর্যাদি তাঁহাকে প্রকাশ করিবে কিরূপে ? এই শ্লোকটি প্রায় অক্ষরশঃই শ্বেতাশ্বতর ও কঠোপনিষদে আছে । 

(৭) জীব ও ব্রহ্মে ভেদ ও অভেদ - জীব ও ব্রহ্ম এক, না পৃথক্‌ ?

এ সম্বন্ধে নানারূপ মতভেদ লইয়াই দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ প্রভৃতি মতবাদের সৃষ্টি হইয়াছে । গীতার নানাস্থলেই জীবব্রহ্মৈক্যবাদই স্বীকৃত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয় । যেমন শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন - "আমিই সর্বভূতাশয়স্থিত আত্মা" [১০|২০], "আমাকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিও" [১৩|২], "আসুরী প্রকৃতির লোক শরীরস্থ আমাকে কষ্ট দেয়" [১৭|৬] । এই সকল স্থলে স্পষ্ট বলা হইয়াছে যে, ভগবান্‌ই দেহে জীবরূপে অবস্থিত আছেন । 'তত্ত্বমসি', 'সোহহং', 'অহং ব্রহ্মাস্মি', 'অয়মাত্মা ব্রহ্ম' - চারি বেদের এই চারিটি মহাবাক্যও এই সত্যই প্রচার করিতেছে যে, জীবই ব্রহ্ম ।

কিন্তু শ্রীভগবান্‌ এও বলিতেছেন - "জীব আমার সনাতন অংশ" [১৫|৭] । এ অংশ কিরূপ ? অদ্বৈতবাদী বলেন - ব্রহ্ম অখণ্ড, অপরিচ্ছিন্ন, নিরবয়ব, অদ্বয় বস্তু, উহার খণ্ডিত অংশ কল্পনা করা যায় না । এ স্থলে 'অংশ' বলিতে মহাকাশের অংশ ঘটাকাশ (ঘটের মধ্যে যে আকাশ আছে) বুঝিতে হইবে । ঘট ভাঙ্গিলে এক অপরিচ্ছিন্ন আকাশই থাকে । জীবেরও দেহোপাধিপশতঃ ব্রহ্ম হইতে পার্থক্য, দেহোপাধিনাশে এক অপরিচ্ছিন্ন ব্রহ্মসত্তাই অবশিষ্ট থাকে ('ব্রহ্মাদ্বয়ং শিষ্যতে') ।

অচিন্ত্য-ভেদাভেদবাদ - এই গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে জীব ও ঈশ্বর উভয়েই চিদ্রূপ - চেতন । এই নিমিত্ত অর্থাৎ জীব ও ব্রহ্মের চেতনাংশের সাদৃশ্যেই উভয়ের একত্ব । যেমন তেজোময় সূর্য হইতে অনন্ত রশ্মি বহির্গত হয়, অথবা অগ্নিপিণ্ড হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গসমূহ নির্গত হয়, সেইরূপ ব্রহ্ম হইতে জীবসমূহের উৎপত্তি । অগ্নি ভিন্ন স্ফুলিঙ্গের পৃথক্‌ অস্তিত্ব নাই, ব্রহ্ম ভিন্নও জীবের পৃথক্‌ সত্তা নাই । স্ফুলিঙ্গ অগ্নিই বটে, কিন্তু ঠিক অগ্নিও নয়, অগ্নি-কণা । জীব ও ব্রহ্মেও সেইরূপ অভেদ ও ভেদ আছে, জীব ব্রহ্মকণা । 

(৮-১০) জন্মান্তর-রহস্য - জীবের উৎক্রান্তি - সূক্ষ শরীর

প্রশ্ন#1 - আত্মা অকর্তা, উদাসীন, নিত্যমুক্ত । প্রকৃতি বা দেহ-বন্ধনবশতঃই তিনি বদ্ধ হন । মৃত্যুর পর যখন সেই দেহ-বন্ধন চলিয়া যায়, তখনই ত তিনি মুক্ত হইয়া স্ব-স্বরূপ লাভ করিতে পারেন । তখন আর প্রকৃতি থাকে কোথায় ? 

প্রশ্ন#2 - জীব একদেহে পাপপুণ্যাদি সঞ্চয় করে, জন্মান্তরে অন্য দেহে তাহার ফল ভোগ করে, এই বা কিরূপ ব্যবস্থা ?

উত্তর - সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে শরীর তিনরকম - (1) স্থূলশরীর - পঞ্চ স্থূলভূত (আকাশ, বায়ু, অগ্নি, অপ্‌, পৃথিবী) দ্বারা নির্মিত, চর্মচক্ষে দৃশ্যমান্‌; (2) সূক্ষশরীর বা লিঙ্গ-শরীর - মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার, দশেন্দ্রিয়, মন ও পঞ্চতন্মাত্র (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ) দ্বারা গঠিত (মোট ১৮টি সাংখ্যোক্ত তত্ত্ব); জ্ঞানচক্ষুদ্বারা দৃশ্যমান্‌; (3) কারণ-শরীর - সকলের মূল কারণ প্রকৃতি ।


মৃত্যুকালে পঞ্চভূতাত্মক স্থূল শরীরই বিনষ্ট হয়, সূক্ষ শরীর লইয়া জীব উৎক্রমণ করে এবং পূর্ব কর্মানুযায়ী নূতন স্থূল-দেহ ধারণ করিয়া ঐ সূক্ষ শরীর লইয়াই পাপপুণ্যাদি ফলভোগ করে এবং এই কারণেই উহার মন, বুদ্ধি, ধর্মাধর্মাদি সংস্কার অর্থাৎ স্বভাব পূর্বজন্মানুযায়ীই হয় । তবে জন্মগ্রহণ-কালে পিতামাতার দেহ হইতে লিঙ্গ-শরীর যে দ্রব্য আকর্ষণ করিয়া লয় তাহাতে তাহার দেহ-স্বভাবের ন্যূনাধিক ভাবান্তর ঘটিয়া থাকে । সুতরাং, কেবল স্থূল দেহের সংসর্গ লোপ হইলেই জীবের মুক্তি হয় না, সূক্ষ শরীরও যখন লোপ পায়, তখনই জীবের সত্যস্বরূপ প্রতিভাত হয় ।

এস্থলে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও মনকেই সূক্ষ শরীর বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে [১৫|৯] । দ্রষ্টব্য এই, 'ইন্দ্রিয়' বলিতে চক্ষু-কর্ণাদি স্থূল ইন্দ্রিয়যন্ত্র বুঝায় না, উহা স্থূল দেহের অন্তর্গত - প্রকৃত ইন্দ্রিয় বা ইন্দ্রিয়-শক্তিই সূক্ষ তত্ত্ব । বেদান্তমতে পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ প্রাণ এবং বুদ্ধি ও মন (মোট ১৭টি অবয়বে) সূক্ষ শরীর গঠিত । সাংখ্যমতে পঞ্চ প্রাণ একাদশ ইন্দ্রিয়েরই অন্তর্ভূক্ত ।

যোগিগণ সূক্ষদেহ লইয়া স্থূলদেহ হইতে বহির্গত হইয়া অন্য শরীরে প্রবেশ করিতে পারেন (মহাভারতে জনক-সুলভা সংবাদ ইত্যাদি দ্রষ্টব্য) ।

(১৩) শাস্ত্রে এইরূপ বর্ণনা আছে যে, চন্দ্র জলময় ও সর্বরসের আধার এবং চন্দ্রের এই রসাত্মক গুণেই বনস্পতিগণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় । 

(১৪) দেহ যন্ত্রে এক খণ্ড রুটি ফেলিয়া দিলে উহা রক্তে পরিণত হয় । দেহাভ্যন্তরীণ কি কি প্রক্রিয়াদ্বারা এই পরিপাক-ক্রিয়া সাধিত হয়, তাহা জড়বিজ্ঞান বলিতে পারে । কিন্তু কোন, শক্তিবলে এই কার্য সাধিত হয়, তাহা জড়বিজ্ঞান জানে না । উহা ঐশ্বরিক শক্তি 

(১৫) আত্মচৈতন্য প্রভাবে জীবের স্মৃতি ও জ্ঞানের উদয় হইয়া থাকে এবং যে মোহবশতঃ স্মৃতি ও জ্ঞানের লোপ হয়, সেই মোহও ইহা হইতেই জাত । সমস্ত বেদেই তাঁহাকে জানিতে উপদেশ করেন । বেদব্যাসাদিরূপে তিনিই বেদার্থ-প্রকাশক এবং বেদবেত্তা বা ব্রহ্মবেত্তাও তিনিই, ব্রহ্ম না হইলে ব্রহ্মকে জানা যায় না । 


(১৯) তিনি সর্বজ্ঞ হন - অর্থাৎ আমাকে পুরুষোত্তম বলিয়া জানিলে আর জানিবার কিছু অবশিষ্ট থাকে না, সগুণ-নির্গুণ, সাকার-নিরাকার, দ্বৈতাদ্বৈত ইত্যাদি সংশয় আর তাঁহার উপস্থিত হয় না; তিনি জানেন, আমিই নির্গুণ পরব্রহ্ম, আমিই সগুণ বিশ্বরূপ, আমিই সর্বলোক-মহেশ্বর, আমিই লীলায় অবতার, আমিই হৃদয়ে পরমাত্মা, সুতরাং তিনি সকল ভাবেই আমাকে ভজনা করেন ।
___________________________
*Hard Copy Source:

"Sri Gita" or "Srimadbhagabadgeeta" by Gitashastri Jagadish Chandra Ghosh & Anil Chandra Ghosh. 26th Edition - June 1997 (1st Edition, 1925 from Dhaka now in Bangladesh). Published by Subhadra Dey (Ghosh), Presidency Library, 15 Bankim Chatterjee Street, Kolkata-700073. Printed by Web Impressions Pvt.Ltd., 34/2 Beadon Street, Kolkata-700006.



Disclaimer: This site is not officially related to Presidency LibraryKolkataThis is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]


<Previous--Contents--Next>

Saturday, August 16, 2014

শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : পঞ্চদশ অধ্যায় – পুরুষোত্তমযোগ (Gita : Chapter 15)

|||||||||১০|১১|১২|১৩|১৪|১৫|১৬|১৭|১৮
 (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)*
 
[কর্মীদিগের কর্মফল ও জ্ঞানীদিগের জ্ঞানলাভ পরমেশ্বরের অধীন । অতএব যাঁহারা ভক্তিযোগ দ্বারা শ্রীভগবানের সেবা করেন, তাঁহারা ভগবৎপ্রসাদে জ্ঞানলাভ করেন এবং গুণাতীত হইয়া মোক্ষ প্রাপ্ত হন । যাঁহারা আত্মতত্ত্ব সম্যক্‌রূপে অবগত হন, তাঁহারা মুক্ত বলাই বাহুল্য । এই জন্য অর্জুন প্রশ্ন না করিলেও আত্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিতে ইচ্ছা করিয়া -]

শ্রীভগবান্‌ বলিলেন -
এই সংসাররূপ মায়াময় বৃক্ষের মূল (কারণ) ঊর্দ্ধে, অর্থাৎ মায়াশক্তিবিশিষ্ট ব্রহ্মে; হিরণ্যগর্ভাদি শাখা নিম্ন দিকে ও কর্মকাণ্ডরূপ বেদসমূদয় ইহার পত্র । এই অনাদি সংসারকে বেদপুরাণাদি শাস্ত্র অশ্বত্থ বলিয়া থাকেন । যিনি এই প্রকার সংসার বৃক্ষকে জানেন, তিনিই বেদজ্ঞ । ১

[বৈরাগ্যলাভের জন্য ক্ষণস্থায়ী অশ্বত্থরূপ কল্পনা দ্বারা সংসারের স্বরূপ বর্ণনা করা হইয়াছে । কারণ সংসারে বিরক্ত ব্যক্তিরই তত্ত্বজ্ঞান হইয়া থাকে, অন্যের নহে ।]

এই সংসাররূপ অশ্বত্থের শাখাসমূহ গুণত্রয়দ্বারা বর্ধিত ও বিষয়রূপ প্রবালবিশিষ্ট এবং অধোদেশে ও ঊর্দ্ধদেশে বিস্তৃত । দেবলোকাদি অপেক্ষা নিম্নে মনুষ্যলোকে ইহার ধর্মাধর্মজনক মূলসমূহ অধোদেশে প্রসারিত হইয়াছে । ২

ইহলোকে এই সংসাররূপ অশ্বত্থের উক্তপ্রকার রূপ উপলব্ধ হয় না, কারণ স্বপ্ন-মরীচিকার ন্যায় ইহা দৃষ্ট-নষ্ট-স্বরূপ । এই সংসারের আরম্ভ নাই, কারণ ইহা অনাদি । ইহার অন্ত নাই, কারণ ইহা ব্রহ্মজ্ঞাননাশ্য, অন্য প্রকারে নাশ্য নহে, এবং ইহার মধ্যও (সংস্থিতিও) জানা যায় না; কারণ ইহা প্রমাণগম্য নয়, প্রতীতিমাত্র । এই দৃঢ়মূল সংসার-বৃক্ষকে তীব্র বৈরাগ্যরূপ (পুত্র, বিত্ত ও লোকের এষণা ত্যাগরূপ) শাণিত অস্ত্র দ্বারা ছেদন করিয়া, যাঁহাকে প্রাপ্ত হইলে সংসারে আর পুনরাবৃত্তি হয় না, সেই পরমপদের অন্বেষণ করিতে হয় । যাঁহা হইতে এই অনাদি সংসারপ্রবাহ নিঃসৃত হইয়াছে, আমি সেই আদি ব্রহ্মপুরুষেরই শরণাপন্ন হই । ৩-৪

অহঙ্কাররহিত ও অবিবেকশূন্য, আসক্তিদোষজয়ী, পরমার্থজ্ঞাননিষ্ঠ, বাসনাবর্জিত, সুখদুঃখরূপ দ্বন্দ্ব হইতে বিমুক্ত, অজ্ঞানশূন্য বিবেকী ব্যক্তিগণ সেই পরম ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হন । ৫

যাঁহাকে লাভ করিলে সংসারে আর পুনর্জন্ম হয় না, যাঁহা চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি প্রকাশ করিতে পারে না তাঁহাই আমার পরম ব্রহ্মপদ । ৬

[আমাকে বা আত্মাকে লাভ করিলে পুনর্জন্ম হয় না ।] কারণ সংসারে কর্তাভোক্তারূপে প্রসিদ্ধ জীব আমারই সনাতন অংশ । দেহাদিসংঘাতের প্রভু যখন শরীর হইতে উৎক্রমণ করে, তখন কর্ণবিবরাদিস্থানে অবস্থিত শ্রোত্রাদি পঞ্চেন্দ্রিয় ও মনকে আকর্ষণ করে । বায়ু যেরূপ পুষ্পাদি হইতে গন্ধ আহরণ করে, জীব সেইরূপ শরীরান্তর-গ্রহণকালে পূর্বদেহ হইতে মন ও ইন্দ্রিয়াদি সংস্কার সঙ্গে লইয়া যায়; অর্থাৎ পূর্বদেহের ইন্দ্রিয়াদি নূতন দেহে প্রবেশ করে । ৭-৮

দেহস্থিত জীবাত্মা চক্ষু, কর্ণ, ত্বক, জিহ্বা ও নাসিকা আশ্রয় করিয়া রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ এই পঞ্চ বিষয়কে মনের সাহায্যে উপভোগ করে । ৯

যিনি দেহান্তরে গমন করেন, যিনি শরীরে অবস্থান-পূর্বক বিষয় ভোগ করেন বা যিনি ত্রিগুণের পরিণাম সুখ-দুঃখ ও মোহের সহিত সংযুক্ত হন, সেই জীবাত্মাকে বিমূঢ় ব্যক্তিগণ জানিতে পারে না; কারণ তাহাদের মন বিষয়-আকর্ষণের দ্বারা বহির্মুখী । কিন্তু অন্তর্মুখী জ্ঞানিগণই শাস্ত্রজ্ঞানরূপ চক্ষু দ্বারা সেই আত্মাকে অবগত হন । ১০

সমাহিতচিত্ত যোগিগণ এই আত্মাকে স্বীয় বুদ্ধির সাক্ষিরূপে অবস্থিত দর্শন করেন । কিন্তু যাহাদের চিত্ত তপস্যা ও ইন্দ্রিয়জয় দ্বারা সংস্কৃত বা শুদ্ধ হয় নাই সেই অবিবেকিগণ যত্নশীল হইলেও ইঁহাকে দেখিতে পায় না । ১১

[জীব যাঁহার সনাতন অংশরূপে কল্পিত সেই পরমপদের (ব্রহ্মের) সর্বাত্মত্ব ও সর্বব্যবহারাস্পদত্ব বুঝাইবার জন্য এখন সংক্ষেপে তাঁহার বিভূতি বলিতেছেন ।]

যে জ্যোতিঃ সূর্যে, চন্দ্রে ও অগ্নিতে আছে এবং যাহা সমগ্র জগৎকে প্রকাশ করে, সেই জ্যোতিঃ আমার জানিবে । ১২

আমি ঐশ্বরিক শক্তি দ্বারা পৃথিবীতে প্রবেশপূর্বক চরাচর ভূতসকল ধারণ করি এবং রসাত্মক চন্দ্ররূপে ব্রীহি-যব-ধান্যাদি ওষধি পুষ্ট করি । ১৩

আমি উদরাগ্নিরূপে প্রাণিগণের দেহ আশ্রয়পূর্বক প্রাণ ও অপান বায়ুর সহিত সংযুক্ত হইয়া চর্ব্য, চুষ্য, লেহ্য ও পেয় - এই চারি প্রকার খাদ্য পরিপাক করি । ১৪

আমি ব্রহ্মা হইতে কীট পর্যন্ত সকলের হৃদয়ে অবস্থিত আছি । আমা হইতে প্রাণিমাত্রের স্মৃতি (ইহজন্মের ও পূর্বজন্মের স্মৃতি) এবং জ্ঞান (দেশ ও কালের দ্বারা ব্যবহিত অর্থাৎ দুরস্থ ও অব্যবহিত অর্থাৎ নিকটস্থ বস্তুর জ্ঞান) উৎপন্ন ও বিলোপ হয় । আমিই চতুর্বেদের প্রতিপাদ্য এবং আমিই বেদান্তার্থ-প্রচারের সম্প্রদায়প্রবর্তক ও বেদার্থবিৎ । ১৫

[ক্ষর ও অক্ষর উপাধিভাগ দ্বারা তাঁহারই নিরুপাধি-স্বরূপ এখন ব্যাখ্যাত হইতেছে ।]

প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ দ্বারা অনুভূয়মান ইহলোকে ক্ষর ও অক্ষরনামক দুই পুরুষ প্রসিদ্ধ আছেন । [ক্ষর ও অক্ষর ব্রহ্মপুরুষের উপাধি বলিয়া ইহাদিগকে পুরুষ বলা হইয়াছে ।] ক্ষর পুরুষই জগতের সমস্ত বিনাশী বিকার (কার্য) এবং মায়াশক্তিই কূটস্থ অক্ষর পুরুষ । ১৬

এই উভয় পুরুষ হইতে অত্যন্ত ভিন্ন পুরুষোত্তম পরমাত্মা নামে বেদান্তশাস্ত্রে অভিহিত । সেই অব্যয় ব্রহ্ম চৈতন্যবলশক্তিরূপে সমগ্র বিশ্বে প্রবেশ করিয়া স্বরূপসত্তা দ্বারা ইহা পরিপালন করেন । ১৭

যেহেতু আমি ক্ষরের (অশ্বত্থনামক মায়ারূপ সংসার-বৃক্ষের) অতীত এবং অক্ষর হইতেও উত্তম (ঊর্দ্ধ), সেই হেতু ইহলোকে (কাব্যাদিতে এবং ভক্তজনে) ও বেদে আমি পুরুষোত্তমনামে প্রখ্যাত । ১৮

হে ভারত, যিনি স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণদেহে 'আমি' বুদ্ধি ত্যাগ করিয়া কথিতপ্রকারে পুরুষোত্তম (পরব্রহ্মস্বরূপ) আঁমাকে আত্মারূপে জ্ঞাত হন, সর্বজ্ঞ ও সর্বাত্মা তিনি সর্বতোভাবে মদ্গতচিত্ত হইয়া আমাকে ভজনা করেন । ১৯

হে নিষ্পাপ অর্জুন, তোমাকে এই গুহ্যতম শাস্ত্র বলিলাম । এই তত্ত্ব অবগত হইয়া যোগী প্রকৃত বুদ্ধিমান এবং কৃতকৃত্য (কৃতার্থ) হন, অন্য প্রকারে নহে । ২০

ভগবান্ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুন-সংবাদে পুরুষোত্তমযোগ নামক পঞ্চদশ অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________


১) পত্র : পাতা (পত্র) যেরূপ বৃক্ষকে রক্ষা করে, সেইরূপ ধর্মাধর্ম, তৎকারণ ও তৎফল প্রকাশপূর্বক বেদ সংসারকে রক্ষা করেন ।
 
সংসার অনাদি কিন্তু সান্ত (আত্মজ্ঞানভিন্ন অনুচ্ছেদ্য) । দেহাদিপ্রবাহের আশ্রয় ।
 
অশ্বত্থ = অ(না) শ্বঃ(কল্য) স্থ(স্থিত) - আগামী কল্য প্রভাত পর্যন্ত যাহা স্থায়ী হইবে কিনা বলা যায় না, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ।
 
২) অশ্বত্থ : এই সংসাররূপ সনাতন ব্রহ্মবৃক্ষ সকল প্রাণীরই একমাত্র অবলম্বন । ব্রহ্ম এই সংসাররূপ ব্রহ্মবনে নিত্য বিরাজমান ।
শাখাসমূহ : লোকসমূহ; ত্রিগুণই ইহাদের উপাদান । 
প্রবালবিশিষ্ট : কর্মফল দেহাদিরূপ শাখাগ্র, তাহা হইতে শব্দাদি বিষয়রূপ অঙ্কুর উদ্‌গত হয় ।
অধোদেশে : মনুষ্য হইতে আরম্ভ করিয়া নিম্নে স্থাবর পর্যন্ত ।
ঊর্ধ্বদেশেমনুষ্য হইতে ঊর্ধ্বে হিরণ্যগর্ভ (ব্রহ্ম) পর্যন্ত ।
মনুষ্যলোকে : বৈদিক কর্মে কেবলমাত্র মনুষ্যেরই অধিকার আছে, দেবতাদের নাই, অন্য কাহারও নাই ।
মূলসমূহ : প্রথম শ্লোকে সংসারবৃক্ষের উপাদানস্বরূপ পরম মূল (যাহা ঊর্দ্ধে) বলা হইয়াছে । পরে কর্মফলজনিত রাগদ্বেষাদি বাসনাকে (যাহা ধর্মাধর্মপ্রবৃত্তির কারণ) অবান্তর মূল (যাহা অধোদেশে প্রসারিত) বলা হইয়াছে ।
প্রসারিত : সর্বপ্রাণীর লিঙ্গদেহে বাসনারূপ মূলগুলি অনুপ্রবিষ্ট (অনুসন্তত, অনুগত) কারণ লিঙ্গদেহই বাসনার আশ্রয় ।
 
৩) প্রতীতিমাত্রই প্রমাণ নহে, যথা রজ্জুতে সর্পপ্রতীতি ।

৪)  শরণাগতিই পরমপদের অন্বেষণ ।

৬) ব্রহ্মপদ-প্রাপ্তিই পুনর্জন্মনাশক ।
 
৭) জীব আমারই সনাতন অংশ : জলরূপ নিমিত্ত অপসৃত হইলে সূর্যাংশ জল-সূর্য যেরূপ সূর্যে লীন হয়, অথবা মহাকাশের অভিন্ন অংশ ঘটস্থ আকাশ যেরূপ ঘট নষ্ট হইলে মহাকাশে মিলিত হয়, আর প্রত্যাগমন করে না, সেইরূপ ব্রহ্মাংশ জীব অবিদ্যাকৃত উপাধি-অপগমে ব্রহ্মপ্রাপ্ত হইয়া আর পুনরাবৃত্ত হয় না । কারণ জীব ব্রহ্মই । জীবত্ম, জীবের সংসার ও উৎক্রমণ মায়িক (কল্পিত)-মাত্র ।
 
১৩) ওষধি = ফল পাকিলে যে গাছ মরিয়া যায়
 
স্মৃতি ও জ্ঞান : ইহজন্মের ও পূর্বজন্মের স্মৃতি এবং দেষ ও কালের দ্বারা ব্যবহিত (দুরস্থ) ও অব্যবহিত (নিকটস্থ) বস্তুর জ্ঞান । স্মৃতি ও জ্ঞান এবং তাহাদের বিলোপ যথাক্রমে ধর্মাধর্মবশতঃ হইয়া থাকে । অতএব ঈশ্বর ফলদাতা হইলেও তাঁহাতে বৈষম্য নাই ।

১৬) পুরুষ : ক্ষর ও অক্ষর ব্রহ্মপুরুষের উপাধি বলিয়া ইহাদিগকে পুরুষ বলা হইয়াছে । 

কূটস্থ অক্ষর : ভগবানের মায়াশক্তি ক্ষরনামক পুরুষের উৎপত্তি-বীজ । সংসার-বীজ অনন্ত বলিয়া তাহাকে অক্ষর বলে । কূট = মায়া, বঞ্চনা, কুটিলতা; পর্বত, স্থির, অচলা, কর্মকারের নেহাই ।
 
১৮) পুরুষোত্তম : অদ্বিতীয়, সচ্চিদানন্দস্বরূপ শ্রীহরি যিনি করুণাবশতঃ নরলীলা করেন এবং যিনি অর্জুনকে পরমার্থ বিষয়সমূহ ও স্বীয় ঐশ্বর্য বুঝাইয়াছিলেন । জীব যখন স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ শরীরে আত্মাভিমান পরিত্যাগপূর্বক ব্রহ্মজ্যোতিঃ প্রাপ্ত হইয়া স্বরূপসম্পন্ন হন, তখন তিনিই পুরুষোত্তম ।
 
১৯) পুরুষোত্তম : ক্ষর হইতে পর যে অক্ষর, তাহা হইতেও পর অমূর্ত দিব্য পুরুষ (ব্রহ্ম) । - [মুণ্ডক উপঃ, ২|১|২]

মহতের (হিরণ্যগর্ভের) পর অব্যক্ত, অব্যক্তের পর পুরুষ (ব্রহ্ম), পুরুষের পর অন্য কিছু নাই । তিনি শেষ সীমা, তিনিই পরম গতি । (পর = সূক্ষ, কারণ, ব্যাপী) - [কঠ উপঃ, ১|৩|১১]

২০) শাস্ত্র = পঞ্চদশ অধ্যায় । কারণ যদিও শাস্ত্র-শব্দে সমস্ত গীতাশাস্ত্র বুঝায়, তথাপি এই অধ্যায়ে গীতাশাস্ত্রের সার এবং সমগ্র বেদার্থ নিহিত আছে বলিয়া এই অধ্যায়কে শাস্ত্র বলা হইয়াছে ।
 
বুদ্ধিমান : বুদ্ধির অর্থ ব্রহ্মবুদ্ধি, বিষয়বুদ্ধি নহে । কারণ তিনি জ্ঞাত হইলে সমস্তই জ্ঞাত হয়, অন্য কিছু জ্ঞাতব্য অবশিষ্ট থাকে না । যিনি ব্রহ্মজ্ঞ তিনি সর্বজ্ঞ । "হে ভগবান্‌, কি বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয় ?" - [মুণ্ডক উপঃ, ১|১|৩] উত্তর : ব্রহ্মজ্ঞান হইলেই সর্বজ্ঞান হয় ।
 
কৃত্য = কর্তব্য । কৃতকৃত্য = যাঁহার সকল কর্তব্য সমাপ্ত হইয়াছে । ঈশ্বরলাভ না হওয়া পর্যন্ত কাহারও কর্তব্য শেষ হয় না । ব্রহ্মদর্শন হইলেই সকল কর্তব্যের পরিসমাপ্তি হয় ।
_________________________________________

*Hard Copy Source:
"Srimadbhagabadgeeta" translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint - January, 1997 (1st Edition - 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation

Disclaimer:
This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. This is a personal, non-commercial, research-oriented effort of a novice religious wanderer.
এটি আধ্যাত্মিক পথের এক অর্বাচীন পথিকের ব্যক্তিগত, অবাণিজ্যিক, গবেষণা-ধর্মী প্রয়াস মাত্র ।

[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali "Siyam Rupali" font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]